Kalyani Dutta

সম্পাদক সমীপেষু: লেখিকার সঙ্গস্মৃতি

এ রকম আরও অনেক স্মৃতি আজও মনে ভিড় করে। বলেছিলেন, এমএ পড়ার সময় ক্লাস শেষে প্রায় প্রতি দিনই কলেজ স্ট্রিটে বই দেখতে যেতেন। বইপাড়ায় শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটের ‘ক্যালকাটা ওল্ড বুক স্টল’-এ তাঁর যাতায়াত ছিল সবচেয়ে বেশি।

শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ০৮:৩৮
Share:

রুশতী সেনের ‘শৃঙ্খল-বন্ধনের কথকতা’ (১৪-৬) শীর্ষক প্রবন্ধটি বেশ স্মৃতিমেদুর করে তুলল। একটা সময় দুষ্প্রাপ্য বইপত্র দেখার নেশায় প্রায়ই ছুটে যেতাম কল্যাণী দত্তের বাড়িতে। হাজরা মোড়ে বহু পুরনো বইয়ের দোকানের গা ঘেঁষে কয়েক পা এগোলেই ওঁর তিনতলা বাড়ি— আপাদমস্তক বইয়ে ঠাসা। কেউ গেলে আগ্রহ নিয়ে বই দেখাতেন। তবে একটি শর্ত ছিল। বই সেখানেই বসে দেখতে হবে, ঘরের বাইরে নিয়ে যাওয়া চলবে না। বই দেখানোর পাশাপাশি গল্পও করতেন এই সদালাপী মানুষটি। এত বড় বাড়িতে পরিচারিকাকে নিয়ে তিনি একাই থাকতেন। সঙ্গী বলতে শুধু বই আর বই। সেই বইয়ের মধ্যেই বসে লিখেছিলেন ঘর-গেরস্তালির অনন্য দলিল থোড় বড়ি খাড়া (ছবিতে প্রচ্ছদ) এবং আরও কত স্মরণীয় গ্রন্থ।

তাঁর জীবনে আক্ষেপও ছিল অনেক। বলতেন, দেখতে নাকি সুশ্রী ছিলেন না বলে ছোটবেলায় দাদা-দিদিরা তাঁকে খেলায় নিত না। শিশুমনে সেই অবহেলার গভীর আঘাত এক দিন ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। অভিমানে তিনি বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। পরে এক পরিচিত ব্যক্তি তাঁকে দেখতে পেয়ে বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন।

কলেজে পড়ার সময় তিনি ঋগ্বেদ-এর ঋষিকা অপালার কাহিনি পড়েন। তারই ফলস্বরূপ তিনি লিখেছিলেন সোমলতা। মুখবন্ধে লিখেছিলেন, “অপালার বঞ্চনার সঙ্গে নিজেকে হয়তো বা অজানতে এক করেই ফেলেছিলুম। এক কালে সমর্পিতাকে ফিরিয়ে দেওয়া অপরাধ বলেই গণ্য করা হত। কিন্তু ইন্দ্রর তো কোনও অপরাধবোধও হয়নি। সে কারণেই লিখেছিলুম ‘সোমলতা’। কিন্তু ছাপাতে তেমন কেউ আগ্ৰহী হননি আর আমিও কিছুটা কুণ্ঠায় লেখাটা ফেলেই রেখেছিলুম। তখন ছাপলে হয়তো লোকে রে রে করে উঠত, এখন হয়তো করবে না।”

এ রকম আরও অনেক স্মৃতি আজও মনে ভিড় করে। বলেছিলেন, এমএ পড়ার সময় ক্লাস শেষে প্রায় প্রতি দিনই কলেজ স্ট্রিটে বই দেখতে যেতেন। বইপাড়ায় শ্যামাচরণ দে স্ট্রিটের ‘ক্যালকাটা ওল্ড বুক স্টল’-এ তাঁর যাতায়াত ছিল সবচেয়ে বেশি। অনেকে সংক্ষেপে বলতেন ‘সিও’, আবার কেউ বলতেন ‘ইউসুফের দোকান’। সেখানে এমএ-র ইতিহাসের বই বলতে মূলত মিশর, সিরিয়া ও ব্যাবিলন নিয়ে বই পাওয়া যেত। বাকি সবই ভারততত্ত্ব— দি ইম্পিরিয়াল গেজ়েটিয়ার অব ইন্ডিয়া-র ছাব্বিশ খণ্ড, বিদেশি বণিক ও পর্যটকদের বিবরণ ইত্যাদি। এই বইয়ের দোকানের সঙ্গে তাঁর এমনই সখ্য গড়ে উঠেছিল যে, ১৯৪৮ সালে হাজার-দু’হাজার টাকা মূল্যের দুষ্প্রাপ্য বইও তিনি দোকানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেখে পড়ার সুযোগ পেতেন। কেনার কথা ভাবার অবকাশ ছিল না। নিজের মুখেই বলেছিলেন, তখন এমন অবস্থাও ছিল যে, বটুয়ায় আট আনার বেশি থাকত না।

ধ্রুবজ্যোতি মণ্ডল, কলকাতা-৩৪

কথক ঠাকরুন

রুশতী সেনের ‘শৃঙ্খল-বন্ধনের কথকতা’ প্রবন্ধটি আমাকে বিশেষ ভাবে ছুঁয়ে গেল। বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে কল্যাণী দত্ত ছিলেন এক ব্যতিক্রমী সুলেখিকা। সরস্বতীর আশীর্বাদে তাঁর অন্তর্লোক ছিল জ্ঞান, মনন ও সৃষ্টিশীলতার দীপ্তিতে উজ্জ্বল। তাঁর সাহিত্যচর্চার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে বাঙালি মধ্যবিত্ত সংসারের অন্তর্জীবনকে তুলে ধরা। গৃহস্থ পরিবারের নারীদের নিত্যদিনের জীবনযাপন, সুখ-দুঃখ, আচার-আচরণ এবং বিস্মৃত সামাজিক ইতিহাসই হয়ে উঠেছিল তাঁর লেখার মূল বিষয়।

থোড় বড়ি খাড়া তাঁর বহুল জনপ্রিয় গ্রন্থ। সেখানে বাঙালির নানান রকম রান্না ও গৃহসংস্কৃতির মধ্য দিয়ে তিনি নারীর অবস্থান, ভূমিকা ও সামাজিক বাস্তবতাকে অনন্য দৃষ্টিতে তুলে ধরেছেন। পিঞ্জরে বসিয়া এবং গত দিনের যত কথা গ্রন্থে বিধবাদের গঞ্জনা, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, দাস-দাসীদের জীবন, প্রবীণ মানুষের অভিজ্ঞতা— সবই অসাধারণ সহজ ভাবে ও সংবেদনশীলতায় ফুটে উঠেছে।

কলকাতার শিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারেই তাঁর বেড়ে ওঠা। জীবনের শেষ দশকে যেন তিনি বাঙালির এক কথক ঠাকরুনে পরিণত হয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, লোকমুখে প্রচলিত গল্প, হারিয়ে যেতে বসা আচার ও স্মৃতি সংগ্রহ করে তিনি সেগুলিকে সাহিত্যরূপ দিয়েছিলেন। না-পাওয়ার মধ্যেও কী ভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, অতি সাধারণ উপকরণ দিয়েও কী ভাবে জীবনকে সুন্দর করে তোলা যায়— কল্যাণী দত্ত তাঁর মর্মস্পর্শী, ক্ষুরধার লেখনীতে সেই শিক্ষাই দিয়ে গিয়েছেন। বৃহত্তর ইতিহাসের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনকথাও যে সমান গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর সাহিত্য সেই সত্যেরই সাক্ষ্য বহন করে। ‘আপনি আচরি ধর্ম’-এর আদর্শে বিশ্বাসী এই মানুষটি নিজের জীবন দিয়েই দেখিয়ে গিয়েছেন, মনন, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার সমন্বয়েই এক জন প্রকৃত সাহিত্যিক হয়ে ওঠেন।

অনীতা চৌধুরী, শ্রীরামপুর, হুগলি

নদীর মতোই

ধন্যবাদ জানাই রুশতী সেনের ‘শৃঙ্খল-বন্ধনের কথকতা’ প্রবন্ধটির জন্য। কল্যাণী দত্ত লিখেছেন মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের অন্দরমহল, রসুইঘর এবং সেখানে বেঁচে থাকা মানুষগুলির কথা। ঠিক যেমন ভাবে মা, জেঠিমারা রান্নাঘরে কাজ করতে করতে গল্প করেন, হাসেন, অভিমান করেন, তেমনই স্বাভাবিক ভাষায় তিনি সেই কথাগুলি লিখে গিয়েছেন। কোথাও কৃত্রিমতা নেই, একটুও অলঙ্কারের বাড়াবাড়ি নেই। রান্নার মশলার গন্ধের সঙ্গে মিশে গিয়েছে মেয়েদের সুখ-দুঃখ, রাগ-অভিমান, হাসি-কান্না আর সংসারযাপনের অজস্র অনুচ্চারিত কথা।

ছিটমহল-এ পাওয়া যাবে দাসী-দিদাদের কথা, কলের গানের কথা, পুরনো কলকাতার জলছবি, ট্রামের কথা, নারীর অন্দরমহলের খুঁটিনাটি জীবনকথা। পড়তে পড়তে মনে হয়, এগুলি কোনও দূরের গল্প নয়; এ যেন আমাদেরই ঘরের কথা, আমাদেরই মুখের ভাষা। থোড় বড়ি খাড়া বইটিতেও রয়েছে একেবারে ঘরোয়া জীবনের গল্প, যার আকর্ষণ আজও অমলিন। চরিত্রগুলির মুখের ভাষা তিনি এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন যে, মনে হয় তারা যেন চোখের সামনেই কথা বলছে। নবনীতা দেব সেনের লেখা যেমন কোথাও হোঁচট না খেয়ে একটানা পড়ে যাওয়া যায়, কল্যাণী দত্তের গদ্যও তেমনই সাবলীল ও অনায়াস।

কল্যাণী দত্তের লেখা নদীর জলের মতো তরতর করে বয়ে চলে। তবে আক্ষেপ হয়— এত সুন্দর বইগুলি আজ কত জন পড়েন? অজস্র মধ্যমেধার ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ়-এর ভিড়ে ক্রমশ যেন পাঠাভ্যাস এবং রুচির পরিসরই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে।

সর্বানী গুপ্ত, বড়জোড়া, বাঁকুড়া

আশায় বাঁচা

অভিরূপ সরকারের ‘সরকার চাইলেই শিল্পায়ন?’ (১৬-৬) শীর্ষক প্রবন্ধটি পড়লাম। বিগত সরকারের আমলে শিল্পের প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি— এর একটি কারণ হিসাবে অনেকেই সিঙ্গুর থেকে টাটাদের সরে যাওয়ার ঘটনাকে দায়ী করেন। তাঁদের মতে, ওই ঘটনার পর সম্ভাব্য নতুন শিল্পপতিরা এ রাজ্যে বিনিয়োগে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। তবে এও মনে রাখা প্রয়োজন যে, জমি-সংক্রান্ত মামলায় বিচারপতি চাষিদের পক্ষেই রায় দিয়েছিলেন এবং তার পরেই টাটারা ন্যানো কারখানা গুজরাতে নিয়ে যান।

এখন প্রশ্ন, নতুন সরকার এই রাজ্যে শিল্প আনতে কতটা সফল হবে? কেন্দ্র চাইলে আদানি ও অম্বানীদের মতো বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলিকে গুজরাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি বাংলাতেও শিল্প গড়ে তোলার জন্য উৎসাহিত করতে পারে। কারণ, একটি রাজ্যের উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত সমগ্র দেশেরই উন্নয়ন। তবে আশাতেই মানুষ বাঁচে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর মধ্যে উদ্দীপনার অভাব নেই। তাই আশা, বাংলায় নতুন করে শিল্পায়নের জোয়ার আসবে। সতর্ক থাকতে হবে— কোনও অবস্থাতেই যেন সিন্ডিকেট রাজ ফিরে না আসে।

অরুণ গুপ্ত, কলকাতা-৮৪

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন