Transgender Rights

আইন যাঁদের দেখতে পায় না

ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা নিয়ে বিতর্কের বাহুল্য। এই ধারাটি যৌনসংখ্যালঘু মানুষদের ‘অপরাধী’ বানিয়ে দিত। এটি মূলত ছিল পায়ুকাম-বিরোধী, সেখানে নারীদের কোনও উল্লেখ ছিল না।

ভাস্কর মজুমদার

শেষ আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ ০৭:২৬
Share:

অনেকগুলি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে রূপান্তরকামী সুরক্ষা সংশোধনী আইন (২০২৬) । ঐতিহাসিক ভাবে স্বীকৃত যে সব রূপান্তরকামী গোষ্ঠী রয়েছে, যেমন হিজড়া, আরাবনী, যোগতা, কিন্নর, তাঁদের এই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের অধিকার সুরক্ষিত হবে, বলছে নতুন আইন। কিন্তু যে সব গোষ্ঠীর উল্লেখ নেই আইনে, সেগুলির কী হবে?

এলজিবিটিকিউআইএ+ গোষ্ঠীর মধ্যে এত দিন যে মানুষরা সব থেকে কম আলোচিত হতেন, তাঁরা নারী থেকে পুরুষ হতে-চাওয়া রূপান্তরকামী। নতুন আইনে তাঁরা প্রায় অদৃশ্য হয়ে যেতে বসেছেন। ২০২৩ সালের একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, ভারতে যৌনসংখ্যালঘুদের নিয়ে যত সমীক্ষা, গবেষণা প্রভৃতি হয়, তার ৫৫ শতাংশ হয় সমকামী পুরুষদের উপরে, ১৬ শতাংশ সেই রূপান্তরকামীদের উপরে যাঁরা পুরুষ থেকে নারী হতে চান, এবং মাত্র চার শতাংশের নজর থাকে সমকামী ও উভকামী নারীদের উপরে। যাঁরা নারী থেকে পুরুষ হতে চান, সেই রূপান্তরকামীদের নিয়ে কোনও পরিসংখ্যানই ওই সমীক্ষায় পাওয়া যায়নি! নতুন আইনের প্রতিবাদে যে কথাবার্তা চলছে, সেখানেও এঁরা ব্রাত্য থেকে যাচ্ছেন। অথচ, স্ব-ঘোষণার অধিকার কেড়ে নিলে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তাঁদেরই।

ভারতে জাতীয় রূপান্তরকামী বোর্ডে প্রথম থেকে দু’ধরনের রূপান্তরকামী মানুষই সদস্য হিসেবে ছিলেন। তা হলে আজ কী করে মন্ত্রণালয় নতুন আইনে তুলনায় অধিক পরিচিত কিছু রূপান্তরকামী গোষ্ঠী ছাড়া বাকি সকলকে ‘অদৃশ্য’ করে দিল? ভারতে নারীদের সমকামিতা, উভকামিতা ও রূপান্তরকামিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে অত্যন্ত কম। সম্ভবত তার একটি কারণ ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা নিয়ে বিতর্কের বাহুল্য। এই ধারাটি যৌনসংখ্যালঘু মানুষদের ‘অপরাধী’ বানিয়ে দিত। এটি মূলত ছিল পায়ুকাম-বিরোধী, সেখানে নারীদের কোনও উল্লেখ ছিল না। ভিক্টোরীয় যুগের মানসিকতা থেকে আইনের রূপকাররা মনে করতেন না যে, পুরুষ ব্যতিরেকে নারীর কোনও যৌনাচার সম্ভব! দীপা মেহতার ফায়ার (১৯৯৮) ছবিটিকে ঘিরে যে তুমুল ক্ষোভ দেখা গিয়েছিল সারা ভারতে, তার মূলে ছিল পুরুষকে বাদ দিয়ে নারীদের মধ্যে যৌনাকাঙ্ক্ষার ‘ভয়াবহতা’-র কল্পনা। অথচ, সমকামী মেয়েরা বিসমকামী বিবাহে আটকে-পড়ার জন্য নানা ভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছেন।

যে রূপান্তরকামীরা নারী থেকে পুরুষ হতে চান, তাঁদের হিংসা-হয়রানির অনেকগুলি পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। প্রথমত ‘নারী’ হিসেবে দিনাতিপাত করার জন্য নারীর ‘প্রাপ্য’ হেনস্থা-হিংসার মোকাবিলা করতে হয়। তার পর যখন তাঁরা জন্মকালে-ন্যস্ত লিঙ্গপরিচয়ে আবদ্ধ না থেকে বিপরীত লিঙ্গের মানুষ হয়ে উঠতে চান, খুঁজে পান যৌন-লিঙ্গপরিচয়ের এক নতুন ভাষা, তখন এক নতুন সঙ্কটের সূচনা হয়। তাঁরা উপলব্ধি করেন যে রূপান্তরকামী আন্দোলনের কর্মসূচি, প্রাত্যহিক সংগ্রামের রাশ রয়েছে পুরুষ থেকে নারী হতে-চাওয়া রূপান্তরকামীদের হাতে। এই গোষ্ঠীর একটা দীর্ঘ সামাজিক-সাংস্কৃতিক ইতিহাস রয়েছে, একশো বছরের বেশি আন্দোলনের ঐতিহ্য রয়েছে। হিজড়াদের মতো গোষ্ঠীবদ্ধতা, নিজস্ব সমাজ, সংস্কৃতি বা অর্থনীতি নেই নারী থেকে পুরুষ হতে-চাওয়া রূপান্তকামীদের। পথে-ঘাটে, ট্রেনে-ট্র্যাফিকে ‘রূপান্তরকামী’ বলে তাঁরাই চোখে পড়েন, যাঁরা পুরুষালি চেহারায় নারীদের মতো সাজসজ্জা করেন। এতে পুরুষ হতে-চাওয়া রূপান্তরকামীরা দ্বিগুণ প্রান্তিক হয়ে পড়েন।

২০১৪ সালে আমির খান প্রযোজিত সত্যমেব জয়তে অনুষ্ঠানের তৃতীয় পর্বে রূপান্তরকামী মানুষদের নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছিল। সেখানেও কোনও পুরুষ হতে-চাওয়া রূপান্তরকামী দেখা যায়নি। ২০১৭ সালে কোচি মেট্রো ২৩ জন রূপান্তরকামীর কাজের ব্যবস্থা করেছিল। ২০১৪ সালের নালসা-রায়ের পর এমন সরকারি পদক্ষেপ খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাদের মধ্যে এক জনও পুরুষ হতে-চাওয়া রূপান্তরকামী ছিলেন না। এখন কেন্দ্র যে আইন আনল, তাতে হিজড়া, আরাবনী, যোগতা, কিন্নর গোষ্ঠীর মানুষরা রইলেন, জন্মপরিচয়ে যাঁরা সকলেই পুরুষ। আইনে নারী থেকে পুরুষ হতে-চাওয়া রূপান্তরকামীদের কোনও উল্লেখ নেই। সরকারি ‘ট্রান্সজেন্ডার আইডেন্টিটি কার্ড’ পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁরা পিছিয়ে। ভারতে আজও ‘নারী’ থেকে পুরুষ হওয়ার মেডিক্যাল পদ্ধতি তুলনায় অনুন্নত।

সমীক্ষা বলছে, ভারতে দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী পরস্পর সম্মতিতে সম্পর্কে থাকলেও পরিবারের অত্যাচারে তাঁদের আলাদা হতে হয়। উত্তরপ্রদেশ থেকে কেরল পর্যন্ত বহু ঘটনায় দেখা গেছে আদালত থেকে রায় বার করে তবে দু’জন যৌনসংখ্যালঘু নারী একে অপরের সঙ্গে থাকতে পেরেছেন। এর পাশাপাশি ‘সম্মান রক্ষার্থে হত্যা’র অনেক খবর পাওয়া গেছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে দু’জন নারী, কিংবা এক জন নারীর সঙ্গে নারী থেকে পুরুষ হতে-চাওয়া এক রূপান্তরকামীর সহাবস্থান আজও কঠিন। রূপান্তরকামী অধিকার রক্ষা সংশোধনী আইন ২০২৬-এ এই বিষয়টিকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে রূপান্তরকামীদের একটা বড় অংশকে অসম্মান করছে সরকার। এই অমানবিক ও স্বৈরতান্ত্রিক আইন সামগ্রিক ভাবেই বিপন্ন করছে রূপান্তরকামীদের। তার মধ্যেও বিশেষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারী থেকে পুরুষ হতে-চাওয়া মানুষেরা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন