International Mother Language Day

নিজের ভাষা রক্ষার দায়

ক’দিন পরে এক বাংলা দৈনিকের খবরে চোখ পড়ল। কলকাতার এক সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন স্কুলে ছাত্রসংখ্যা শূন্য, ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতাধররা নানা উৎসব-অনুষ্ঠানে বিদ্যালয় ভবন ব্যবহার করতে চাইলে তিনি অসম্মতি জানানোর সাহস পান না।

তূর্য বাইন

শেষ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৬:২৮
Share:

বইমেলায় বন্ধুদের মধ্যে কথা হচ্ছিল। কলেজে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শিক্ষক এক ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কি ভেবে দেখেছেন, এ রাজ্যের প্রতিটি মধ্যবিত্ত বাঙালির মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলা সংবাদপত্র এক জন করে পাঠককে হারাচ্ছে? প্রশ্নটি যদিও বাংলা সংবাদপত্রের ভবিষ্যৎ-বিষয়ক, তবু বইমেলার উপচে পড়া ভিড় আর কোলাহলের মাঝে একটু বেখাপ্পাই লেগেছিল। বইমেলা উপলক্ষে প্রতি বছরই নতুন নতুন বাংলা বইয়ের প্রকাশ ও তা নিয়ে পাঠকের আগ্রহ বাঙালির কাছে শ্লাঘার। বইমেলায় আসা মানুষের একটা বড় অংশ যে মূলত বাংলা বই নিয়ে আগ্রহী, নানা স্টল ঘুরে তেমন ধারণা পোক্ত হয়েছে। নামী বাংলা প্রকাশনা সংস্থার স্টলে দীর্ঘ লাইনও তো সত্যি। কান পাতলে যদিও ধ্রুপদী সাহিত্যের চেয়ে থ্রিলার, হরর বই নিয়ে আলোচনা কানে এসেছে বেশি, তবু বাংলা বই ও বাংলা ভাষা একেবারে যে ব্রাত্য হয়ে যায়নি, তা তো স্পষ্ট।

এর ক’দিন পরে এক বাংলা দৈনিকের খবরে চোখ পড়ল। কলকাতার এক সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানিয়েছেন স্কুলে ছাত্রসংখ্যা শূন্য, ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতাধররা নানা উৎসব-অনুষ্ঠানে বিদ্যালয় ভবন ব্যবহার করতে চাইলে তিনি অসম্মতি জানানোর সাহস পান না। মনে পড়ল, এ রাজ্যে শুধু শিক্ষার্থীর অভাবে ইতিমধ্যেই আট হাজারের বেশি সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আশার কথা, কেন্দ্রীয় সমীক্ষা অনুযায়ী প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত এখনও পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ৯০ শতাংশ ছাত্রছাত্রী সরকারি ও সরকার-পোষিত স্কুলে পড়াশোনা করে। কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া এই স্কুলগুলির শিক্ষার মাধ্যম বাংলা।

তবে তাদের অবস্থা ভাল নয়। পরিকাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছেই; কোথাও ছাত্রের, কোথাও শিক্ষকের অভাবে বহু স্কুলেই নাভিশ্বাসের উপক্রম। শিক্ষকশূন্য বা এক জন মাত্র শিক্ষক-চালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা এ রাজ্যে কম নয়। নানা আইনি জটিলতায় প্রয়োজনের তুলনায় নতুন নিয়োগ কম হওয়ায় এবং পুরনো শিক্ষকদের অবসর হেতু সংখ্যাটা যে ক্রমবর্ধমান, সন্দেহ নেই। শিক্ষকদের বছরভর নানা শিক্ষা-বহির্ভূত কাজে ব্যবহার করাটা প্রশাসনিক দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক কালে স্কুলশিক্ষক নিয়োগে একের পর এক দুর্নীতি প্রকাশ্যে আসায় সরকার-পোষিত স্কুলের শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজ্যে ক্রমবর্ধমান কর্মসংস্থানের অভাব, সরকারি তথা সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মী নিয়োগে দুর্নীতি ও স্বজনপোষণের জেরে পড়ুয়াদের মধ্যে এসেছে অনাগ্রহ। উচ্চশিক্ষায় তো বটেই, মাধ্যমিক স্তরেও বাড়ছে স্কুলছুট।

আবার সবুজ সাথী, তরুণের স্বপ্ন, কন্যাশ্রী, মিড-ডে মিল প্রকল্প, কিংবা বিনামূল্যে পাঠ্যবই থেকে ইউনিফর্ম, ব্যাগ-সহ নানা বদান্যতায় জোর দেওয়া হলেও সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়ন, যথেষ্ট শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগ এবং শিক্ষা-সহায়ক সামগ্রীর আধুনিকীকরণে উদাসীনতার ফলে অভিভাবকদের একটা বড় অংশ সরকারি স্কুলে ভরসা করছেন না। শহরে, মফস্‌সলে, গ্রামে ইংরেজি মাধ্যমের অসরকারি স্কুলে শিক্ষার্থী বৃদ্ধি তার প্রমাণ। এ সব স্কুলে দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা হিসেবে বাংলা পড়ানো হলেও গুরুত্বের বিচারে তা অকিঞ্চিৎকর। মধ্যবিত্ত বাঙালি অভিভাবকদের সিংহভাগের মধ্যে পরবর্তী প্রজন্মকে ইংরেজি ভাষায় শিক্ষাদান নিয়ে যত উৎসাহ, বাংলা শিক্ষা সম্পর্কে তার ছিটেফোঁটাও নেই। ইংরেজি মাধ্যমের পড়ুয়ারা যে আগামী দিনে মাতৃভাষা চর্চা করবে, তেমন আশা ক্ষীণ।

লক্ষণীয় পরিবর্তন তরুণ প্রজন্মের মুখের ভাষাতেও। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজির মিশেলে সে এক জগাখিচুড়ি ভাষা, যার প্রভাব পড়ছে লেখ্য রূপেও। বাংলা ভাষার অস্তিত্বরক্ষা ও প্রসারে এই প্রজন্মের সামর্থ্য ও আন্তরিকতা সংশয়ের ঊর্ধ্বে নয়। ভিন রাজ্যে বাংলায় কথা বলার ‘অপরাধ’-এ এ রাজ্যের বহু মানুষের হেনস্থা খবরের শিরোনাম হচ্ছে। ইদানীং হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে বঙ্গীয় বুদ্ধিজীবী মহল সরব, কিন্তু বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বাংলাভাষীদেরও যে দায় রয়েছে, তা কি অস্বীকার করা চলে? ইংরেজি ও হিন্দি বাঙালিদের উপর কতটা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আর বাঙালি নিজেই বাংলাকে তুচ্ছজ্ঞান করে অন্য ভাষা কতটা বরণ করছে, ভেবে দেখা দরকার।

বাংলা শুধু পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মাতৃভাষা নয়, বাংলাদেশের মানুষেরও মাতৃভাষা। সে দেশের এক ঝাঁক তরুণ ১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় প্রাণ দিয়েছেন। ১৯৭১-এ স্বাধীন দেশটির নামকরণেও ‘বাংলা’ দীপ্যমান। ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দিয়েছে। মাতৃভাষা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের আবেগ-উচ্ছ্বাস কিছু কম নয়। তবুও বেশ কিছু বছর ধরে সেখানকার সম্পন্ন ও মধ্যবিত্ত অভিভাবকেরাও সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষাদানের দিকেই ঝুঁকছেন। শহরাঞ্চলে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ক্রমশ বাড়ছে। খোঁজ নিলে সে দেশের জেন-জ়ি’র মুখের ভাষাতেও আশ্চর্য পরিবর্তনের চেহারা দেখা যাবে। এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাঙালির কাছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্‌যাপন কি নিছকই এক উৎসব, যেখানে কেবল অভ্যাস আছে, আদর নেই?

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন