খনিজ সম্পদ ও পাথরের লোভে খনন চলছে আরাবল্লীতে
Aravalli Range

রুখতে হবে ধ্বংস

বালি যেখানে ঢুকবে সেখানে সবুজ হারিয়ে যাবে চিরতরে। মোটা বালি যদি নিচু পাহাড়ে না আটকায়, তা হলে উঁচু পাহাড়ের নীচে জমা হয়ে পাহাড়ের স্থিতিশীলতা বিঘ্ন হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৩৭
Share:

সমতল থেকে একশো মিটার বা তার বেশি উচ্চতার পাহাড়গুলোই কেবল আরাবল্লী হিসেবে গণ্য হবে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টেরই নির্দেশে এক কমিটির ‘অভিন্ন সংজ্ঞা’য় সায় দিয়েছিল শীর্ষ আদালত। কেন এই সংজ্ঞা তৈরির দরকার পড়েছিল? আরাবল্লীর চুনাপাথর বা মার্বেল ভারতে স্থাপত্য নির্মাণে কয়েক শতক ধরেই ব্যবহার হয়ে আসছে, এর কাঠিন্য ঔজ্জ্বল্য স্থায়িত্ব আর রঙের কারণে। লাল কোয়ার্টজ়াইট, বালিপাথর ও গ্র্যানিট পাথরের চাহিদাও কম নয়। রয়েছে বেশ কিছু খনিজ পদার্থও। বেশ কয়েক দশক ধরে কিছু রাজনৈতিক প্রভাবশালীর পরিচিত ব্যবসায়ী যথেচ্ছাচার করে আরাবল্লীর পাহাড়ে যন্ত্রচালিত দানব দিয়ে পাথর ভাঙার কাজ করে চলেছে। কেন্দ্রীয় সরকার তাদের বিশেষ পরিচিত ব্যবসায়ীদের আরাবল্লীকে পাথর ভাঙার খনি হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। তবে সরকারের ভাবমূর্তি পরিষ্কার রাখতে, অন্য সব ক্ষেত্রের মতোই পরিবেশ মন্ত্রক অথবা শীর্ষ আদালত থেকে ‘ক্লিন চিট’ বার করে আনতে হয়। আদালত ২০২৪ সালে এই ‘অভিন্ন সংজ্ঞা’ তৈরির জন্য এক কমিটি তৈরি করে, যার সুপারিশে আরাবল্লীতে খনির অনুমতি দেওয়ার মানদণ্ড বজায় রাখা হবে। গত নভেম্বরে সেই সংজ্ঞা গ্রহণ করা হলেও নাগরিক প্রতিবাদে সেই আদেশ সাময়িক স্থগিত রেখে আর এক কমিটিকে এই সংজ্ঞার পরিবেশগত এবং খননের আইনি দিক খতিয়ে দেখতে বলা হয়। এই অবসরে নাতিউচ্চ পর্বতমালা আরাবল্লীর ভূতাত্ত্বিক চরিত্র সম্বন্ধে আলোচনা দরকার এর অপরিসীম গুরুত্ব বোঝার জন্য।

ভারতে তিনশো কোটি বছরের আগে থেকে আদিম ভূগাঠনিক প্রক্রিয়ায় যে ক’টি ক্রেটনিক ভূমি বা প্রাথমিক মহাদেশীয় স্তর তৈরি হয়েছিল, সেগুলি নিয়ে গঠিত হয় ভারতীয় ভূখণ্ড। পৃথিবীতে ভূক্ষেত্র গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে তৈরি হয় ছোট ছোট মহাদেশীয় স্তর ও অন্তর্বর্তী স্থানে মহাসাগরীয় স্তর। ভারতে প্রাচীন মহাদেশীয় স্তরগুলোর মধ্যে রয়েছে ধারওয়ার, বস্তার, সিংভূম এবং আরাবল্লী-বুন্দেলখণ্ড। দু’শো কোটিরও বেশি বছর আগে পৃথিবীর ভিতর ম্যান্টলের উপর অবস্থিত ভাসমান একাধিক মহাদেশীয় স্তরের সংঘর্ষে অন্তর্বর্তী সমুদ্রের পলি থেকে ভূগাঠনিক প্রক্রিয়ায় উত্থিত এই পর্বতমালা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন। এক সময় যথেষ্ট উঁচু ছিল এই পর্বতমালা। প্রাচীন পৃথিবীর প্রচুর ভূগাঠনিক প্রক্রিয়ার সাক্ষী এই আরাবল্লী পর্বতমালা এখন মৃত। সময়ের হাত ধরে বিভিন্ন কারণে ক্ষয় হতে হতে আজকের এই উচ্চতায় এসেছে।

শুধু প্রাচীন পাথরের ইতিহাসই নয়, যে সমুদ্রের পলি থেকে এই আরাবল্লী পর্বতমালার জন্ম, সেখানে পলিতে ছিল পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন অণু প্রাণী, যার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে রাজস্থানে উদয়পুর জেলার ঝামারকোটরা অঞ্চলে। এর বয়স দু’শো থেকে আড়াইশো কোটি বছর। সায়ানোব্যাক্টিরিয়া নামে এক অণু প্রাণী অগভীর জলাশয়ে জমা পলি দিয়ে স্তরে স্তরে সেটা জমিয়ে তার বাসা তৈরি করে। পরে ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় পাথরে পরিণত হওয়া এই কাঠামোকে স্ট্রোমাটোলাইট বলে। পৃথিবীর আদিতম প্রাণের জীবাশ্ম স্ট্রোমাটোলাইটের বয়স ৩৪৫ কোটি বছর। ভারতে আরাবল্লী ছাড়া সিংভূমেও এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। পৃথিবী এবং প্রাণী বিবর্তনের সঙ্গে এর গুরুত্ব বিজ্ঞানে অপরিসীম। একশো মিটার উচ্চতার থেকে নিচু পাহাড়গুলোর মধ্যে উদয়পুরের এই এলাকাও পড়ে। খননের কবলে পড়লে চিরকালের মতো হারিয়ে যাবে প্রস্তরীভূত অণু প্রাণীদের অস্তিত্ব। এর ফলে বিজ্ঞানের ক্ষতি হবে অপরিমেয় যা আর কখনও পাওয়া যাবে না গবেষণার জন্য, পৃথিবী ও তার প্রাণের ইতিহাস জানার জন্য।

যার জন্য এই অবৈজ্ঞানিক খননের নামে পাহাড় ধ্বংস করার পরিকল্পনা, তা হল একাধিক খনিজ সম্পদ এবং কাঁচা পাথর। আদি কাল থেকেই স্থানীয় বাসিন্দারা পাহাড়ের পাথর দিয়ে ঘর বানান, তাতে ভূসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এত কাল। তেমনই খনিজ উত্তোলন ও নিষ্কাশনের জন্য পাথর খননও চলছে কয়েকশো বছর ধরে। সে সব কিন্তু আরাবল্লীকে সম্মান দিয়ে, বিধ্বংসী আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে নয়। আরাবল্লীতে সিসা দস্তা তামা রুপার মতো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আকরিকের সন্ধান ইতিমধ্যেই পাওয়া গেছে। বেশ কয়েকটি জায়গায় প্রাচীন মানুষের খনিজ আহরণের নিদর্শন রয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব চার হাজার বছর আগের খনির সন্ধান মিলেছে। তামা আহরণের জন্য খনন করা হয়েছিল জয়পুর, ঝুনঝুনু এবং সিকার জেলায় খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বছর আগে। সিন্ধু সভ্যতার সময় বহু-ধাতব খনন করা হত মূলত টিন তামা ও ব্রোঞ্জ নিষ্কাশন ও উৎপাদনের জন্য। জ়াওয়ার-এ সিসা দস্তা তামা আহরণ ও নিষ্কাশন করা হয়েছে পাথর খুঁড়ে, তার বর্জ্য আজও রক্ষিত। খেতড়ি-তে তামার খবর পাওয়া গিয়েছিল পাথরের রং দেখে। এগুলো সবই আধুনিক কালে খনিজ সর্বেক্ষণে পথপ্রদর্শক হিসেবে অমূল্য সম্পদ। প্রাচীন মানুষেরা প্রযুক্তির দিক দিয়ে আজকের আধুনিকতার স্তরে পৌঁছতে না পারলেও তারা সম্পদ আহরণের জন্য যেটুকু প্রয়োজন ততটুকুই খনন করেছে। তারা প্রকৃতির আর অন্য সবার মতো পাহাড়কেও দেবতার মতো ভক্তি করে সবচেয়ে কম ক্ষতি করত।

উপরোক্ত খনিজ ছাড়াও যে সব খনিজের সন্ধান পাওয়া গেছে, অনুসন্ধান ও খনন চলছে তার মধ্যে ‘রেয়ার আর্থ’, অভ্র, গ্রাফাইট, সোনা, টাংস্টেন, লিথিয়াম, অ্যাপাটাইট, ফসফেট ইত্যাদি। প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য বেলাগাম খননে শুধু প্রাচীনতম এই পর্বতেরই ক্ষতি হবে না, তার সঙ্গে উৎখাত হবে স্থানীয় মানুষ, নষ্ট হবে জীববৈচিত্র ও বাস্তুতন্ত্র, শুকিয়ে যাবে বৃষ্টি-নির্ভর কূপ, ঝর্না, নদী-নালা খাত, বাড়বে জলকষ্ট।

উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে বিস্তৃত এই পর্বতমালা দিল্লি, হরিয়ানা, রাজস্থান ও গুজরাত চারটি রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে আছে। এই পর্বতমালার পশ্চিমে থর মরুভূমি। ভূমধ্যসাগর থেকে প্রবাহিত হাওয়া উত্তর-পশ্চিম দিয়ে ভারতে ঢোকে। সেই সময় থর মরুভূমির বালি উড়িয়ে নিয়ে আসে। প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই পাহাড় সেই বালিকে বাধা দেয় তাকে অতিক্রম করতে। অপেক্ষাকৃত মোটা বালি আটকে যায় ছোট পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে, আর তার থেকে ছোট বালি জমা হয় উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে। আর কিছু মিহি বালি হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে পাহাড় টপকে উড়ে আসে পূর্বে, ধীরে ধীরে নীচে নামে। যদি এই পাহাড় খননের কবলে পড়ে তা হলে মরু এলাকা ছড়িয়ে পড়বে এই চারটি রাজ্য ছাড়িয়ে আরও পূর্বে। আর বালি যেখানে ঢুকবে সেখানে সবুজ হারিয়ে যাবে চিরতরে। মোটা বালি যদি নিচু পাহাড়ে না আটকায়, তা হলে উঁচু পাহাড়ের নীচে জমা হয়ে পাহাড়ের স্থিতিশীলতা বিঘ্ন হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

দিল্লির দূষণে নাকাল দিল্লিবাসী। সারা দিন ধরে আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে ধূলিকণা। এই পরিস্থিতি বেশ কয়েক বছর হল চলছে। কখনও জমিতে ফসল তুলে নেওয়ার পর পরিত্যক্ত গাছের গোড়া জ্বালানোকে দায়ী করা হয়, আবার কখনও গাড়ির দূষণকে। এই উৎসগুলো দৃশ্যমান। পরিবেশবিদরা এগুলোকেই মান্যতা দেন। তবে পুরোটা সত্যি নয়। এর অন্যতম কারণ উন্নয়নের বাড়বাড়ন্ত। দিল্লি থেকে জয়পুর বা শিমলার দিকে গেলে যে হারে পাহাড় ভেঙে উন্নয়ন এবং উঁচু বাড়ি হচ্ছে, তার থেকে মিহি ধুলো বাতাসে মিশে ভেসে থাকছে। হরিয়ানাতেও পাথর ভাঙা এবং পুরনো বাড়ি ভেঙে আকাশচুম্বী অট্টালিকা হওয়ায় প্রচুর ধুলো বাতাসে মিশছে। পশ্চিমে আরাবল্লীর পাহাড় খনন এবং পাথর ভাঙার কারখানা থেকে অনবরত মিহি ধুলো বাতাসে মিশছে। হাওয়ার সঙ্গে চলে আসছে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশের উত্তর ভাগ ও হরিয়ানার আকাশে, জমে থাকছে কারণ হাওয়া বয়ে যাওয়ার রাস্তা বন্ধ। শীতে ঠান্ডা হাওয়া উপরের স্তরে চাপ দিয়ে ধূলিকণা নীচের দিকে ঠেলা মেরে ধুলোর ঘনত্ব বাড়িয়ে সূর্যের আলো প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। দূষণের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে।

একটা রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক লক্ষ্য তৈরি হয়ে যায়। তার পর তাকে বাস্তবায়িত করতে জোর জবরদস্তি আইনসভায় আইন তৈরি করে, আদালতে আইনি স্বীকৃতি আদায় করে, বিভিন্ন নাম-কা-ওয়াস্তে স্বশাসিত সংস্থাকে দিয়ে আর প্রশাসন ও আইনরক্ষকদের কাজে লাগিয়ে তা সম্পন্ন করাই হল বর্তমান সরকারের ‘গভর্নেন্স’। কিন্তু প্রকৃতির গায়ে হাত পড়লে কী হয়, তার কিছু নমুনা ইতিমধ্যেই বেশ কয়েক বার এই দেশ দেখেছে। প্রকৃতির প্রতিশোধ নীরব কিন্তু নৃশংস।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন