অপরাধের শিকারদের ক্ষতিপূরণে আইন

রাষ্ট্র শুধু কোনও অপরাধের বিচার করেই তার দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। অপরাধমূলক কাজের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের পুনর্বাসন করাও সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। নিজেদের প্রাপ্য সম্পর্কে সচেতন থাকুন নির্যাতিতেরা। লিখছেন তপনকুমার কর আবার মা’কে খুন করার অপরাধে বাবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। আদালত তাদের নাবালক ছেলেমেয়ের ভরণপোষণের   জন্য জেলা আইনি পরিষেবা আধিকারিককে নির্দেশ দিয়েছে।

Advertisement
শেষ আপডেট: ২৪ অগস্ট ২০১৯ ০১:৫০
Share:

এক অ্যাসিড আক্রান্ত তরুণীর হাতে অর্থ সাহায্য তুলে দিচ্ছেন এক পুলিশ আধিকারিক। বোকারোয়। ফাইল চিত্র

গরমের জন্য রাতে জানালা খুলে রাতে ঘুমোচ্ছিল একটি মেয়ে। কে বা কারা জানলা দিয়ে তার মুখে অ্যাসিড ছুড়ে দেয়। নষ্ট হয়ে যায় তার মুখ। থানায় অভিযোগ জানানোর সঙ্গে সঙ্গে জেলা আইনি পরিষেবা আধিকারিকের কাছে সাহায্যের আবেদন জানায় সে। এক সপ্তাহের মধ্যে তাকে এক লক্ষ ও পরে আরও দু’লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয় প্রশাসন।

Advertisement

আবার মা’কে খুন করার অপরাধে বাবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে। আদালত তাদের নাবালক ছেলেমেয়ের ভরণপোষণের জন্য জেলা আইনি পরিষেবা আধিকারিককে নির্দেশ দিয়েছে। তারাও ক্ষতিপূরণ বাবদ রাষ্ট্রের কাছ থেকে সাহায্য পাবে।

এ সবই সম্ভব হয়েছে অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ আইনের জন্য। এ ছাড়াও ফৌজদারি কার্যবিধিতে ৩৫৭ ক ধারা যোগ করে অপরাধের শিকার বা অপরাধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা তাদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার রীতি চালু হয়েছে। বিচারক অপরাধের জন্য আরোপিত অর্থদণ্ডকে প্রয়োজনবোধে, অপরাধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির জন্য ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য করতে পারেন।

Advertisement

ধর্ষণের কারণে কোনও সন্তান জন্ম নিলে সেই সন্তানের ভরণপোষণের ব্যয় রাষ্ট্রের উপরে দেওয়া হয়। একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের নীতি বা ধারণা থেকে রাষ্ট্র এই দায়িত্ব নিয়েছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। এ জন্য সরকার তার নাগরিকদের কাছ থেকে করও নিয়ে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে এটা বলা অনুচিত হবে না যে, যেহেতু অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে সে হেতু তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ক্ষতিপূরণের অর্থ সরকার প্রাথমিক ভাবে অপরাধীর কাছ থেকে আদায় করবে। তা যদি সম্ভব না হয়, তা হলে সরকার কোষাগার থেকে এই অর্থ অপরাধমূলক কার্যকলাপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের প্রদান করতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র শুধু কোনও অপরাধের বিচার করেই তার দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। অপরাধমূলক কাজের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের পুনর্বাসন করাও সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। যেমন কোনও পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যদি নিহত হন, তা হলে অপরাধী ব্যক্তিকে আইনানুগ শাস্তি দিলেই হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তির পরিবারের প্রতি ‘সুবিচার’ হয় না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তাঁরা পরবর্তীকালে চরম আর্থিক সমস্যায় পড়েন। এ জন্য অপরাধের শিকার ব্যক্তি অথবা ক্ষেত্র মতে তাঁর উপরে নির্ভরশীলদের জন্য যদি সরকার জরিমানা আদায় করে তাঁদের দেয়, তা হলে কিছুটা হলেও সেই পরিবারের কষ্ট লাঘব হয়।

এক জন বিচারক ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করার সময় অপরাধের শিকার ব্যক্তির আঘাত, ব্যথা ও দুর্ভোগ, চিকিৎসা খরচ, সম্পত্তির ক্ষতি, আঘাতের কারণে কতদিন কাজে যোগদান করা যায়নি অথবা একাধারে কর্মহীন হয়ে গেলেন কি না, এ সব বিষয় বিবেচনা করে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারেন। যে ক্ষেত্রে অপরাধের শিকার ব্যক্তি মারা যান, সে ক্ষেত্রে তাঁর আয়ের উপরে তাঁর পরিবার কতটা নির্ভরশীল, নিহত ব্যক্তির বয়স ও যোগ্যতা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করবেন। অ্যাসিড আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট ২০১৫ সালে লক্ষ্মী বনাম ভারত সরকার মামলাতে ক্ষতিপূরণ ঠিক করার জন্য জেলা জজ, জেলাশাসক, জেলার পুলিশ সুপার ও জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিককে নিয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। এখন জেলা বা রাজ্য আইনি আধিকারিক অভিযোগ পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে এক লক্ষ টাকা ও তার দু’মাসের মধ্যে আরও দু’লক্ষ টাকা অ্যাসিড আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রদান করতে পারেন।

এ ছাড়া, ভারতীয় দণ্ড সংহিতার ৩২৬ ক, ৩৫৪ ক, ৩৫৪ ঘ, ৩৭৬ ক, ৩৭৬ ঊ, ৩০৪ খ ও ৪৯৮ ক ধারার অপরাধে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষতিপূরণের জন্য জেলা বা রাজ্য আইনি আধিকারিকের কাছে আবেদন করতে পারেন। আবেদনের সঙ্গে পুলিশের কাছে জমা দেওয়া দরখাস্ত বা আদালতে দেওয়া দরখাস্তের প্রতিলিপি দিতে হবে। আবেদন পাওয়ার পরে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষতির পরিমাণ বিচার করে আধিকারিক জীবনহানির ক্ষেত্রে ৫-১০ লক্ষ টাকা, গণধর্ষণের ক্ষেত্রে ৫-১০ লক্ষ টাকা, ধর্ষণের ক্ষেত্রে ৪-৭ লক্ষ টাকা, অস্বাভাবিক যৌন অপরাধের জন্য ৪- ৭ লক্ষ টাকা, ৮০% চিরস্থায়ী অঙ্গহানির ক্ষেত্রে ২-৫ লক্ষ টাকা, ৪০ % - ৮০% চিরস্থায়ী অঙ্গহানির ক্ষেত্রে ২-৪ লক্ষ টাকা, ২০%-৪০% চিরস্থায়ী অঙ্গহানির ক্ষেত্রে ১-৩ লক্ষ টাকা, ২০% এর নীচে চিরস্থায়ী অঙ্গহানির ক্ষেত্রে ১-২ লক্ষ টাকা, গভীর শারীরিক ও মানসিক আঘাতের জন্য ১-২ লক্ষ টাকা, অপরাধের কারণে সন্তান নষ্ট হয়ে গেলে ২-৩ লক্ষ টাকা, ধর্ষণের কারণে গর্ভবতী হলে ৩-৪ লক্ষ টাকা, দেহে অগ্নিসংযোগের ফলে চেহারার পরিবর্তনের জন্য ৭-৮ লক্ষ টাকা, দেহে ৫০% বা তার বেশি অগ্নিসংযোগের জন্য ৫-৮ লক্ষ টাকা, দেহে ৫০% বা তার কম অগ্নিসংযোগের জন্য ৩-৭ লক্ষ টাকা, দেহে ২০% বা তার কম অগ্নিসংযোগের জন্য ২ -৩ লক্ষ টাকা ও অ্যাসিড আক্রমণের ফলে দেহের বিকৃতি ঘটলে ৭-৮ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যাপারে জাতীয় আইনি সংস্থা ২০১৮ সালে নিয়মাবলি তৈরি করেছে।

কোনও ব্যক্তি অপরাধের শিকার হলে এটা বলা যায় যে, রাষ্ট্র তাকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের তার জন সাধারণকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য জনগণের সঙ্গে যে উহ্য সামাজিক চুক্তি (কর ও রাজস্বের বিনিময়ে জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি) থাকে, তা ভঙ্গ হয়। এ জন্য অপরাধমূলক কাজের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের পুনর্বাসন করাও সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ আইনের মাধ্যমে সরকার সেই দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হয়েছে।

লেখক পুরুলিয়ার আইনজীবী

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement
আরও পড়ুন