মহিলা-নির্বাচকেরা স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে নানা আন্দোলনের পথ পেরিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে আজ এক গুরুত্বপূর্ণ অক্ষ হয়ে উঠেছেন। তাঁদের সমর্থন ছাড়া কোনও ক্ষমতাসীন বা বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষেই জাতীয় বা রাজ্যস্তরের নির্বাচনে জয়লাভ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে নব-উদারনৈতিক অর্থব্যবস্থায় রোজগার-জনিত অনিশ্চয়তার দাওয়াই ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি হিসেবে শর্তসাপেক্ষে বা বিনাশর্তে নগদ হস্তান্তরকে ভারত-সহ বহু উন্নয়নশীল রাষ্ট্রই বেছে নিচ্ছে। এ-হেন কর্মসূচিতে প্রাধান্য পেয়ে থাকেন আর্থ-সামাজিক ভাবে দুর্বল মহিলারা। এই বিষয়টি নির্বাচনী রাজনীতিতে ধীরে ধীরে মহিলাদের প্রভাব অপরিহার্য করে তুলেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইস্তাহারে মেয়েদের জন্য নির্ধারিত স্থানের ক্রমবর্ধমান পরিসর বৃদ্ধিই তার প্রমাণ।
অবশ্য রাজনৈতিক দল ও বৃহত্তর জনমানসে নির্বাচক রূপে মহিলারা গুরুত্ব পেলেও, সম্ভ্রম পেয়ে থাকেন কি না, বিতর্কের বিষয়। যেমন, সাম্প্রতিক কালে কিছু বিরোধী দলের সমর্থকদের একাংশ দ্বারা পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ভোটারদের ‘ভিখারি’, ‘লোভী’, ‘ভাতাজীবী’, ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করাই হোক, বা ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধিদের দ্বারা আর জি করের মতো নাগরিক আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী মহিলাদের লক্ষ্মীর ভান্ডারের অনুদান মূল্য ফেরত দেওয়ার কথা বলাই হোক— নির্বাচনী রাজনীতিতে মহিলাদের প্রধানত ‘সুবিধাভোগী’ রূপে কল্পনা করার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। মূলধারার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক বিশ্লেষণেও নগদ হস্তান্তর প্রকল্পের সুবিধাপ্রাপকদের রাজনৈতিক সত্তাকে সাধারণত রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হয়। এর মাঝে হয়তো চাপা পড়ে যায় মহিলা-ভোটারদের দাবিদাওয়া, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি ক্ষোভ, ও তাঁদের অভ্যন্তরীণ আর্থসামাজিক অবস্থানগত বৈচিত্র।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক কালে পশ্চিমবঙ্গে মহিলাদের কাজের বাজারে যোগদান সামান্য বাড়লেও তা মূলত স্বনিযুক্তি ক্ষেত্রে হয়েছে। বর্তমান গবেষকরা তাঁদের প্রবন্ধে, আলোচনায় তুলে ধরেছেন স্বনিযুক্তি কর্মক্ষেত্র, যেমন— জরি, পাট, বিড়ি, ইত্যাদি ব্যবসায় বিনা পারিশ্রমিক বা অতি অল্প পারিশ্রমিকে উদয়াস্ত খেটে যাওয়া মেয়েদের প্রতি বৈষম্যের কথা। সম কাজে সম মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, ক্রমবর্ধমান বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বৃদ্ধি, রোজগারের সুযোগ, বেসরকারি কোম্পানির ক্ষুদ্রঋণ আদায়কারী এজেন্টদের দৌরাত্ম্য থেকে মুক্তি, মদের লাইসেন্স বন্ধ হওয়া, ইত্যাদি শ্রমজীবী মহিলাদের দীর্ঘ দিনের দাবিগুলি শুধু নগদ অনুদান দিয়ে প্রশমিত করা যায় কি না, তাও ভেবে দেখার বিষয়।
রাস্তাঘাটে, কর্মক্ষেত্রে, বৃহত্তর সমাজে, ও গৃহপরিসরে মহিলাদের নিরাপত্তার ক্রমাবনতি ও সেই সংক্রান্ত দুশ্চিন্তা ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচিত মহিলা জনপ্রতিনিধিকেও ছাড়ে না। তারই একটি উদাহরণ পাওয়া গেল হাসি কিস্কুর (নাম পরিবর্তিত) কথায়, “আমি যখন রাজনীতিতে আসি, মানুষের মধ্যে একটা বিশ্বস্ততা ছিল। কিন্তু এখন খবরের কাগজে যা পড়ি, লোকের মুখে যা শুনি, আমাদেরই এখন সাবধানে চলাফেরা করতে হয়, বেশি রাতে এখন বেরোই না।” আবার নিরাপত্তাহীনতার এ-হেন উদ্বেগের সঙ্গেই সহাবস্থান করে দলনেত্রীর প্রতি আস্থাও, “গরিব মেয়েদের জন্য লক্ষ্মীর ভান্ডার একপ্রকার মায়ের আশীর্বাদ। এখন বাচ্চাদের জামাকাপড় বা নিজের কোনও ছোট শখ মেটানোর জন্য বরের কাছে হাত পাততে হয় না। পয়সার জন্য ঝগড়া, অশান্তি হয় না।” তৃণমূল দলের কর্মী নন এমন অনেক মহিলাও, যাঁদের মধ্যে অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল ও অপেক্ষাকৃত সচ্ছল পরিবারের মহিলারাও পড়েন, লক্ষ্মীর ভান্ডার সম্পর্কে সাধারণত এমন সদর্থক ধারণাই পোষণ করেন।
মহিলাদের প্রয়োজন ও ইচ্ছার বিষয়ে একই সঙ্গে উদাসীন ও সংবেদনশীল— রাষ্ট্রের সঙ্গে মহিলাদের সম্পর্কের এমন জটিল সমীকরণই বর্তমান সময়ের নির্বাচনী লিঙ্গ-রাজনীতির অন্যতম পরিচায়ক। এই সমীকরণে রাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পঞ্চায়েতের ভূমিকা কেমন হয়, দেখা যাক। গ্রামের প্রান্তিক শ্রেণির মহিলারা কি তাঁদের দাবিগুলি পঞ্চায়েতে জানাতে পারেন? প্রশ্নটা করতে এনজিও-কর্মী সবিতা অধিকারী (নাম পরিবর্তিত) জানালেন, তাঁদের অধীনে প্রশিক্ষিত মহিলারা সাধারণত পঞ্চায়েতকে এড়িয়ে প্রশাসনিক আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। একই মত প্রবীণ এনজিও-নেত্রী হামিদা আখতার (নাম পরিবর্তিত) ও সামাজিক আন্দোলনকর্মী চম্পা বিশ্বাস (নাম পরিবর্তিত)-এরও। কারণটি প্রধানত পঞ্চায়েতে দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক দলের অতিরিক্ত আধিপত্য। দলের অনুগত না হলেই বা আপন খেয়ালে অনেক সময়েই পঞ্চায়েত প্রধানেরা সামাজিক ন্যায় প্রকল্পের আবেদনপ্রার্থী যোগ্য মহিলার নামও কেটে দেন— অভিযোগ হামিদার। গ্রামের শ্রমজীবী মহিলারা দাবি আদায়ের জন্য কোনও আন্দোলনে যোগদান করলে পঞ্চায়েত থেকে হয় হুমকি আসে, নয়তো আন্দোলন থেকে বিরত থাকার জন্য বোঝানো হয়, জানালেন চম্পা। গ্রামের পুরুষরা মূলত পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে বাইরে থাকার কারণে গ্রাম সংসদের মিটিংয়ে মহিলাদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। পানীয় জল এবং পাকা সড়ক তাঁদের প্রধান দাবি হলেও, নিজেদের জন্য এর বেশি কিছু চাইতে তাঁরা স্বচ্ছন্দ নন, জানালেন সবিতা।
রাজনৈতিক দলের মহিলা কর্মী বা পঞ্চায়েতের মহিলা সদস্যদের ভূমিকা কী? উত্তরে সবিতা, হামিদা, বা চম্পা প্রধানত এঁদের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করলেন। তাঁদের অভিজ্ঞতায় ক্ষমতাসীন দলের মহিলা কর্মী বা পঞ্চায়েতের মহিলা প্রধানরা মোটের উপরে দলের অনুগত সৈনিক রূপে কাজ করেন। কোনও সময় ব্যক্তিগত স্তরে গ্রামের মহিলাদের দাবির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করলেও কার্যক্ষেত্রে দৃঢ়তা প্রদর্শন করে উঠতে পারেন না। বিরোধী রাজনৈতিক দলের মহিলা কর্মীরা গ্রামের মহিলাদের দাবির প্রতি সংহতি জানান, আন্দোলন পরিচালনা করেন, এবং তাঁদের আন্দোলন মূলত তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক ফ্রন্টের অধীনে হয়। অবশ্য ক্ষমতাসীন দলের মহিলা কর্মীদের সীমাবদ্ধতার বিপরীত চিত্রটি উঠে আসে হাসি কিস্কুর কথায়। প্রান্তিক শ্রেণির মহিলাদের দাবি মেনেই তাঁর মতো তৃণমূল স্তরের মহিলা রাজনৈতিক কর্মীরা তাঁদের ঊর্ধ্বতন দলীয় নেতৃত্বকে বুঝিয়েছিলেন, লক্ষ্মীর ভান্ডার পাওয়ার জন্য স্বাস্থ্যসাথী কার্ড থাকা বাধ্যতামূলক— এই শর্ত প্রত্যাহার করতে সরকারকে চাপ দিতে। ২০২৩ সালে রাজ্য সরকার এই নিয়মটি প্রত্যাহার করে স্বাস্থ্যসাথী কার্ডবিহীন আবেদনকারীদের অস্থায়ী ভাবে লক্ষ্মীর ভান্ডারের জন্য আবেদন করতে সম্মতি দেয়। অনুমান, লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো প্রকল্পের নির্বাচনী গুরুত্বই রাষ্ট্রকে এর সুবিধাপ্রাপকদের প্রতি সংবেদনশীল করে তুলেছে।
ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গে ভোটার হিসেবে মহিলাদের ক্রমবর্ধমান দৃশ্যমানতা ও দর-কষাকষির ক্ষমতা তাঁদের কতখানি আর্থসামাজিক উন্নতিসাধন করেছে, তা নিয়ে সুস্থ বিতর্ক চলাই কাম্য। লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো প্রকল্প প্রান্তিক শ্রেণির মহিলাদের ছোট ছোট ইচ্ছেপূরণের মাধ্যম হয়ে ওঠার পাশাপাশি সংসারে তাঁদের আত্মমর্যাদা প্রকাশের পরিসরও তৈরি করছে। আবার এই আত্মমর্যাদা বোধ ও নাগরিক অধিকার সচেতনতাই ক্ষেত্রবিশেষে শাসকের প্রতি ক্ষোভের জন্ম দেয়, ঠিক যেমনটি আমরা দেখেছি আর জি কর আন্দোলনের সময়ে। মহিলা নাগরিকরা তখন মুখোমুখি হন রাষ্ট্রের, তার উদাসীনতার আবরণ ঘুচিয়ে ক্ষমতার পরিচয় দেন। আর নাগরিক ক্ষোভের বিস্ফোরণ স্তিমিত হলে পড়ে থাকে কিছুটা হতাশা, আন্দোলনজাত উপলব্ধি, রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা, আর ব্যক্তিগত চাওয়াপাওয়ার হিসাব।
মহিলারা শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিসংখ্যান হয়েই থেকে যাবেন কি না, আগামী নির্বাচন হয়তো এর উত্তর দেবে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে