মরহুম চিন্তক-সাহিত্যিক কাজী আবদুল ওদুদ, শ্রীচরণেষু,
আপনি চিরনিদ্রায় শায়িত আজ পঞ্চাশ বছরেরও বেশি। তবু আপনাকে কেন চিঠি লিখছি? লিখছি ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর শতবার্ষিকী উপলক্ষে। এর প্রতিষ্ঠা ও ১৯২৭ সালে শিখা পত্রিকার প্রবর্তনা বাঙালির বৌদ্ধিক জীবনের ইতিহাসে এক স্বর্ণময় অধ্যায়। আজ তার একশো বছর পূরণ হল। এই সূত্রে আপনাদের তর্ক-বিতর্ক পড়তে গিয়ে আমার চিঠি লিখতে ইচ্ছে করল।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ ও শিখা গোষ্ঠীর নায়কদের মধ্যে আপনিই একমাত্র আমার স্বচক্ষে দেখা মানুষ। দেশভাগের পরে, ১৯৫০-এর দশকে। কলকাতায় পার্ক সার্কাস অঞ্চলে তারক দত্ত রোডে আপনি সস্ত্রীক থাকতেন। তখন আমার বয়স বড়জোর দশ। দেখতাম, আপনি রোজ হেঁটে যেতেন, পরনে সাদা ধবধবে পাটভাঙা ধুতি-পাঞ্জাবি (পরে জেনেছি তখনও দুই দিকের বাঙালি মুসলমান ভদ্রলোক ধুতি পরতেন), চলনে ধীর-স্থির চিন্তামগ্নতা। আপনাকে দেখে এক আত্মীয় সম্ভ্রমভরে বললেন, “ওই দ্যাখ, কাজী আবদুল ওদুদ যাচ্ছেন।” হিন্দু-মুসলমান নিয়ে একটি আমরা-ওরা মনোভাবের ঢেউ আমার শিশু মনেও ধাক্কা দিত। ‘কাজী আবদুল ওদুদ’ যে হিন্দুর নাম নয়, বুঝতাম। পার্ক সার্কাসে তখনও অনেক শিক্ষিত মুসলমান পরিবারের বাস।
আপনার সঙ্গে নতুন করে পরিচয় হল স্কুলে। আপনার “বাংলার নবজাগরণ” আমাদের পাঠ্য ছিল। তত দিনে বাঙালি মুসলমান লেখকদের রচনা বাঙালির পাঠ্যপুস্তক থেকে ঝরে গেছে। আপনার লেখা রয়ে গিয়েছিল। আপনি নিজেও দেশভাগের পরের জীবনটা সাধ করে পশ্চিমবঙ্গে কাটিয়েছেন।
আপনাদের লেখা পড়লে মনে হয়, আপনাদের সময়ে, ওই ১৯২৬/৭-১৯৩১ সালে— হিন্দু ও মুসলমানের পরস্পরের প্রতি বহু অভিযোগ সত্ত্বেও— দেশভাগ অকল্পনীয় ছিল। মুসলমান ও হিন্দু একই সঙ্গে বসবাস করতে বাধ্য, এটা ধরে নিয়েই তখন আপনারা বাঙালি মুসলমানের আধুনিকতার সমস্যাটি ভাবতেন। ভাবতেন যে, রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বাঙালি হিন্দুর যে আধুনিকতা ও জাতীয়তাবাদ, তাতে বাঙালি মুসলমান কত উপেক্ষিত, অবহেলিত, প্রায় বিস্মৃত। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর নানান লেখায় এই অভিযোগ মেনেও নিয়েছেন। অবাক লাগে, ১৮৭৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্র যখন ‘বন্দে মাতরম্’ সঙ্গীতে লিখলেন ‘সপ্তকোটিকণ্ঠ-কলকলনিনাদকরালে, দ্বিসপ্তকোটিভুজৈর্ধৃতখরকরবালে’, তখন এক বার ভুল করেও তাঁর মনে হল না যে ১৮৭২ ও ১৮৮১ জনশুমারিতে গণনা করা এই সাত কোটি কণ্ঠের, আর দ্বিসপ্তকোটি হাতের মধ্যে অর্ধেকের বেশি কণ্ঠ আর হাতের মালিক মুসলমান-বাঙালি?
১৯৪০-এর সময় পাকিস্তান আন্দোলন এসে এই বিস্মৃতির উত্তর হিসেবে বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের একটি সম্ভাবনা খুলে দিল। বলা যায়, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সেই সার্বভৌমত্বের বিকাশেরই ইতিহাস। তবে ১৯২৬-১৯৩১, এই বছরগুলিতে কিন্তু আপনাদের চিন্তার শর্ত ছিল অন্য। আপনারা ভাবতেন বাঙালি মুসলমানের ও হিন্দুর রাজনৈতিক ও জাতিগত সার্বভৌমত্বের সাধনা পরস্পরের হাত ধরেই করতে হবে। তাই আপনাদের চিন্তা ততটা সরাসরি রাজনৈতিক নয়, বরং সাংস্কৃতিক। ১৯৩৫ সালে লিখলেন, “এই দুই [হিন্দু ও মুসলমান] ভাগ্যবিড়ম্বিত দলের বিরোধ বর্তমানে এমন দশায় পৌঁছেচে যে একটিকে নির্মূল করে’ বিরোধশান্তির কথা ভাবা অপরটির পক্ষে বিচিত্র নয়।... এ আসলে সম্ভবপর নয়। দেশের হিন্দু ও মুসলমান কারও গায়ে এত জোর নেই যে অপরকে পর্যুদস্ত করতে পারে। তাই সে চেষ্টায় অগ্রসর হলে কিছুকাল মারামারি ও তার পর রেষারেষি এই হবে সার।”
হিন্দু-মুসলমান বিরোধের ক্ষেত্রে আপনার আলোচনা যে-হেতু সাংস্কৃতিক সূত্র থেকে শুরু হয়, আমি আপনার চিন্তার মধ্যে পাঁচটি বৈশিষ্ট্য দেখি যা আমাকেও আমার চিন্তার প্রকল্প বুঝতে সাহায্য করে। এই পাঁচটি গুণ হল— তীব্রতার প্রতি অনাসক্তি; চিন্তার সততা ও সাহস; যাঁদের সমালোচনা করছেন, তাঁদের থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে না-দেখা; জনকল্যাণের কথা সব সময় সামনে রাখা; এবং, নিজেকে সংখ্যাগরিষ্ঠের অংশ বলে না ভাবা।
আলোচনায় তীব্রতা পরিহার করা: মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীকে বাংলা ১৩৪৪ সনে লেখা একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “আপনি দুঃখ করেছেন এই বলে যে অতীত-প্রীতির অভাব তীব্রভাবে আমার ভিতরে দেখতে পেলেন না।” লিখেছেন, “আপনার দুঃখ বোঝা কঠিন নয়। কিন্তু তীব্রতাকেই যে আমি ভয় করি, সকলেরই ভয় করা উচিত।” ‘তীব্রতা’ বলতে আপনি একপেশে, একচক্ষু বিচারবুদ্ধি বুঝিয়েছিলেন। বিশ্বভারতীতে “হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ” নিয়ে বক্তৃতা করতে গিয়েও আপনি বলেছেন: “মধ্যযুগের সমন্বয়কারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান বোধহয় কবীরের ও তাঁর পরে দাদু ও রজ্জবজীর।... তাঁদের চিন্তা... চরম রূপ নয়। সব বিক্ষোভের ভিতরে সত্যকে শান্ত হয়ে দেখবার সঙ্কেত এ সবে আশ্চর্যভাবে সঞ্চিত আছে।”
চিন্তায় সততা ও সাহসিকতা: আপনি নিন্দা বা ঝাঁঝালো সমালোচনা সহ্য করতে রাজি ছিলেন। ‘সম্মোহিত মুসলমান’ প্রবন্ধটি প্রকাশ করে আপনি যে মাসিক মোহাম্মদী-র রোষানলে দগ্ধ হয়েছিলেন। তবু নিজের সম্প্রদায়ের সমালোচনা এক রকম করা যায়, শিখা গোষ্ঠীর অন্যরাও তা করেছেন। কিন্তু যে সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিরোধ, তাঁদেরই আমন্ত্রণে বক্তৃতা করতে গিয়ে তাঁদেরই সম্বন্ধে অপ্রিয় সত্য কথা বলা অনেক কঠিন। কিন্তু আপনি তো সহজ পথের পথিক নন। অথচ কী অনায়াসে আপনি রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ প্রমুখের ধর্মান্দোলনকে আপনি নিজেরই ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার বলে মানেন (ঠিক যেমন ভক্তি আন্দোলনের কবীর বা দাদূকেও), আবার একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন, এই প্রবক্তারা যখন বলেন, “হিন্দু-সভ্যতা জগতের শ্রেষ্ঠ সভ্যতা”, তখন সেই হিন্দুত্ব মুসলমানের চোখে একটি ‘রুদ্র’ রূপ নেয়। “হিন্দুদের এই যে রুদ্র মূর্তি তার সঙ্গে ইসলামের ওহাবী মতের আশ্চর্য মিল রয়েছে। দুয়ের উৎপত্তির সূত্র একই। মুসলমান জগতের শক্তিহীনতা থেকে ওহাবী প্রতিক্রিয়া জন্মলাভ করেছে, তেমনি হিন্দুর যুগযুগান্তরের শক্তিহীনতা ও ব্যর্থতা থেকে জন্ম হয়েছে এই রুদ্র হিন্দুত্বের।”
বিশ্বনাগরিকতা: আপনার আধুনিক ‘কসমোপলিটান মন’ সব ট্র্যাডিশন থেকেই ভালটুকু আহরণ করতে চায়। মুসলিম সাহিত্য সমাজের চতুর্থ বার্ষিক অধিবেশনে পঠিত ‘গ্যেটে’ বলে প্রবন্ধে বলেছিলেন, “গ্যেটের ভিতরে স্বজাতিপ্রেমের তীব্রতা ছিল না”। বিশ্বমানবিকতা ও গভীর মুসলমানত্বের বোধ, কোনওটাই ছাড়তে চাননি আপনি।
আপনার প্রেমতত্ত্ব: ১৯৪৬ সালে এস ওয়াজেদ আলীর গুলিস্তাঁ-সাহিত্য-চক্রের পঞ্চম অধিবেশনে— পাকিস্তান আন্দোলন তখন জোরালো— আপনি একটি প্রবন্ধ পড়লেন, ‘গৃহযুদ্ধের প্রাক্কালে’। প্রবন্ধে হাফিজকে বর্ণনা করলেন ‘প্রেমপন্থীদের গুরু’ বলে। শুধু এখানে নয়, আপনার সমস্ত রচনার জমিনেই যেন এই প্রেম বা প্রীতির চুমকি বসানো। আপনি ভূমাকে স্পর্শ করতে চান, আগে মানুষ পরে মুসলমান হতে চান, এবং দুই-ই হতে চান গভীর ভাবে, এই হয়ে ওঠা কখনও সম্পূর্ণ হতে পারে না একটি শর্ত যদি পালিত না হয়, অর্থাৎ, ‘যদি প্রেম দিলে না প্রাণে’! হিন্দু-মুসলমানের বিরোধিতা বোঝাতে গিয়ে আপনি বলেন, “আমাদের দেশের রাজনৈতিক অসার্থকতার মূলে আমাদের শিক্ষিতদের শোচনীয় আত্মসর্বস্বতা ও অপ্রেম।” ‘অপ্রেম’ অর্থ কী? “দেশ বলতে যে বহু শ্রেণির বহু মানসিক স্তরের লোক বোঝায়, আর দেশসেবা বলতে যে সেই সব মানুষের উন্নয়নের জন্য অক্লান্ত সাধনা বোঝায়, এমন কথা... যাঁরা রাজনৈতিক ক্ষেত্রের কর্মী... তাঁদের বোঝানো সম্ভবপর হয়নি।”
সংখ্যাগরিষ্ঠের অবস্থান প্রত্যাখ্যান করা: আবদুল কাদিরকে চিঠিতে লিখেছেন, যদি নির্বাচন হয়, আপনি মুসলমানদের জন্য ‘স্বতন্ত্র-নির্বাচন’ নয়, বরং ‘মিশ্র-নির্বাচন’ চান। গোটা ভারতবর্ষ ধরে ভাবলে মুসলিমরা সংখ্যালঘু, আপনার ভাষায় ‘ছোট দল’ ও হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, ‘বড় দল’। “রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রভুত্ব করার বাসনা ত্যাগ করা বড়দলের পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার” কারণ তাঁরা ‘সংখ্যাগুরুত্বের অভিমানী’। সেই অভিমানেই দেশভাগ হয়েছে। কোনও গোষ্ঠীরই মনে হয়নি, সংখ্যালঘু অবস্থায় তাদের কল্যাণ হতে পারে। আপনি কিন্তু পার্টিশনের পরে ‘সংখ্যাগুরুত্বের অভিমান’ ছেড়ে দিয়ে কলকাতায় সারা জীবন কাটিয়ে স্বেচ্ছায় ‘সংখ্যালঘু’ মানুষ হয়েছিলেন। এর মধ্যে আমি অত্যন্ত জরুরি এক নৈতিকতার হাতছানি দেখতে পাই।
আপনার চিন্তাভাবনায় আজকের বিশ্বায়িত পৃথিবীতে বসে বাঙালির ইতিহাস নিয়ে চিন্তা করার জন্য একটি অবস্থান ও উপায় খুঁজে পাই আমি। এ যেন এক মুকুরিত প্রতিচ্ছবি— আরশিতে আমাদের ছবির যেমন বাঁ দিকটা ডান দিক হয়ে যায়, সেই রকম। আপনার শিখা-র সময় ও আমার সময়ের মধ্যে একটি পরিখার মতো বয়ে গেছে দেশভাগের রাজনীতি, যা বাঙালি মুসলমান জীবনে ‘হিন্দুর আধিপত্য’ হটিয়ে একটি সার্বভৌম জাতীয় জীবন সৃষ্টি করল। সেই ঐতিহাসিক সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা নিয়েই বাঙালির বৃহত্তর ইতিহাসে হিন্দু-মুসলমান বিরোধ ও তার সম্ভাব্য নিষ্পত্তির কথা ভাবতে হয়। ভাবি, ১৯৭১ না হলে কি পরস্পরকে এমন নতুন করে আবিষ্কার করা যেত? আবার ভাবি, সেই বন্ধুত্বের মধ্যেই অনেক পার্থক্যের চোরা স্রোতে সাঁতার দিয়ে তা জিইয়ে রাখতে হয়। হিন্দু ও মুসলমান বাঙালি বহু দিনের পড়শি। সেই ইতিহাস এই ভাগ-হওয়া দেশের ইতিহাসের চেয়ে অনেক বড় ও গভীর।
তাই বলছিলাম, দুই যুগের মানুষ হয়েও বাঙালি মুসলমান ও বাঙালি হিন্দুর ইতিহাস ভাবনায় আমাদের মিল আছে। আপনি ভেবেছেন, হিন্দু ও মুসলমান উভয় বাঙালির কালচারই আপনার ঐতিহ্য। আমি বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিদের এক জন, আমারও দুই বাঙালিকেই নিজের ঐতিহ্য বলে মনে হয়। আপনাকেও নিজের পূর্বপুরুষ বলেই ভাবি। আপনার লেখা থেকে শিখি। তাই শিষ্য একলব্যের মতো মনের মধ্যে আপনাকে দ্রোণাচার্যের আসনে বসিয়ে এই চিঠি লিখলাম। ইতি।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে