সম্পাদকীয় ‘দ্বিচক্রযান তথা দুঃস্বপ্ন’ (১২-২) খুবই প্রাসঙ্গিক। বেপরোয়া বাইক ও গাড়িচালনা বর্তমানে শুধুমাত্র কলকাতার রাজপথে দেখা যায় না, এই অভিযোগ রাজ্যের সর্বত্রই। অথচ, হেলমেটবিহীন এবং একই বাইকে তিন-চার জন সওয়ারি হওয়া বা নাবালকদের বাইক চালানো নিয়ে কারও কোনও হেলদোল আছে বলে মনে হয় না। সম্পাদকীয়তে যথার্থ ভাবেই উল্লেখ করা হয়েছে, ট্র্যাফিক ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা এই প্রচণ্ড দুঃসাহসকে উৎসাহ দিয়েছে। তবে এর সূত্রপাত কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হয় সাধারণ মানুষের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে, আর নাবালকদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের প্রশ্রয়ে। নাবালকদের হাতে গাড়ি বা বাইক পড়ার ফলে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে দুর্ঘটনা এখন হামেশাই ঘটতে দেখা যায়। উপযুক্ত বয়স এবং লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও গাড়ি, বাইক নিয়ে রাস্তায় বেরোনো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। অভিভাবকরা তা জানেন না, তেমন নয়। তা-ও তাঁরা এ বিষয়ে সাধারণত উদাসীন থাকেন। ট্র্যাফিক পুলিশও তেমন কঠোর হয় কি? অথচ, আইনভঙ্গকারী এই নাবালকদের প্রথমেই সতর্ক করে দিলে, দ্বিতীয় বার হয়তো তারা এই আইন-বহির্ভূত কাজ করতে সাহস পেত না, দুর্ঘটনার শিকারও হতে হত না। নাবালক বাইক চালকদের দিকে প্রশাসনের দৃষ্টি দেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন এদের অভিভাবকদেরও মোটা অঙ্কের জরিমানা সমেত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। হেলমেটবিহীন ও লাইসেন্স ছাড়া বাইক চালকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত কড়া অভিযান চলতে থাকলে, রাস্তায় এমনিতেই বাইকের সংখ্যা অর্ধেক হয়ে যেত। কিন্তু তেমনটা তো দেখা যায় না।
রাজপথকে রেসের ট্র্যাক গণ্য করা এবং আইন না-মানার দাপটে বাইকবাহিনীর দৌরাত্ম্যের এই দৃশ্য কোনও সভ্য শহরের পরিচয় নয়, যা যথার্থ ভাবেই আলোচিত হয়েছে সম্পাদকীয়তে। কোনও রাজনৈতিক দলই এই নিয়ে সরব হওয়া দূরে থাক, বরং কমবেশি সকলেই এদের ব্যবহার করে নিজেদের দলের স্বার্থে। তাই দুর্ঘটনাতেও লাগাম পড়ে না।
অশোক দাশ, রিষড়া, হুগলি
বসন্ত সমাগমে
দীপক দাসের ‘তোমায় বড় ভালবাসি’ (রবিবাসরীয়, ৮-২) শীর্ষক লেখাটি পড়ে বুঝতে পারলাম ভালবাসার অনেক নাম। আর এই ভালবাসা দেহ-মনের সুদূর পার থেকে আহরিত। ফেলে আসা সময় আলোর কুচি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে এ লেখায়। এ এক বিবর্তনের কথা। শীতের দাপুটে ইনিংসের শেষে লেখাটি পড়ে মনে এল, “বাতাসে বহিছে প্রেম/ নয়নে লাগিল নেশা,/ কারা যে ডাকিল পিছে/ বসন্ত এসে গেছে।” এখন ‘টেক-স্যাভি’ ছুটন্ত জীবন। ‘বারো ঘর এক উঠোন’ ভ্যানিশ। মাথা তুলেছে আকাশছোঁয়া অট্টালিকা। শিউলি-ঝরা ভোর, ঘাসের আগায় শিশির বা শীতের কুয়াশার অস্তিত্ব আলাদা করে বোঝা যায় না। মুক্ত অর্থনীতির খোলা হাওয়ায় ভেসে গেছে কত কী। মানব সম্পর্ক এখন বড় জটিল। ইন্টারনেটের আগমন পাল্টে দিল কত কিছু। একটা ছোট্ট যন্ত্র ‘মোবাইল’ এখন বিনোদনের ‘অল ইন ওয়ান’। যন্ত্র-নির্ভরতা নবীন প্রজন্মকে মধ্যবিত্তের ঠুনকো আবেগ সরিয়ে বাস্তববাদী করেছে। তবুও আমাদের কাছে রেডিয়ো নস্টালজিয়া। ওই সময়ের বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম। দেশ-বিদেশের খবর জানার মাধ্যম। ক্রিকেট নয়, তখন ‘সব খেলার সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল’। স্কুলফেরত ছেলের দল নাকেমুখে গুঁজেই মাঠে। একটা চামড়ার বলের কী অমোঘ আকর্ষণ! সে ছিল চিঠির যুগ। ওয়টস্যাপ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম তখন কষ্টকল্পনা। মাল্টিপ্লেক্স নয়, সিঙ্গল স্ক্রিন হলই তখন ভরসা। এই লেখা স্মৃতি জাগানিয়া। ধূসর অতীত যেন হ্যাজাক-এর আলোর মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
দেবাশিস দাস, বোলপুর, বীরভূম
অনাগ্রহ
‘খেত থেকে মাধ্যমিকে ছাত্রী, পাশে শিক্ষকেরা’ (৩-২) শীর্ষক খবরের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। স্বাধীনতা-পূর্ব ভারত। শিক্ষা মূলত শহরকেন্দ্রিক। পাঠশালা, টোল, মক্তব ও মাদ্রাসাই শিক্ষাদানের কেন্দ্র। কৃতীদের মধ্যে অনেকেই বিরাট ভূ-সম্পত্তির মালিক পরিবার অথবা উচ্চবর্ণের মধ্যে থেকে আসা। শ্রমজীবীদের মধ্যে তা একেবারেই বিরল। ক্রমশ পরাধীন ভারতে ইংরেজদের কেরানি ও প্রশাসনিক কর্মী তৈরির জন্য শিক্ষা বিস্তারের সামান্য প্রয়াস নজরে এল। মিশনারি স্কুল এবং বিভিন্ন কমিশনের মাধ্যমে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের চেষ্টা এবং স্বাধীন ভারতে শিক্ষা বিস্তারের কিছুটা সদিচ্ছায় শহর থেকে গ্রামে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ দেখা দিতে থাকে। গ্রামের মানুষও ভাবতে শেখেন শিক্ষা পেয়ে ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। ষাটের দশকে দেখেছি গ্রামবাংলার কোনও দরিদ্র চাষি বা মজুরকে শহরে কিছু সময়ের জন্য একটা আশ্রয় খুঁজতে, কারণ তাঁর সন্তান বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পরীক্ষা দেবে।
আর, একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের শেষ ভাগে পৌঁছে দেখা গেল— পরীক্ষার্থী-সহ বাড়ির সবাই পরীক্ষার দিনই ভুলে গিয়েছে। সন্তানেরা দুধে ভাতে না থাক, অস্বীকারের উপায় নেই যে, কুড়ি-বাইশ বছর আগে অবধিও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ শিক্ষান্তে সম্মানজনক চাকরির ব্যবস্থা করে পারিবারিক অবস্থার উন্নতি করতে পেরেছিল। তাই শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তখনও দেখা যেত।
এ বার বর্তমান অবস্থাটি দেখা যাক। সরকারি বিদ্যালয় পড়ুয়ার অভাবে উঠে যাচ্ছে, প্রায় কিছু না পড়েও বোর্ডের পরীক্ষায় অনায়াসে উত্তীর্ণ হওয়া যাচ্ছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী-সংখ্যা ক্রমশ কমছে। মৌলিক গবেষণার ক্ষেত্রে গবেষকদের অনীহা, কারণ গবেষণার পরেও কাজের অনিশ্চয়তা। যে পরিবেশে ডিগ্রি ভবিষ্যৎকে মজবুত করতে পারে না, সেখানে পরীক্ষা নিয়ে এমন অনাগ্রহ অস্বাভাবিক নয়।
দ্বিজেন্দ্রনাথ সরকার, জিয়াগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ
ছেঁড়া পাতা
মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার শেষ দিনে পরীক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের পাতা ছিঁড়ে উল্লাসের ছবি এখন প্রত্যেক বছরের নিয়মিত ঘটনা। বিষয়টিকে একটু অন্য ভাবে দেখা প্রয়োজন। পাঠ্যবই এবং পঠনপাঠনকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কোনও ভাবে ছাত্রছাত্রীদের ভালবাসার, ভাললাগার বিষয় করে তুলতে পারেনি। বই মুখস্থ করে নম্বরের পিছনে ছুটতে গিয়ে নতুন কিছু শেখার আনন্দ থেকে ছাত্রসমাজ বঞ্চিত হচ্ছে, ফলে পাঠ্যবইয়ের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্ম নিচ্ছে। এ ব্যর্থতা হয়তো আমাদেরই। আগে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া ছাত্রছাত্রীদের পরবর্তী পড়াশোনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে এক জোড়া উজ্জ্বল চোখ অনেক স্বপ্ন নিয়ে বলে উঠত বিজ্ঞান কিংবা সাহিত্যের প্রতি অনুরাগের কথা। আজ উল্টো দিক থেকেই প্রশ্ন ছুটে আসে “কাজ কই, নিয়োগ কই?”
সৌম্যকান্তি মণ্ডল, কলকাতা-১৪৪
উদ্বেগের জন্ম
জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা শেষ মানে দীর্ঘ দিনের পরিশ্রমের অবসান ও এক রাশ স্বস্তি। স্বাভাবিক ভাবেই আনন্দ, উচ্ছ্বাস থাকবে। কিন্তু সেই আনন্দ প্রকাশের ধরন যদি হয় বইখাতা ছেঁড়া, তবে তা ভেবে দেখার বিষয়। এমন দৃশ্য পশ্চিম মেদিনীপুরে, পুরুলিয়ায়, কোচবিহারে দেখা গিয়েছে। প্রশ্ন জাগে, বর্তমান সময়ে শিক্ষার মান ও মূল্যবোধ তবে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? কয়েক বছর আগে পর্যন্ত এমন উচ্ছৃঙ্খলতা কল্পনাতীত ছিল। ছোটবেলায় যে বই-খাতা আমরা যত্নে রেখে দিতাম, বর্তমান প্রজন্ম তা ধুলোয় ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই ঘটনা শিক্ষকমহলেও তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। সময় এসেছে সমাজের ভেবে দেখার— আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কোন পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।
অপূর্বলাল নস্কর, ভান্ডারদহ, হাওড়া
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে