সম্পাদক সমীপেষু: বৈষম্যের ধারাপাত


‘ভারতীয় ক্রিকেট টিম ২৫ রানে জয়ী হয়েছে’ এবং ‘ভারতীয় মেয়েদের ক্রিকেট টিম ২৫ রানে জয়ী হয়েছে’ বলার মধ্যে যে লিঙ্গবৈষম্য টেনে দেওয়ার অভ্যেস, তা কি সত্যিই উপেক্ষণীয়? দুটোই তো ভারতীয় ক্রিকেট টিম, তা হলে হিসেব মতো একটা ‘মেয়েদের টিম’ হলে, অন্যটা ‘ছেলেদের টিম’ বলেও চিহ্নিত হওয়া উচিত।

‘‘দেখেছিস? ও এক জন মেয়ে হয়েও এভারেস্টে উঠল!’’ কেন? ‘হয়েও’ কথাটা কি খুব সম্মান দিচ্ছে? মেয়েরা কি এতটাই কম যে ‘মেয়ে হয়েও’ কোনও দুঃসাহসিক কাজ করলে গালে হাত দিয়ে অবাক হতে হয়! আজও!

ঠিক একই রকম ভাবে, ‘‘ও উচ্চ মাধ্যমিকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছে’’ কথাটার মানে কী? পূর্বপুরুষের ধারা মেনে, ‘মেয়েরা ব্যর্থ প্রাণী’ বলে মেয়েদের আলাদা চোখে দেখা হচ্ছে? কই, আজ অবধি তো কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না, এক জন মেয়ে মাধ্যমিকে প্রথম হয়েছে বলে আলাদা ভাবে একটা ছেলেকে চিহ্নিত করে বলা হয়েছে, ‘‘ও ছেলেদের মধ্যে মাধ্যমিকে প্রথম হয়েছে’’?

নারী-পুরুষ বৈষম্যটা যে এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়েই মনে এবং সমাজে দানা বাঁধে, সেটা ভাবার এবং বোঝার সময় বোধ হয় এসে গিয়েছে।

স্মিতা ভট্টাচার্য  ঘোলা, বাঁকুড়া

 

দাসত্ব

‘বিপন্ন নয় বাংলা, মত বিতর্ক সভার’ (২-৬) শিরোনামে সংবাদের ভাষ্যকার লিখেছেন, ‘‘বিশেষ করে সে ভাষা যদি হিন্দির মতো ‘রাষ্ট্রভাষা’ মর্যাদার বলে বলীয়ান হয়।” কিন্তু আমরা জানি না, হিন্দি কবে ভারতের ‘রাষ্ট্রভাষা’র মর্যাদা পেল? আমরা যতটুকু জানি, সে ধরনের অপপ্রচার করে থাকে ভারতের গো-বলয়ের এক ধরনের স্বার্থান্ধ শক্তি। যারা কেন্দ্রীয় সরকারি আমলা আর অন্ধ-হিন্দি-আগ্রাসনের ক্ষমতাবান নেতাদের ব্যবহার করে হিন্দির জন্য বাজেটে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করিয়ে নেয়, আর নানা চক্রান্তের পরও জনগণনায় বাংলা ভাষা ভারতের দ্বিতীয় জনসংখ্যার ভাষা হলেও তার জন্য একটি টাকাও বাজেটে বরাদ্দ হয় না। তারাই ‘রাজ-ভাষা’ নামের আড়ালে নানা স্তরের পাঠ্যবইয়ে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষার পরিচিতি প্রদান করে। সে না-হয় অর্ধশিক্ষিত লোকদের বিভ্রান্ত করার কৌশল। কিন্তু শিক্ষিত ও সাংবাদিক বন্ধুরা নিশ্চয়ই জানেন হিন্দিকে নিয়ে গুজরাত হাইকোর্টের প্রদত্ত রায়ের কথা; যেখানে বলা হয়েছে "many people speak Hindi and write in Devnagari script but there is nothing on record to suggest that any provision has been made or order issued declaring Hindi as a national language of the country." — 13 October, 2010. তা হলে আনন্দবাজারের মতো আন্তর্জাতিক দৈনিকের এক প্রতিবেদক হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা বলবেন কেন?

আমাদের সংবিধানের ইংরেজি বয়ানে "official language" হিসেবে লেখা আছে হিন্দি ও ইংরেজির কথা। হিন্দি বয়ানে লেখা ‘রাজ-ভাষা’ বলে। তার বাংলা অনুবাদ ‘সরকারি ভাষা’। আর (গো-বলয়ের) স্বার্থবাদী চক্র এই শব্দকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঠেলে নিয়ে গেল। রাষ্ট্রভাষার প্রসঙ্গ সংবিধানে কোথাও যদি থেকে থাকে সে আছে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে, ২২টি ভাষাই সেখানে national language, কেবল হিন্দি তো নয়।

এই সব চক্রান্তের বিরুদ্ধে মুখ্যত প্রতিবাদ করেছেন তামিল জনগণ, আর দক্ষিণ ভারত। করা উচিত ছিল পশ্চিমবঙ্গের। কিন্তু অতি রাজনীতি-সচেতন এ রাজ্য বাংলাদেশের পাশে থেকেও, তাদের ভাষাযুদ্ধে পাশে দাঁড়িয়েও, তাদের থেকে কোনও শিক্ষাই গ্রহণ করেনি।

আর এ কথা তো আমরা সকলেই জানি, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা কম থাকলেও, রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতায় পশ্চিমবঙ্গ সবার উপরে। তাই যখন ঢাকার আন্দোলনের থেকে শিক্ষা ও প্রেরণা নিয়ে অসমের বরাক বাংলা ভাষার জন্য প্রাণদানের মহান ইতিহাস রচনা করল, মাতৃভাষার অধিকারের আন্দোলনে সৃষ্টি করল একুশের পর দ্বিতীয় আলোকস্তম্ভ ১৯ মে (১৯৬১); তখনও কলকাতার শাসকরা শিশুরাষ্ট্রের লজ়েন্স নিয়ে, আর বিরোধীরা উদ্বাস্তু, যুদ্ধ, খাদ্য আন্দোলনের রাজনীতির মধ্যে ডুবে ছিলেন।

আর তাই আমাদের সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিজীবীদেরও এ বিষয়ে নেই সচেতন শব্দপ্রয়োগ। আমাদের মতো শহুরে শিক্ষিত বাড়িতে তো এনসিইআরটি–র সেই সব পাঠ্যবই আছেই, যেখানে কৌশলে রাজ-ভাষার নামের আড়ালে হিন্দির কপালে রাষ্ট্র ভাষার ‘বিন্দি’ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে।

আমরা যেন ওই বিতর্কসভার পক্ষের বক্তাদের মতই মেনে নিয়েছি, ভারতে বাংলা ভাষার আর বাংলাভাষীর কোনও ভবিষ্যৎ নেই; অতএব পালাও। বাঙালি কবি-সাহিত্যিকরা কান্নাকাটি করুন, তাঁদের কবিতার বাজার তো হাওড়া স্টেশনের ও পাশে নেই, অতএব স্বপ্নে ডুবে থেকে লাভ কী!

নীতীশ বিশ্বাস  কলকাতা-৯১

 

‘অসাধারণ’

কয়েক দিন আগে মেট্রো করে ফিরছিলাম। একটি পুরুষ কণ্ঠে বারে বারে ঘোষণা করা হচ্ছিল— ‘‘ট্রেনের অসাধারণ লেটের জন্য ট্রেন দমদম স্টেশন পর্যন্ত যাবে, নোয়াপাড়া স্টেশন অবধি যাবে না।’’ এমন হাস্যকর শব্দযোগের জন্য হাসব না অবাক হব ভাবছি, তার আগেই দ্বিতীয় বিস্ফোরণ! ইংরেজিতেও ঘোষণা হয়ে গেল ‘‘ফর এক্সট্রাঅর্ডিনারি লেট অব ট্রেন...!’’

আবু তাহের  ভগবানগোলা, মুর্শিদাবাদ

 

স্বাস্থ্যকেন্দ্র

তোয়া বাগচীর নিবন্ধ ‘ডাক্তারবাবু ও তাঁর...’ (৩১-৫) পড়লাম। আমরা ১৯৬৫ সালে যখন মেডিক্যাল কলেজে পড়ছি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে পরীক্ষায় প্রশ্ন আসত। বিষয়টা এতটাই পুরনো। ১৯৪৬ সালে ভোরে কমিশন ভারতে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে প্রাইমারি হেল্থ সেন্টার খোলার পরামর্শ দিয়েছিল। কাকতালীয় হলেও, ১৯৪৬ সালেই লন্ডনেও এক কমিশন একই পরামর্শ দিয়েছিল। সেখানে দু’বছরের

মধ্যে কাজ শুরু করে তাদের এনএইচএস এখন জগতের অন্যতম স্বীকৃত স্বাস্থ্যব্যবস্থা।

শহরের হাসপাতালগুলি নিয়ে এত আলোচনা হচ্ছে। অথচ গ্রামের এতগুলি মানুষ কী ভয়ানক অস্বাস্থ্য-আতঙ্কে বাস করেন, তার আলোচনা কমই হয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র যা আছে তা অপ্রতুল এবং অবহেলিত। এখানে চিকিত্সার সঙ্গে রোগ প্রতিরোধের কাজও করার কথা ছিল। সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত আরও অনেক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি এবং সেগুলির স্বাস্থ্য ফেরানো। তার পর মহকুমা এবং জেলা স্তরের সেকেন্ডারি হেল্থ সেন্টারগুলিকে এমন উন্নত করতে হবে, যাতে বেশির ভাগ অসুখের চিকিত্সা করা যায়। এটা হলে, টারশিয়ারি হেল্থ সেন্টার অর্থাৎ মেডিক্যাল কলেজগুলিতে রোগীর চাপ কমবে। সেখানে জটিল রোগের চিকিত্সা সহজ হবে। একটা মানুষ কাটা পা নিয়ে কলকাতার হাসপাতালে ঘুরে বেড়াচ্ছে এটা বড় লজ্জার। এখনকার ইন্টারনেটের যুগে কোথায় রোগীকে নিয়ে যেতে হবে সেটা জানতে রোগী নিয়ে ঘুরতে হবে কেন? হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ নেই এই অজুহাত না দিয়ে, বিশেষজ্ঞকে দ্রুত রোগীর কাছে আনা যায়। সব ক’টি সরকারি হাসপাতালের সমন্বয় থাকলে এটা সম্ভব। শহরের এক কোণে একটা হাসপাতালে যতই উন্নত ব্যবস্থা থাকুক, সেখানে পৌঁছতে গিয়ে চিকিত্সার গোল্ডেন আওয়ার নষ্ট হবে।

‘স্বাস্থ্য মানেই সবার জন্য বিনা পয়সার পরিষেবা’— এই অবাস্তব ধারণায় ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে, এর ফল মারাত্মক হবে। বরং গরিবদের বিশেষ কার্ড দিয়ে অন্যদের স্বাস্থ্য বিমা করতে উত্সাহ দিয়ে সামর্থ্য অনুসারে কিছু আর্থিক দায় নিতে বলা যায়। সে অর্থ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উন্নতির কাজে লাগানো যায়।

সমরেন্দ্র মৌলিক  বেহালা

 

চিঠিপত্র পাঠানোর ঠিকানা

সম্পাদক সমীপেষু,

৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা-৭০০০০১।

ই-মেল: letters@abp.in

যোগাযোগের নম্বর থাকলে ভাল হয়