সম্পাদকীয় ১

রাজার সময় নাই

বিচারপতি স্মরণ করাইয়া দিয়াছেন, কোনও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ছাড়াই মেঘালয় হাইকোর্ট পাঁচ বৎসর যাবৎ চলিতেছে।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১২ মে ২০১৮ ০০:১৩
Share:

সুদীর্ঘ ১৩৫ কিলোমিটার রাস্তা প্রস্তুত। সেই রাস্তায় চলিতে গাড়িঘোড়া প্রস্তুত। আরও প্রস্তুত ফরিদাবাদ-গাজিয়াবাদ, যানজটের হাত হইতে নিস্তার পাইতে। প্রস্তুত নহেন শুধু প্রধানমন্ত্রী। ইস্টার্ন পেরিফেরাল এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করিতে আসিবার মতো সময় তাঁহার হাতে নাই। ফলে, যাঁহারা দিল্লি হইতে সোনীপত অবধি নিত্য যাতায়াতের জন্য এই এক্সপ্রেসওয়ের মুখ চাহিয়া বসিয়াছিলেন, তাঁহাদের প্রতীক্ষা দীর্ঘতর হইতেছে। তবে, আর বড় জোর তিন সপ্তাহ। সুপ্রিম কোর্ট জানাইল, প্রধানমন্ত্রীর সময় হউক অথবা না হউক, ৩১ মে-র মধ্যে রাস্তাটি খুলিয়া দিতে হইবে। যদি তাহার মধ্যে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন সারিয়া উঠা না যায়, তবে তাহাও সই। প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী বা অন্য কোনও গণ্যমান্যের হাতে উদ্বোধিত হওয়াই যে একটি সড়ক, বা হাসপাতাল বা অন্য কোনও জনপ্রতিষ্ঠান বা পরিষেবা ক্ষেত্রের জীবনের মোক্ষ নহে, তাহার অস্তিত্বের মূল কারণ যে মানুষের ব্যবহারিক সুবিধা বৃদ্ধি, আদালতের রায়েও কি কর্তারা এই কথাটি উপলব্ধি করিবেন?

Advertisement

বিচারপতি স্মরণ করাইয়া দিয়াছেন, কোনও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ছাড়াই মেঘালয় হাইকোর্ট পাঁচ বৎসর যাবৎ চলিতেছে। এই কথাটি শুনিয়া নেতারা অবশ্য বলিবেন, কিসের সঙ্গে কিসের তুলনা! আদালতের নূতন ভবন দেখিয়া কি মানুষ ভোট দেয়? রাস্তা, হাসপাতাল, বিদ্যালয়, এমনকী শৌচালয়ের গায়েও উদ্বোধকের নাম খোদাই করা থাকিলে ভোট বাড়ে। ভোট সত্য, জগৎ মিথ্যা, অতএব নেতা-মন্ত্রীদের বাদ রাখিয়া উদ্বোধন হইবে না। কিন্তু, এই প্রযুক্তির শতকে উদ্বোধন করিতে হইলে পরিকাঠামোটির নিকট সশরীর পৌঁছাইতে হইবে, তেমন দায়ও তো নাই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হইতে নিতিন গডকরী, অনেকেই ইদানীং নিজের দফতরে বা অন্য কোথাও বসিয়া বোতাম টিপিয়া দূরবর্তী প্রকল্পের উদ্বোধন সারিয়া ফেলিতেছেন। তাহাতে নামও হয়, সময়ও বাঁচে, মানুষের অসুবিধাও কমে। যে নরেন্দ্র মোদী দিনে ছাব্বিশ ঘণ্টা টুইটারে সক্রিয়, তিনি কেন প্রযুক্তির পথটি দেখিয়াও দেখিতে পান না? বোতাম টিপিয়া উদ্বোধনের মুহূর্তটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘লাইভ’ দেখাইলে আরও ‘লাইক’ পাইবেন। প্রধানমন্ত্রী ও অন্য নেতারা ভাবিয়া দেখিতে পারেন।

ইত্যবসরে দেশের মানুষ একটি অন্য কথা ভাবুন— কোনও সরকারি প্রকল্পে আদৌ উদ্বোধনের প্রয়োজন হইবে কেন? মানুষের টাকায়, মানুষের জন্য একটি পরিষেবার ব্যবস্থা হইতেছে, তাহা মানুষের ব্যবহারের জন্য খুলিয়া দিতে প্রধানমন্ত্রী বা অন্য কোনও বিশিষ্ট জনের উপস্থিতি চাই কেন? পরিকাঠামো নির্মাণের পর একটি নির্দিষ্ট দিন হইতে মানুষ তাহা ব্যবহার করিতে আরম্ভ করিবেন, এমনই ব্যবস্থা হওয়া উচিত ছিল। তাহা হয় নাই, কারণ প্রায় সাত দশকের প্রজাতন্ত্রও ভারতের চেতনা হইতে বহু পুরাতন রাজতন্ত্র বা সামন্ততন্ত্রের দাগ মুছিতে পারে নাই। নেতা-মন্ত্রীরা এখনও মানুষের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি নহেন, তাঁহারা এখনও রাজতন্ত্রের প্রতিভূ। সাধারণ মানুষ তাঁহাদের রাজা হিসাবেই দেখে, তাঁহারাও নিজেদের অন্য কিছু ভাবিয়া উঠিতে পারেন বলিয়া প্রত্যয় হয় না। ফলে, সরকারি কোষাগারের ব্যয় এই দেশে রাজার বদান্যতা হিসাবেই থাকিয়া গিয়াছে, মানুষের অধিকারের স্বীকৃতি পায় নাই। প্রজাদের জন্য রাজা যদি পুকুর খুঁড়িয়া দেন, তবে রাজপুরোহিতের বাছিয়া দেওয়া শুভ দিনে রাজাই তাহা প্রজাদের জন্য খুলিয়া দিবেন, ইহাতে আর অস্বাভাবিকতা কোথায়? আশঙ্কা, আদালতের নির্দেশেও পরিস্থিতি পাল্টাইবে না। হয়তো এই ক্ষেত্রে ৩১ মে-র মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী সময় করিয়া ফেলিবেন, বা অন্য কেহ ফিতা কাটিতে আসিবেন। কিন্তু, দেশের মানুষ যত দিন অবধি এই রাজতন্ত্রের যুক্তিকে সম্পূর্ণ অস্বীকার না করিতেছে, উদ্বোধনের জন্য নেতার অপেক্ষায় থাকা ফুরাইবে না।

Advertisement
(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement
আরও পড়ুন