বিদ্যালয়ের মিড-ডে মিল কর্মসূচিকে অনেকেই কেবল একটি পুষ্টি প্রকল্প হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবে এটি তার চেয়ে অনেক বেশি। এই কর্মসূচি এক দিকে যেমন শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে সাহায্য করেছে, তেমনই অন্য দিকে স্থানীয় সমাজ, অভিভাবক এবং বিদ্যালয়ের মধ্যে একটি জীবন্ত সম্পর্কও গড়ে তুলেছে। তাই এই ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ কেন্দ্রীভূত করে কোনও একক সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা ভুল হবে; এর সুদূরপ্রসারী সামাজিক, আর্থনীতিক এবং শিক্ষাগত প্রভাব রয়েছে।
বর্তমানে কলকাতায় প্রায় চল্লিশটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং কয়েক হাজার রাঁধুনি, সহায়ককর্মী, পরিবহণকর্মী ও অন্যান্য কর্মচারী মিড-ডে মিল কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত। এঁদের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের পরিবারের মানুষ। বহু মহিলা এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথম বারের মতো নিয়মিত আয়ের সুযোগ পেয়েছেন। যদি এই সমগ্র ব্যবস্থাটি একটি মাত্র সংস্থার হাতে কেন্দ্রীভূত করা হয়, তবে এই বিপুল সংখ্যক কর্মী এক ধাক্কায় কর্মহীন হয়ে পড়বেন। শুধু কাজই হারাবে না, হারিয়ে যাবে বহু বছরের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং বিদ্যালয়কেন্দ্রিক সামাজিক অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা স্মরণে আনা যেতে পারে। পিপল’স ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ় -এর রাজস্থান শাখার করা জনস্বার্থ মামলার সূত্রে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০০১ সালের নভেম্বরে সারা দেশে সরকার পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য রান্না করা খাবার দেওয়ার আদেশ দেয়। শুরুর দিকে কিছু সমস্যা দেখা দিলেও এ-রাজ্যে খুব দ্রুত গ্রামাঞ্চলে এই প্রকল্প চালু করে দেওয়া যায়। এই সাফল্য এসেছিল রাজ্যের বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসনিক ও সামাজিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। হাজারে হাজারে গ্রামবাসী এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হন। স্ব-সহায়ক দলের মহিলারা এতে প্রাণপাত পরিশ্রম করেন। কিন্তু নগরাঞ্চলে, বিশেষত কলকাতা শহরে মিড-ডে মিল চালু করার ব্যাপারে নানা সমস্যা দেখা দেয়, যার মধ্যে একটা বড় দিক ছিল আত্মবিশ্বাসের অভাব। এমনকি একটা পর্বে দেশের অন্যান্য কিছু মেট্রো শহরের ধাঁচে বড় কোনও সংস্থার দ্বারা পরিচালিত কেন্দ্রীভূত পাকশালার দিকে এগোনোর কথাও ভাবা হয়। কিন্তু, শুভবুদ্ধি জাগ্রত ছিল, এবং সমস্যা দূর করতে শিক্ষা দফতর, প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদ, বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন, প্রতীচী ট্রাস্টের গবেষক ও অন্যান্যরা মিলে পথ খোঁজা শুরু করেন। বেশ কিছু ছোট-বড় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে একত্রে মিড-ডে মিলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। গ্রামীণ ক্ষেত্রে মিড-ডে মিল পরিচালনায় যে বিকেন্দ্রীভূত পথ পাওয়া গেছিল, শহরে হুবহু তেমনটা পাওয়া যায়নি, কিন্তু এর অনেকগুলি ছোট ছোট স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সংযোগে কলকাতার মিড-ডে মিল ব্যবস্থায়ও এক প্রকার বিকেন্দ্রীভবন ঘটে। সেটা নিঃসন্দেহে দেশের মধ্যে একটা নজির সৃষ্টি করা গিয়েছিল বলা যায়।
মিড-ডে মিলের রান্নাঘর কেবল খাবার তৈরির জায়গা নয়; এটি বিদ্যালয় ও সমাজের মধ্যে এক অদৃশ্য সেতু। স্থানীয় মাসি, পিসি বা দিদিরা যখন বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য রান্না করেন, তখন তাঁরা কেবল খাদ্য পরিবেশন করেন না; তাঁরা শিশুদের খোঁজখবর নেন, তাদের অসুস্থতা, অনুপস্থিতি কিংবা পারিবারিক সমস্যার কথাও জানতে পারেন। এই সম্পর্ক একটি নিরাপদ, মানবিক এবং অংশগ্রহণমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। কেন্দ্রীভূত রান্নাঘর থেকে দূরে কোথাও রান্না করে প্যাকেটজাত খাবার পাঠানো হলে সেই মানবিক সম্পর্কটি কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বিদ্যালয় ধীরে ধীরে স্থানীয় সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
এই পরিবর্তনের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল খাদ্যের প্রকৃতি। ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট সংস্থা জানিয়েছে যে তারা মিড-ডে মিলে ডিম পরিবেশন করবে না। এর ফলে হাজার হাজার শিশু একটি অত্যন্ত সহজলভ্য, সস্তা এবং উচ্চমানের প্রাণিজ প্রোটিনের উৎস থেকে বঞ্চিত হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য ডিম অত্যন্ত মূল্যবান খাদ্য। এতে উচ্চ জৈবমানসম্পন্ন প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন বি-১২, ভিটামিন ডি, কোলিন, আয়রন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে, যা শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অনেকের যুক্তি, ডিমের পরিবর্তে সয়াবিন, পনির বা রাজমা দিয়েও প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই বক্তব্য আংশিক সত্য হলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। রাজ্যের অসংখ্য দরিদ্র পরিবারের শিশুদের কাছে ডিম একটি পরিচিত, সুস্বাদু ও গ্রহণযোগ্য খাদ্য। অন্য দিকে, রাজমা বা অনুরূপ খাবার বহু শিশুর দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসের অংশ নয়। ফলে পুষ্টি কেবল খাদ্যের তালিকায় লেখা থাকলেই হয় না; সেটি শিশুরা আনন্দের সঙ্গে খাচ্ছে কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য যদি শিশুদের রুচি ও অভ্যাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে অপচয় বাড়বে এবং প্রকৃত পুষ্টির লক্ষ্যও ব্যর্থ হবে।
ডিমের গুরুত্ব কেবল তার পুষ্টিগুণে সীমাবদ্ধ নয়; শিশুদের কাছে এটি মিড-ডে মিলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় খাদ্যগুলির একটি। বহু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অভিজ্ঞতা বলছে, যে দিন ডিম দেওয়া হয়, সে দিন বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হার বেড়ে যায়। অনেকের মতে, সেই বৃদ্ধি প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। দরিদ্র পরিবারের শিশুর কাছে সপ্তাহের সেই একটি ডিমই হয়ে ওঠে স্কুলে আসার প্রেরণা। ডিম দেওয়ার দিন তারা পুরো খাবার শেষ করে, খাবারের অপচয় কম হয়। বিপরীতে, পনির, সয়াবিন বা রাজমা শিশুদের বড় অংশের কাছে ততটা পরিচিত বা আকর্ষণীয় নয়। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শিশুরা সয়াবিন আলাদা করে রেখে দেয়, রাজমা খেতে চায় না, এমনকি পনিরও অনেকে অপছন্দ করে। ফলে কাগজে-কলমে প্রোটিনের পরিমাণ যথেষ্ট থাকলেও বাস্তবে সেই পুষ্টি শিশুর শরীরে পৌঁছয় না। শিশু-পুষ্টির ক্ষেত্রে তাই শুধু পুষ্টিমান নয়, খাদ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং সাংস্কৃতিক পরিচিতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। যে খাবার শিশুরা আনন্দের সঙ্গে খায়, সেটিই প্রকৃত অর্থে পুষ্টি নিশ্চিত করে।
তা ছাড়া, একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে সরকারি বিদ্যালয়ের পুষ্টি কর্মসূচি পরিচালনার ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীলতা কি কাম্য? ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সামাজিক সেবা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু সরকারি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে খাদ্যের ধরন নির্ধারিত হওয়া উচিত শিশুদের পুষ্টির প্রয়োজন, স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি এবং বৈজ্ঞানিক পরামর্শের ভিত্তিতে; ধর্মীয় বিশ্বাস বা খাদ্যনীতির ভিত্তিতে নয়।
সরকার সম্প্রতি মিড-ডে মিলের বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে (যদিও ঠিকমতো খাবার দিতে গেলে এই বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে)। এই অতিরিক্ত অর্থ স্থানীয় রান্নাঘরের পরিকাঠামো উন্নয়ন, রাঁধুনিদের প্রশিক্ষণ, খাদ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি এবং সপ্তাহে আরও বেশি দিন ডিম বা অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্য পরিবেশনের কাজে ব্যবহার করা যেত। তার পরিবর্তে সমগ্র ব্যবস্থাকে কেন্দ্রীভূত করার ফলে কর্মসংস্থান, সামাজিক অংশগ্রহণ এবং শিশুদের খাদ্য বৈচিত্র— তিনটিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মিড-ডে মিলের মূল উদ্দেশ্য কেবল ক্ষুধা নিবারণ নয়; এটি পুষ্টি, শিক্ষা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক অংশগ্রহণের একটি সমন্বিত কর্মসূচি। তাই এই প্রকল্পে এমন কোনও পরিবর্তন আনা উচিত নয়, যাতে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা বিপন্ন হয়, বিদ্যালয় ও সমাজের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শিশুদের পাতে ডিমের মতো সহজলভ্য ও কার্যকর পুষ্টির উৎস হারিয়ে যায়।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে