‘নিবিষ্ট পাঠকের অনুসন্ধানে’ (২-২) শীর্ষক প্রবন্ধে দীপঙ্কর ভট্টাচার্য ঠিকই বলেছেন যে, সমাজমাধ্যমের এই আগ্রাসন-পূর্ব যুগে নিবিড় ভাবে বই পাঠের সুখই ছিল মানুষের বিনোদন। এও ঠিক যে, মোটের উপর বাধ্য না-হলে আজকের তরুণ প্রজন্ম বই পড়ে না। লাইব্রেরিগুলোর শোচনীয় হাল বইপাঠে অনীহাকেই সামনে আনে। পাঠাগার আজ বিলুপ্তির পথে। অধিকাংশই ধুঁকছে পাঠকের অভাবে। পাঠের সুখ বা মুক্তির দিশা পেতে আজ আর পাঠাগারমুখো হয় না বাড়ির মেয়েরা। লাইব্রেরিতে দেখা মেলে না সেই ‘বইপোকা’দের।
দামিনী (চতুরঙ্গ), সত্যবতী (প্রথম প্রতিশ্রুতি) বা সুবর্ণলতা (সুবর্ণলতা)-রাই নয়, নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘লেখিকা’ গল্পের সৌদামিনীও কবিতা লেখার অপরাধে স্বামীর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। সহ্য করতে না পেরে স্বামীকে বলেছে, “তোমার পা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করছি, আমি আর কবিতা লিখব না। তুমি আমায় রেহাই দাও।” সুচিত্রা ভট্টাচার্যের অদিতিও (হেমন্তের পাখি) সাহিত্যসাধনার জন্য তার স্বামীর ভর্ৎসনা সহ্য করতে না পেরে এক সময় লেখালিখি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে অবশ্য আত্মোপলব্ধিতে অসাধারণ এক আত্মশুদ্ধি ঘটে তার; লেখা ও পাঠেই সে মুক্তি খুঁজেছে। একই রকম ভাবে শৈলবালা ঘোষজায়ার তেজস্বতী উপন্যাসের তৃপ্তি ও সুধা লেখাপড়া করলে অকালকুষ্মাণ্ড দাদার বিদ্রুপবাণে বিদ্ধ হয়। অনেক কষ্ট করে তারা পড়াশোনা চালিয়ে যায়। আবার সাহিত্যপাঠে এক অপূর্ব রস আস্বাদনের অধিকারী হতে দেখি বুদ্ধদেব বসুর তিথিডোর উপন্যাসের স্বাতীকে। সে বাবার থেকে পয়সা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের মানসী, চিত্রা, কল্পনা, ক্ষণিকা, বলাকা প্রভৃতি গ্রন্থ কেনে। স্বাতীর তরুণ মন শরৎচন্দ্র পাঠে বিভোর হয়। পাঠে অত্যুৎসাহী স্বাতীকে দেখে তার বাবা এক সময় বলেন, “আজকাল তোকে যখনই দেখি, তখনই পড়ছিস। এত পড়া কি ভালো?” পরবর্তী কালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পূর্ব-পশ্চিম উপন্যাসের তুতুলকেও দেখি রবীন্দ্রনাথ পাঠে একান্ত মনোযোগী হতে। লেখক সেখানে জানাচ্ছেন, “তুতুল বাড়ি থেকে বেরোয় না, এমনকি ছাদেও যায় না। এখন তার একমাত্র বন্ধু রবীন্দ্রনাথ।”
তবে, আজ প্রযুক্তির সর্বব্যাপী বিস্তারের যুগে নেট-বিভোর তরুণমন বইয়ের পাতায় কতটা আশ্রয় খোঁজে, তা নিয়ে কিন্তু সন্দেহ একটা রয়েই যায়। বইমেলায় বই বিক্রির হিসাব এ-মনের সঠিক হদিস দিতে পারে কি না, তা নিয়ে রয়েছে বিরাট ধাঁধা।
সুদেব মাল, খরসরাই, হুগলি
মুঠোফোন বন্দি
দীপঙ্কর ভট্টাচার্যের ‘নিবিষ্ট পাঠকের অনুসন্ধানে’ শীর্ষক প্রবন্ধটি বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মুঠোফোন থেকে চোখ তুলে বই হাতে নিবিষ্ট চিত্তে পাঠের ছবি দেখতে না-পাওয়ার আক্ষেপ। সত্যি যে, বর্তমানে আমাদের মুঠোফোন-সর্বস্ব জীবন বই থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। বই পড়ার খিদেকে প্রশমিত করে মুঠোফোন খিদে মেটাচ্ছে। আমাদের রাজ্যে বইমেলার সংখ্যা কম নয়। জেলা ও ব্লক স্তরে বইমেলার উদ্যোগ লেগেই থাকে। সঙ্গে রবীন্দ্রসদন চত্বর এবং প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা প্রতি বছরই সংগঠিত হয়। অন্যান্য জেলা বা ব্লক স্তরে তেমন সাড়া না-পাওয়া গেলেও কলকাতার বইমেলায় মানুষের ঢল নামে।
কিন্তু যত বই বিক্রি হচ্ছে সব বই কি সত্যিই নিবিষ্ট চিত্তে পাঠ করা হয়? প্রবন্ধকারের এমন প্রশ্ন সত্যিই উদ্বেগের। কারণ, এখন ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করার মাঝে যেটুকু সময় পায়, তা মুঠোফোন ঘাঁটতেই চলে যায়। বই দেখা বা পড়ার সময় বার করতে তাদের অসুবিধা হয়। কেনা বই তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আলমারিতে সাজানো থাকে। বই পড়ার অভ্যাসটা যে ক্রমশ বিলীন হতে বসেছে, তা গ্রন্থাগারের সংখ্যা কমে যাওয়া দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না। যে ক’টি গ্রন্থাগারের আলো টিমটিম করে জ্বলছে, তাও প্রায় নিবতে বসেছে। অথচ এক সময় গ্রন্থাগার থেকে বই এনে বাড়ির বড়রা কাজের মাঝে সময় পেলেই নিয়মিত পড়তেন। কে কত তাড়াতাড়ি বই শেষ করবে, তার প্রতিযোগিতা চলত। অনুষ্ঠান বাড়িতে উপহার হিসাবে বইয়ের চল ছিল সর্বাধিক।
বই যে একাকিত্বের কত বড় বন্ধু, তা বোধ হয় পরিমাপ করা কঠিন। এ প্রজন্মের আগে পড়ুয়ারা পাঠ্যবইয়ের মধ্যে গল্পের বই লুকিয়ে রেখে পড়ত, যাতে বাবা-মায়েরা না বুঝতে পারেন। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে ছেলেমেয়েরা বই কিনত। যে বই জ্ঞানার্জন, চেতনা বৃদ্ধি ও সংস্কৃতির বাহক, সে বই নিয়ে কালে কালে কবি-সাহিত্যিকরাও ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন। মানুষের মননশীলতা বৃদ্ধিতে, দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারেও নিয়মিত বই পাঠের দরকার। হাতের মুঠোফোনটার অকারণ ব্যবহার ঠিক তার উল্টোটা ঘটিয়ে থাকে।
স্বরাজ সাহা, কলকাতা-১৫০
পাঠকহীন
‘নিবিষ্ট পাঠকের অনুসন্ধানে’ শীর্ষক প্রবন্ধে প্রবন্ধকার একটি প্রাসঙ্গিক ও ভাবনার বিষয় সামনে এনেছেন। সত্যিই নিবিষ্ট পাঠক এখন ক্রমহ্রাসমান।
সত্যি যে, স্কুল-কলেজের লাইব্রেরিতে এখন পাঠক বিরল। কিছু পড়ুয়া সহায়িকা বইয়ের সন্ধান করলেও বাকিরা সেই ঘর এড়িয়ে চলে। তবে ছোটরা ভিড় করে বই নেয়। তাদের প্রধান পছন্দ ভূত, গোয়েন্দা আর কমিক্স। সাধারণ লাইব্রেরিগুলিতে সংবাদপত্র বিশেষ না আসায় দৈনন্দিন পাঠক পাওয়া যায় না। মূল্যবান সব বইয়ের সম্ভার ধুলোমাখা হয়ে পোকাদের পেট ভরাতে থাকে। অথচ এর ভিন্ন ছবি দেখা গেল কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায়। এ বছর ত্রিশ লক্ষেরও বেশি মানুষ বারো দিনব্যাপী মেলায় যত টাকার বই কিনেছেন, তা ভেঙে দিয়েছে আগেকার সব রেকর্ড। নতুন প্রজন্ম হামলে পড়ে কিনেছে মেশিন লার্নিং, রোবোটিক্স, এআই, কল্পবিজ্ঞানের বই। মেলার মাঝেই ফুরিয়ে গেছে বইয়ের স্টক। ‘স্টক আউট’ সামলাতে ছাপাতে হয়েছে আরও। বাসে, ট্রেনে উপচে পড়েছে ভিড়। উৎসাহী পাঠকদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা করতে গিয়ে হিমশিম খেয়েছে আরপিএফ ও কলকাতা পুলিশ। বই-বাজারের জন্য এ বড় আশাপ্রদ চিত্র।
কিন্তু নিবিষ্ট পাঠক চোখে পড়ছে কই! বাসে ট্রেনে বইমুখী মানুষদের দেখা মিলছে কি? সকলেরই চোখ মোবাইল স্ক্রিনে। স্কুলের ছেলেমেয়েদের ক’জন পাঠ্যবই সামলে গল্পের বই পড়ে? ‘দ্রুতপঠন’ এর পাট উঠে গিয়ে গল্প পড়াই এখন বিরল। রামায়ণ মহাভারতের গল্প ওরা পড়ে না। দেখে। তবে, এত বই যাচ্ছে কোথায়! কারা পড়ছে? অনেক বাড়িতেই দেখা যায় মূল্যবান বইয়ের সারি কাচে ঘেরা বইয়ের তাকে ন্যাপথলিনের সুরক্ষাবলয়ে শোভাবর্ধন করছে। তাদের গায়ে ধুলো লাগা তো দূরের কথা, তাদের মধ্যেকার অসংখ্য কালো অক্ষর দিনের পর দিন আলো দেখতে পায় না। তারা যে অদূর ভবিষ্যতে কারও চোখে পড়বে, এমন সম্ভাবনাও ক্ষীণ। ভাবনার বিষয় বইকি!
পার্থ পাল, মৌবেশিয়া, হুগলি
শেষ ট্রেন
বেশ কয়েক মাস হল শিয়ালদহ থেকে কোমাগাতা মারু বজবজগামী রাত এগারোটা দশের ডাউন ট্রেনটি বাতিল করার ফলে দুর্ভোগে পড়ছেন মানুষ। শিয়ালদহ-বজবজ শাখাটি হাজার হাজার নিত্যযাত্রীর যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বেসরকারি সংস্থার কর্মী, হাসপাতালের কর্মী, কারখানার শ্রমিক, ছাত্রছাত্রী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রতি দিন এই ট্রেনের উপর নির্ভরশীল। অনেকেরই কর্মস্থল থেকে ফিরতে রাত সাড়ে ন’টা-দশটা বেজে যায়। বর্তমানে শেষ ট্রেন রাত দশটা চার মিনিটে ছাড়ায় শহরের যানজটে অধিকাংশ যাত্রীর পক্ষেই তা ধরা প্রায় অসম্ভব। ফলে অসংখ্য মানুষ বাধ্য হচ্ছেন ব্যয়বহুল বিকল্প ব্যবস্থা করতে। বৃহত্তর স্বার্থে রাত এগারোটার ট্রেনটি আবার চালুর আবেদন জানাচ্ছি।
সুগত কর্মকার, বজবজ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে