পেটার হলটৎস একাধারে সৎ ও বিশ্বাসঘাতক, অসম্ভব সরল অথচ অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ। সবার ভাল চাওয়ার পাশাপাশি ও তাদের হুমকিও দেয়। একটি অনাথ আশ্রমে বেড়ে ওঠা মানুষ পেটার ইট গাঁথার কাজ করে... আক্ষরিক অর্থে কমিউনিজ়মে বিশ্বাসী। কিন্তু যখন কমিউনিস্টরা তাকে ঠেলে বার করে দেয় নিজেদের গণ্ডি থেকে, তখন সে নিজের অস্তিত্বকে সমাজের কাছে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়, আর খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি-র চেয়ারম্যানের কাছের মানুষ হয়ে ওঠে। পশ্চিমে পুঁজিবাদের প্রতিশ্রুতিগুলিতে অগাধ বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এই দোলাচলের মধ্যে থাকা মানুষটি এক দিন সমাজের কাছে অবিশ্বাসী এক চরিত্র হয়ে ওঠে।” ২০১৭ সালে প্রকাশিত উপন্যাস পেটার হলটৎস: জ়াইন গ্ল্যুক্লিশেস লেবেন এরৎসেল্ট ফন ইম জ়েল্বস্ট (পেটার হলটৎসের সুখী জীবনের ব্যক্তিগত বিবরণ) প্রসঙ্গে বললেন পূর্ব জার্মানির লেখক ইংগো শুলৎসে (ছবি), বইমেলা উপলক্ষে এসেছিলেন কলকাতায়।
পেটার চরিত্রটি তাঁর পাঠকমহলে দু’ধরনের প্রতিক্রিয়া পেয়েছে: কারও কাছে হাস্যকর, আবার তারিফও করেছেন অনেকে। পুব জার্মানির মানুষের হতাশা, যন্ত্রণা, অর্থনৈতিক সঙ্কটের প্রতীক এই চরিত্রটি। বছর আটাশের এক তরুণ হিসেবে ১৯৮৯-এ দুই জার্মানির এক হয়ে যাওয়া মেনে নিতে পারেননি ইংগো। নিজেকে এক ভিনগ্রহের মানুষ বলে মনে হয়েছিল, এই চরিত্রের আয়নাতেই তুলে ধরেছেন তাঁর ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব। দুই জার্মানির পুনর্মিলনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক সব আদর্শ জলাঞ্জলি দিয়ে বাজার অর্থনীতির মধ্যে ঢুকে পড়ার এই পদক্ষেপকে অনেকের মতোই মেনে নিতে পারেননি তিনি।
১৯৬২-র ১৫ ডিসেম্বর ড্রেসডেনে জন্ম ইংগো শুলৎসের। স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের নিয়ম অনুযায়ী বাধ্য হন জাতীয় সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, দুই জার্মানি বিভক্ত হয়; পশ্চিম জার্মানিতে সামরিক বা অসামরিক প্রশিক্ষণ যেমন বাধ্যতামূলক ছিল, পুবেও তেমনই ছিল সামরিক বাহিনী। এই অভিজ্ঞতার জন্য মানসিক ভাবে তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “সামরিক বাহিনীর অভিজ্ঞতা ছিল দুঃসহ। মনে হত, সময়টা নষ্ট করছি।” তেরো বছর বয়সের আগে যে ছেলে গল্পের বইয়ে মন বসাতে পারত না, সামরিক নিয়মানুবর্তিতার ঘেরাটোপে সে হাঁপিয়ে ওঠে। সেনায় শিক্ষানবিশির সময় মন থেকে হতাশা দূর করতে হাতে কাগজ-কলম তুলে নেন। লিখতে শুরু করেন ছোটগল্প।
১৯৯১-এ রাশিয়াতে কমিউনিস্ট সরকারের পতন ঘটে, ’৯৩-এ ইংগো শুলৎসে সেন্ট পিটার্সবার্গে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতে যান। প্রায় ছ’মাস ছিলেন। ওই সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয় তেত্রিশটি ছোটগল্প, যাদের পরতে পরতে পরাবাস্তব ও ডার্ক হিউমার। ১৯৯৫-এ সেগুলি একত্র করে প্রকাশিত হয় বই ৩৩ আউগেনব্লিক ডেস গ্ল্যুক্স, বাংলা করলে ‘৩৩টি সুখী মুহূর্ত’। সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই গল্পগুচ্ছ; জার্মানির সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার, আলফ্রেড ড্যোবলিন পুরস্কার পান। তবে তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয় ১৯৯৮-এ প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস সিম্পল স্টোরিজ়, তাঁকে ‘হ্বেন্ডে লিটারাটুর’ বা দুই জার্মানি এক হওয়ার পরের প্রজন্মের সাহিত্যস্রষ্টাদের মধ্যে শীর্ষে পৌঁছে দেয়। গুন্টার গ্রাস তাঁর সম্বন্ধে বলেন, ‘আমাদের নতুন মহাকাব্যিক গল্পকার’। তাঁর লেখায় আছে আটপৌরে গদ্যভাষায় সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক যন্ত্রণার কথা।
দুই জার্মানির মিলিত হওয়া ইংগো মেনে নিতে পারেননি। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত এক ঐতিহাসিক বিভ্রম। কমিউনিস্ট আমলে জীবন ছিল এক রকম, যেখানে সব সময় জনসাধারণকে বলে দেওয়া হত কোনটা তার করা উচিত। মানুষের সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল ভীতি, সন্দেহ, জনসমক্ষে নিজের ভাবনাচিন্তা প্রকাশের অধিকার ছিল না। ১৯৮৯-এর কাছাকাছি এসে পুব জার্মানির মানুষ এক অন্য জীবনের স্বাদ পেল। “দুই দেশ যখন মিলিত হচ্ছে, আমি তখন আল্টেনবুর্গে। সবাই তখন চাইছে এই রুদ্ধশ্বাস অবস্থা থেকে মুক্তি, এমন এক পরিবেশ যেখানে বাক্স্বাধীনতা থাকবে। সবার দেখাদেখি আমিও রাস্তায় বেরিয়ে পড়ি প্রতিবাদ মিছিলে।” ইংগো তখন যে কাগজের সম্পাদক ছিলেন, সেখানে তাঁর ভাবনা খোলাখুলি লিখতে শুরু করেন। পশ্চিমি প্রভাবে সেই প্রথম ভাবতে শুরু করলেন, কী করে টাকা রোজগার করবেন। তাঁর চিন্তার জগতে তখন শুধুই যেন তাঁরই সৃষ্ট চরিত্র পেটার!
ইংগো বলেন, গণতন্ত্রের আসল অর্থ তিনি বুঝেছেন দুই দেশ এক হওয়ার পরে। রাজনীতিকদের প্রতিজ্ঞায় যে ফাঁক ছিল, পুবের জনগণ সে দিন তা বুঝতে পারেনি, “আমরা হারিয়েছি আমাদের নিজস্ব অস্তিত্ব, অনেকেই হারিয়েছে তাদের জীবিকা। যারা এক সময় অভ্যস্ত ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চাকরিতে, তারা কর্মহীন হয়ে নিজের ভিটে ছেড়ে পশ্চিমে চলে যেতে বাধ্য হয়। প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষ বেকার। পরিস্থিতির যথার্থ মূল্যায়ন না করেই আমরা ধনতান্ত্রিক সমাজের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলাম।” অন্যের চোখ দিয়ে নিজের বিচার করাকে তিনি গণতন্ত্র হিসেবে ভাবতে নারাজ, ওটা বিভ্রমমাত্র। উগ্র জাতীয়তাবাদ তিনি সমর্থন করেন না, কিন্তু পশ্চিমি সমাজব্যবস্থার মধ্যেই লুকিয়ে তার উত্থানের বীজ।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে