উদ্বেগ: এসআইআর-এর শুনানিতে নথিপত্র যাচাই করানোর জন্য সাধারণ মানুষের ভিড়, নদিয়া, ফেব্রুয়ারি ২০২৬। ছবি: পিটিআই।
পশ্চিমবঙ্গ-সহ বারোটি রাজ্যে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর)-র কাজ প্রায় শেষ। খবর অনুযায়ী, গুজরাতেই প্রায় ৬৮ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছে; ৩৪ লক্ষ মধ্যপ্রদেশে, ৩১ লক্ষ রাজস্থানে, ৩৪ লক্ষ ছত্তীসগঢ়ে— এই প্রতিটি রাজ্যই বিজেপি-শাসিত। বিরোধী-শাসিত তামিলনাড়ুতে বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা ৭৪ লক্ষ। আসা যাক বাংলার কথায়। প্রাথমিক খসড়া তালিকা যখন প্রকাশিত হয় তখনই দেখা যায়, ৫৮ লক্ষ মানুষের নাম নেই। তার মধ্যে অবশ্য মৃত, স্থানান্তরিত ভোটার ছাড়াও বেশ কিছু জীবিত মানুষও ছিলেন। তা নিয়েও রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশনের টানাপড়েন শুরু হয়, যা এখনও চলছে। প্রাথমিক ভাবে দেখা গিয়েছিল, ২০০২-এর তালিকায় নাম থাকা ও সেই নামের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা প্রায় সবারই নাম ছিল।
অসুবিধা শুরু হয় তার পর। নির্বাচন কমিশনের দৌলতে আমরা নতুন একটি শব্দের সঙ্গে পরিচিত হই, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’। শোনা গেল, কমিশনের নিজস্ব প্রযুক্তি যাঁদের মনে করছে সন্দেহজনক, তাঁদেরই শুনানিতে ডেকে নথিপত্র দেখতে চাইছে কমিশন, এবং তা এক বার নয়, বারংবার। দীর্ঘদিন এ দেশে থেকে, ভোট দিয়ে সরকার নির্বাচন করার পর যদি কোনও ব্যক্তিকে শুনানিতে এসে প্রমাণ দিতে হয় তিনি দেশের নাগরিক এবং তাঁর বাপ-ঠাকুরদারা এ দেশে এসেছেন স্বাধীনতার পর বা কমিশন-নির্ধারিত সময়সীমার আগেই, তা হলে এক জন মানুষের কেমন লাগতে পারে?
কিন্তু নির্বাচন কমিশনের কাছে এ সব বিচার্য হয়নি। এমনকি দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলা সত্ত্বেও তারা ওই ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’র তালিকায় কাদের নাম আছে, সেই তালিকা সর্বসমক্ষে প্রকাশ করেনি। কী কারণে কাদের ডাকা হয়েছে, তার তালিকাও মানুষের হাতে নেই। বুথ স্তরের কর্মী বা এআরওদের প্রশ্ন করলে তাঁরা বলেছেন বটে যে তালিকা বুথে বুথে টাঙানো হয়েছে, কিন্তু তা সম্পূর্ণ সত্য নয়। যার ফলে এক দিকে সাংবাদিকরাও এ নিয়ে তেমন খবর করতে পারেননি, রাজনৈতিক দলগুলোও পারেনি ভুক্তভোগীদের সহায়তা করতে।
বিষয়টা এখানেই থেমে থাকেনি। যাঁদের কোনও নথি নিয়ে সমস্যা খুঁজে বার করা যায়নি, তাঁদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে— কে বা কারা তাঁদের নামে ফর্ম-৭ জমা করেছে, এবং সেখানে বলা হয়েছে নির্দিষ্ট ব্যক্তি ‘ভারতীয় নাগরিক নন’। আরও বলা হয়েছে, ওই ব্যক্তিকে তাঁর ভারতীয়ত্বের সপক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ দাখিল করতে শুনানিতে আসতে হবে। যত ফর্ম-৭ জমা পড়েছে তাদের মধ্যে একটাই মিল: প্রতিটি ফর্মই সংখ্যালঘু মুসলমানদের নামে, এবং যাঁরা জমা করেছেন তাঁরা কেউ সংশ্লিষ্ট বুথের বিএলএ নন, অর্থাৎ রাজনৈতিক দলের অঞ্চল স্তরের কর্মী নন। এ ঘটনার কয়েকটি মাত্র খবরে এসেছে। সন্দেশখালিতে প্রায় ৪০০০ মুসলমান মহিলা ও পুরুষের নামে এই রকম ফর্ম-৭ জমা পড়েছে। খোঁজ নিতে গিয়ে বেশ কিছু সমাজকর্মী দেখেছেন, ওই অঞ্চলের বিজেপি কর্মীরা অবধি জানেন না, কারা এই ফর্ম-৭ জমা করেছেন। হাওড়াতেও এ ধরনের একটি ঘটনা খবরে এসেছে। দেখা গেছে, ভারতীয় রেলের এক প্রাক্তন কর্মী শেখ লিয়াকত হোসেনকে বলা হয়েছে, তিনি যেন তাঁর নাগরিকত্বের প্রমাণ দেওয়ার জন্য শুনানিতে হাজির হন।
ফর্ম-৭ সংক্রান্ত অভিযোগ যে শুধু বাংলাতেই, এমনটা নয়। রাজস্থানের আলওয়ারে এক বিএলও-র কাছে ফোন এসেছিল, মুসলমান ভোটারদের নাম বাদ দিতে হবে এবং সেই সংক্রান্ত ফর্ম-৭ জমা হয়েছে— এই বলে। গুজরাতে পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত লোকশিল্পী হাজিভাই কাসমভাই— যিনি হাজি রামকাডু নামে পরিচিত— তাঁর নামে ফর্ম-৭ জমা করেছেন বিজেপির এক নেতা। যে দিন কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মাননা প্রাপক হিসেবে ঘোষণা করে, তার ৪৮ ঘণ্টা পরে এই খবর প্রকাশিত হয় যে, তাঁর নামে ফর্ম-৭’এর অভিযোগপত্র জমা পড়েছে। এ কথা শোনার পরে ওই বর্ষীয়ান ঢোল শিল্পী বলেন, তিনি ষাট বছর ধরে এই দেশে ওই অঞ্চলে বসবাস করছেন, সরকার তাঁর কাজের জন্য তাঁকে পুরস্কৃত করছে, আর বিজেপির নেতারা প্রমাণ করতে চাইছেন তিনি এ দেশের নাগরিক নন! গবাদি পশু কল্যাণের জন্য তিন হাজারেরও বেশি দাতব্য অনুষ্ঠানে এবং এক হাজার মঞ্চানুষ্ঠানে ঢোল বাজানো এই শিল্পী এই ‘পদক্ষেপ’-এ গভীর বেদনা প্রকাশ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত শোরগোল হওয়ার পরে অভিযোগকারী বিজেপি নেতা বলেন কোথাও ভুল হয়েছে, তিনি হাজি রামকাডুর নাম বাদ দিতে চাননি। ভোটার তালিকায় অন্য নাম দেখাচ্ছিল, তা ঠিক করার উদ্দেশ্যেই এ কাজ করেছেন।
অনেকেই বলছেন, বারোটি রাজ্যে ভোটার-তালিকায় এই বিশেষ নিবিড় সংশোধন চলছে, শুধু বাংলা ছাড়া অন্য কোনও রাজ্য থেকে তো অশান্তির খবর আসছে না— সমস্যাটা কি শুধু বাংলার? যাঁরা এমন ভাবছেন, রাজস্থান ও গুজরাতের উদাহরণগুলো তার উত্তর। এমন বহু খবর পাওয়া গেছে উত্তরপ্রদেশেও। সেখানে ফর্ম-৭’এর অপব্যবহার সংক্রান্ত মামলাও হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে। অসমে আরও বড় ঘটনা ঘটেছে: বিজেপি-শাসিত রাজ্যটির এক বিএলও অভিযোগ করেছেন, তাঁর কাছে নির্বাচন কমিশনের তরফে ৬০টি ফর্ম-৭’এর অভিযোগপত্র দিয়ে বলা হয়েছে খতিয়ে দেখতে, অভিযোগগুলো আদৌ সঠিক কি না। বাড়ি বাড়ি খোঁজ নিতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, তিনি যে প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা, সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের নামেই অভিযোগ জমা পড়েছে। আরও অসংখ্য জীবিত মানুষ, যাঁরা দীর্ঘদিন ভারতের বাসিন্দা, এমনকি যাঁদের নাম অসমের নাগরিকপঞ্জিতেও আছে, তাঁদের নামেও ফর্ম-৭ জমা পড়েছে— যাতে তাঁদের নাম নতুন ‘শুদ্ধ’ ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায়। এ-হেন ঘটনা সামনে নিয়ে আসার কারণে ওই বিএলও-কে ‘কর্তব্যে গাফিলতি’র কারণে চাকরি থেকে নিলম্বিত করা হয়েছে।
প্রতিটি ঘটনাই দেখায়, বিজেপি ভোটার তালিকা সংশোধন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের নামে নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় ‘বিরোধী ভোটার’ বাদ দিতে চাইছে। অনেকে বলতে পারেন, নির্বাচন কমিশন যে নানা ভাবে এই প্রক্রিয়াকে সরাসরি মদত দিচ্ছে তার কি কোনও প্রমাণ আছে, না কি এটা শুধুই অভিযোগ? বিহারের নির্বাচনে দেখা গিয়েছিল, বিভিন্ন বিরোধী দল অভিযোগও করেছিল— ফর্ম-৭’এর অপব্যবহার করে বহু মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং সেই কাজ করেছিলেন অঞ্চলের বিএলএ-রা, কিন্তু সেই অভিযোগ সত্যি হলেও প্রমাণ করা যায়নি। বাংলায় কিন্তু ফর্ম-৭’এর যথেচ্ছ অপব্যবহারের বহু খবর প্রকাশিত হয়েছে, এবং কোথাও কোথাও প্রতিরোধের ঘটনাও দেখা গেছে।
এত কিছুর পরে, ফর্ম-৭’এর অপব্যবহারের ভূরি ভূরি অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও, আশ্চর্যজনক ভাবে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এ বিষয়ে কোনও রায় দেয়নি। গণতন্ত্রের নামে এ ভাবে কেন্দ্রীয় সরকার, তাদের পেটোয়া নির্বাচন কমিশনকে সঙ্গে নিয়ে এত বড় একটা অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেল এবং দেশের সর্বোচ্চ আদালত কোনও বাধা দিল না, এও কিন্তু ইতিহাসে লেখা থাকবে। চূড়ান্ত তালিকার নামে যা প্রকাশিত হবে সেটাও অসম্পূর্ণ। ওই তালিকার বাইরে যাঁরা থাকবেন তাঁরা আবারও সেই আশঙ্কায় ভুগবেন: তাঁদের নাম থাকবে তো? আদালত বলেছে, ধাপে ধাপে নাকি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হবে। নির্বাচন ঘোষণা হয়ে যাওয়ার পরে এক জন মানুষও কি কোনও রাজনৈতিক দলকে আর সঙ্গে পাবে? কোনও রাজনৈতিক দল কি উৎসাহী হয়ে কোনও বাদ যাওয়া ব্যক্তির হয়ে কথা বলবে?
যে রাজনৈতিক দল বলছে এক জনও বৈধ ভোটারকে বাদ দিতে দেব না, কিংবা যারা এখনও বলছে এক জন বৈধ ভোটারের নাম বাদ গেলে আমরা নির্বাচন কমিশনকে দেখে নেব, সেই দলগুলোকে তখন ভোটাররা খুঁজে পাবেন তো? একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক দেশে রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের কারণে এক জন ভোটারের নামও বাদ যেন বাদ না যায়, গেলে সেটা আইনত, সংবিধানগত ভাবে অসঙ্গত ও অগ্রহণযোগ্য— যখন এই কথাটা বলা জরুরি এবং নাগরিক সমাজ তা না বলে চুপ করে থাকে, তখন ভয় হয়। ভোটার তালিকা সংশোধন কোনও মতেই এক জন ব্যক্তিরও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের কৌশল হতে পারে না— এই কথাটা শুধু রাজনৈতিক দলকেই নয়, নাগরিক সমাজকেও সরবে বলতে হবে— তবে যদি আদালতের টনক নড়ে। কী পদ্ধতিতে তা হবে জানা নেই, কিন্তু আমাদের রাজ্যে বা দেশে নাগরিক সমাজও যে অনেকাংশে রাজনৈতিক দলের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছে, সেটাই ভয়ের কারণ। দুর্ভাগ্যও।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে