এই বঙ্গ এখন দেখছে জাতি রাজনীতির নতুন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
West Bengal Election 2026

নেপথ্য থেকে সম্মুখমঞ্চে

স্পষ্টতই তৃণমূল আমলে বাংলার জাতি রাজনীতিতে কিছু নজিরবিহীন বদল হয়েছে। কিন্তু এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, বাংলার রাজনীতিতে ভদ্রলোকের আধিপত্য খানিক ধাক্কা খেলেও এখনও শক্তপোক্তই আছে।

প্রস্কণ্ব সিংহরায়

শেষ আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২৬ ০৭:৪৩
Share:

দাবিদার: বালুরঘাট জেলা প্রশাসনিক ভবনের সামনে কুর্মি সমাজের বিক্ষোভ, কলকাতা, ২৬ অগস্ট ২০২৫। ছবি: অমিত মোহান্ত ।

এখনকার পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির বৈশিষ্ট্য, সাম্প্রদায়িক পরিচিতির লড়াই, এটা সকলের জানা। তবে ‘সাম্প্রদায়িক’ লড়াই যে কেবলমাত্র একটা পরিচিতির অক্ষ ঘিরে হচ্ছে না, এটাও ভাল করে খেয়াল করা দরকার। ‘আমরা-ওরা’ বিভেদ এখন কেবলমাত্র রাজনৈতিক দলে সীমাবদ্ধ তো নয়-ই, ধর্মীয় সম্প্রদায়-কেন্দ্রিকও নয়। একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে বাঙালি-অবাঙালি ফাটল। এবং দেখা যাচ্ছে, ভাষাগত বা ধর্মীয় সম্প্রদায় ছাড়িয়ে আজকের এই রাজনীতির ‘আমরা-ওরা’ সরাসরি অনেকটাই জাতি-পরিচিতিকে ঘিরেও। রাজনৈতিক দলগুলো রাজবংশী, নমশূদ্র, কুর্মি, ব্রাহ্মণ, গোর্খা-সহ বিভিন্ন জাতির সমর্থন জোটাতে আজ প্রকাশ্যে মরিয়া। এর ফলে এ রাজ্যে জাতি রাজনীতির একটা চারিত্রিক বদল ঘটে চলেছে। আগে যা ফিসফিস করে চলত, বর্তমানে সেই জাতি সমীকরণ ও জাতিভিত্তিক প্রচার একটা বেশ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে।

এই পরিবর্তন বাম আমলের শেষের দিক থেকেই পরিষ্কার। বাম ফ্রন্ট সরকার যখন ‘শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ’ বলে বেসরকারি বিনিয়োগই উন্নয়নের একমাত্র রাস্তা মেনে নিল, মানুষ তখন পার্টির উপর ভরসা হারান। নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরার জন্য বহু প্রান্তিক মেহনতি মানুষ খুঁজতে শুরু করেন এবং ক্রমে শক্তিশালী করে তোলেন নিজেদের সম্প্রদায় পরিচিতি ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে। তাঁদের মোদ্দা কথা হল, ভোট পেতে গেলে রাজনৈতিক দলগুলোকে সম্প্রদায়ের দাবি ও স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। শুরু হল দর-কষাকষি। অনেকেরই মনে থাকবে, সুভাষ চক্রবর্তী, অশোক ঘোষের মতো বাম নেতারা সেই সময় ছুটে গিয়েছিলেন ঠাকুরনগরে বীণাপাণি দেবীর আশীর্বাদ নিতে। জাতি-রাজনীতির এই লড়াইয়ে অবশ্য এগিয়ে থেকেছে তৃণমূল কংগ্রেস। ২০১১-র সেই নির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থী হয় বীণাপাণি দেবীর সন্তান মঞ্জুলকৃষ্ণ ঠাকুর।

বলা যেতে পারে, তৃণমূলের শাসনকালেই বাংলার জাতি রাজনীতির শুরু। একটা মডেল তখন তৈরি হয়ে ওঠে, যা প্রত্যেকটি দলই এখন অনুসরণ করে চলেছে। এর মূলত তিনটি দিক— রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি, এবং সরকারি সুবিধা ও উন্নয়নে ভাগীদারি।

প্রথমে দেখি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি। দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য চালিয়েছে বর্ণহিন্দু ‘ভদ্রলোক’ নেতারা। ‘বাংলায় জাতপাত নেই’ জনপ্রিয় ধারণাটা তাঁদেরই অবদান। রাজ্যের জাতহীন ভাবমূর্তি ও ভদ্রলোকের প্রভাব দুটোই কিছুটা আজ ধাক্কা খেয়েছে। সব রাজনৈতিক দল এখন এই সম্প্রদায়গুলির নেতৃত্বকে নিজের দিকে টেনে ভোটে দাঁড় করাতে একপ্রকার বাধ্য। গত বিধানসভার কথাই ধরা যাক। গাইঘাটা বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী ছিলেন মতুয়া ঠাকুরবাড়ির সুব্রত ঠাকুর ও তৃণমূল প্রার্থী হন মতুয়া গোঁসাই ও ব্যবসায়ী নরোত্তম বিশ্বাস। বামেদের প্রার্থী মতুয়া লেখক কপিলকৃষ্ণ ঠাকুর। আগামী ২০২৬-এর নির্বাচনেও প্রার্থী-চয়নের ফর্মুলা যে একই থাকবে সেটা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতৃত্বকে নিজেদের কাছে টানতে দলগুলি মুখিয়ে আছে। সম্প্রতি গোর্খা নেতা বিষ্ণু প্রসাদ শর্মা বিজেপি ছেড়ে যোগ দিলেন তৃণমূলে। ভাষা দিবসে মুখ্যমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিলেন রাজবংশী নেতা অনন্ত মহারাজ। এটাকে তৃণমূলের জনরঞ্জনী রাজনীতি বলেছেন অনেকে। তথ্য ঘাঁটলে অবশ্য দেখা যায় যে, গত কয়েক বছরে বিধানসভায় ও বিভিন্ন দলের অন্দরে নিম্নবর্ণের মানুষের প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে। ২০২১-এর নির্বাচনে দশের বেশি অসংরক্ষিত আসন থেকে তফসিলি প্রার্থীরা জিতেছেন। সামনের নির্বাচনেও এই ধারা বজায় থাকবে কি?

দ্বিতীয়ত, পরিচিতি রাজনীতির এক অন্যতম রীতি— কোনও সম্প্রদায়ের সামাজিক-সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠা করা। বাংলায় বর্ণহিন্দুদের দাপটে বহু দশক ধরে প্রান্তিক সমাজের ইতিহাস, সাহিত্য, সংস্কৃতি মূলস্রোতে প্রায় অদৃশ্য ছিল। কিছুটা বদল এখানেও লক্ষণীয়। ২০১০ সালে বাম সরকার মতুয়া ধর্ম প্রবর্তক হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের নামে পুরস্কার চালু করে। তৃণমূলকেও ক্ষমতায় এসে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ‘আইকন’দের নানা পদ্ধতিতে স্বীকৃতি দিতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ, জন্মবার্ষিকীতে ছুটি, মূর্তি স্থাপনা, বাস স্টপে ছবি, পাঠ্যক্রমে তাঁদের অবদান যোগ— এই সবের মাধ্যমে সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে নিম্নবর্ণের ইতিহাস। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দলিত সাহিত্য অ্যাকাডেমি এবং সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে কুরমালি, কামতাপুরি, সাঁওতালির মতো অনেক প্রান্তিক ভাষা। বিজেপির নীতিও এক। ২০২১-এ বিজেপির দাবি ছিল, ক্ষমতায় এলে বনগাঁতে দলিত প্রেরণা স্থল এবং পুরুলিয়াতে রঘুনাথ মুর্মুর স্মরণে একটি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করবে। পরিচিতি রাজনীতির ফলে আজ প্রান্তিক সমাজের মানুষ জনসমক্ষে নিজেদের জায়গা প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছেন। গণপরিচিতির দাবি ও পাল্টা প্রতিশ্রুতির এই অঙ্কে বিশেষ হেরফের হবে বলে মনে হয় না।

এ বার আসা যাক তৃতীয় প্রসঙ্গে। দেশের অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও সরকারের নয়া কল্যাণমুখী নীতি ও জাতি রাজনীতির মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্পষ্ট। অর্থাৎ সুবিধাভোগীর পরিচয়— তাঁর সম্প্রদায়। কর্নাটক ও তেলঙ্গানার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখানেও চালু হয়েছে পুরোহিতদের জন্য সরকারি অনুদান। আবার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করার জন্য গঠিত হয়েছে একগুচ্ছ উন্নয়ন পরিষদ। লেপচা, ভুটিয়া, গুরুং, তামাং, লিম্বু, মতুয়া, নমশূদ্র, রাজবংশী, কামি, কুর্মি-সহ আরও অনেকের জন্য। উল্লেখ্য যে, গত জানুয়ারিতে বিজেপি সাংসদ ও মতুয়া নেতা শান্তনু ঠাকুরের ডাকে এক প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে দেখা করে মতুয়া উন্নয়ন পরিষদ তৈরির দাবি পেশ করেন।

জাতি রাজনীতিতে এ ছাড়াও নজর কেড়েছে ওবিসি লিস্ট তৈরি নিয়ে তৃণমূল-বিজেপি কাজিয়া। সরকারি সুবিধা পেতে অনেক সম্প্রদায় ওবিসি লিস্টে অন্তর্ভুক্ত হতে চায়। বিজেপির আপত্তি তৃণমূল সরকার মুসলমানদের ওবিসি লিস্টে গণনা করছে। ২০২৫-এ তৃণমূল সরকার ৭৪টি সম্প্রদায়কে ওবিসি লিস্টে পুনরায় নথিভুক্ত করেছে। আবার তৃণমূল ও বিজেপি উভয়ই মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ মেনে মাহিষ্য, মাহাতো, তিলি, সাহা-সহ একাধিক সম্প্রদায়কে ওবিসি লিস্টের আওতায় আনতে চায় বলে বার বার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলেছে। লক্ষণীয়, যে মণ্ডল কমিশনকে জ্যোতি বসুরা এক সময় প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, আজ সেই কমিশনেরই কথা ফিরে ফিরে আসছে বিভিন্ন দলীয় প্রচারপত্রে।

স্পষ্টতই তৃণমূল আমলে বাংলার জাতি রাজনীতিতে কিছু নজিরবিহীন বদল হয়েছে। কিন্তু এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, বাংলার রাজনীতিতে ভদ্রলোকের আধিপত্য খানিক ধাক্কা খেলেও এখনও শক্তপোক্তই আছে। বিধানসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব আজও বর্ণহিন্দু। উল্লেখ্য, তৃণমূল কিন্তু ২০২৪-এ লোকসভা ভোটের আগে ইন্ডিয়া জোটের জাতিগণনার দাবিতে একমত ছিল না। ২০২১-এর নির্বাচনের রণভূমিতেও বর্ণহিন্দু ভদ্রলোকের জাতিচেতনা বার বার প্রকাশ্যে বেরিয়ে এসেছে। কখনও মুখ্যমন্ত্রী তাঁর ব্রাহ্মণ পরিচয় স্বগর্বে বলেছেন, কখনও আবার জাতি অহঙ্কার শোনা গেছে বিরোধী দলনেতার কণ্ঠে। বর্ণহিন্দু ভদ্রলোকের জাতি অহঙ্কার চিরকাল-ই ছিল, কিন্তু সেটার উপরে থাকত শিক্ষা ও শিষ্টতার প্রলেপ। এখন তা আর নেই।

জাতি রাজনীতি প্রকাশ্যে আসায় তৈরি হয়েছে জটিল সমীকরণ। প্রত্যেক জাতির ইতিহাস আলাদা, শিক্ষা সংস্কৃতি আলাদা, স্বার্থ ও দাবিদাওয়া আলাদা। এসআইআর-এই বোঝা গেল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উপর তার ভিন্ন প্রভাব। নমশূদ্র বা রাজবংশী মানুষকে কাগজপত্র জোগাড় করতে যে অসুবিধার মধ্যে পড়তে হয়েছে, বর্ণহিন্দুদের কি একই রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে? একেবারেই না। সম্ভবত ভোটের সময় বাঙালি এ সব হিসেব মিলিয়ে নেবে।

জিন্দল গ্লোবাল ল স্কুল

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন