Gujarata Marriage Registration system

অন্ধকূপ

ইতিপূর্বে, এমন বেশ কিছু ঘটনায় শীর্ষ আদালত নিজ অবস্থান স্পষ্ট করেছে। প্রাপ্তবয়স্করা বিবাহেচ্ছু হলে সমাজ, গোষ্ঠী ও পরিবারের অনুমতি নিষ্প্রয়োজন।

শেষ আপডেট: ০৬ মার্চ ২০২৬ ০৯:০০
Share:

আইনে সংশোধন সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু গুজরাতের বিবাহ নথিভুক্তিকরণ আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনীর প্রস্তাব যেন রাজ্যটিকে আধুনিকতার স্রোত থেকে শত যোজন দূরে ফেলতে চলেছে। বিবাহ নথিভুক্তিতে পিতা-মাতার সম্মতির হলফনামা বাধ্যতামূলক করছে গুজরাত সরকার। যুক্তি— বিবাহ, বিশেষত অন্য ধর্মে বিয়ে, যাকে ‘লাভ জেহাদ’ নামে রাজনীতির বৃত্তে আনা হয়, সেই ক্ষেত্রে তরুণীদের প্রতারণা থেকে সুরক্ষা দিতে এই পদক্ষেপ। অর্থাৎ, প্রশাসন ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ঊর্ধ্বে পারিবারিক কর্তৃত্বের গুরুত্ব আরোপে বিশ্বাসী। যদি ১৮ বছর বয়সে ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হন, ভোটাধিকার মারফত সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন, তবে, জীবনসঙ্গী নির্বাচনে তাঁর মতের উপরে অভিভাবকের ‘ভেটো’র অধিকার থাকবে কেন? এই সংশোধনী সমাজকে পিতৃতন্ত্রের অন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত করে, যেখানে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের উপর সমাজ ও পরিবারের নজরদারি স্বীকৃত। এক কথায় এই কাজ মানবতাবিরোধী; এতে নাগরিকের মর্যাদা ও গোপনীয়তার অধিকারের উল্লঙ্ঘন একেবারে স্পষ্ট।

ইতিপূর্বে, এমন বেশ কিছু ঘটনায় শীর্ষ আদালত নিজ অবস্থান স্পষ্ট করেছে। প্রাপ্তবয়স্করা বিবাহেচ্ছু হলে সমাজ, গোষ্ঠী ও পরিবারের অনুমতি নিষ্প্রয়োজন। নারীর সঙ্গী ও ধর্ম নির্বাচনের অধিকারকে সমর্থন করে কেরলের বিশেষ আইনে স্বীকৃৃত পিতৃতান্ত্রিক হস্তক্ষেপও রুখেছে শীর্ষ ন্যায়ালয়। উত্তরপ্রদেশের মামলায় আদালতের পর্যবেক্ষণ, পরিবারও হিংসার উৎস হয় ও দম্পতিদের সুরক্ষা বিধেয়। দর্শন স্পষ্ট। সাংবিধানিক গণতন্ত্র প্রাপ্তবয়স্কের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দেয়। অতএব, পিতামাতার অনুমতির এই ধারণাটি একান্তই অসাংবিধানিক, এটির শিকড় পিতৃতন্ত্রে। এতে প্রকৃতপক্ষে শাসকের ভিন ধর্ম বিদ্বেষেরও প্রতিফলন। এ সব কিছুর মধ্যেই সম্পত্তি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে কুক্ষিগত করার তাড়নায় নারীর আকাঙ্ক্ষা ও স্বাধীনতাকে পরিবারকর্তার অধীনে গচ্ছিত রাখার মনুবাদী ধ্যানধারণারই প্রতিফলন। মনুসংহিতা-বর্ণিত অভিভাবকত্বের ধারণা হিন্দুত্ববাদী দলগুলির এখনও পছন্দের। উদ্বেগের বিষয়, এ ক্ষেত্রে রাজ্যের বিরোধী দলগুলিও কিন্তু একই পিতৃত্ববাদী চিন্তাধারায় অবরুদ্ধ।

সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম স্বতন্ত্র ব্যক্তি রূপে নাগরিকদের মর্যাদা দিলেই রাষ্ট্র অর্থনৈতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিগত ভাবে বিকশিত হবে। পরিবর্তে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। নিরাপত্তার নামে পোশাকে, চলাফেরায় বাধা, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত করা— পিতৃতন্ত্র-নির্ভর কাঠামো ভয় ও অস্বস্তির পরিবেশ সৃষ্টি করে সমাজকে শক্তিহীন ও স্থবির করে। প্রতারণা থেকে সুরক্ষার অজুহাতে ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে খর্ব করার এই নীতিও অবৈধ। অন্য গোষ্ঠীতে বিয়েতে উৎসাহ উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সূচক এবং ইতিহাস সাক্ষী, তা বহু ক্ষেত্রেই বহুজাতি-অধ্যুষিত ভূখণ্ডে সংহতির গ্রন্থিবন্ধনে সহায়ক হয়েছে। সংবিধানের নীতিগুলিও তদুদ্দেশ্যেই প্রণীত। মনুবাদের আদর্শে নীতি প্রণয়ন করলে তা সংবিধানে স্বীকৃত সাম্যবাদের বিপরীত পথে রাজ্য তথা দেশকে চালিত করে। অতএব, এই পশ্চাদ্‌গামিতা রুখতে শুধুই আদালতের মুখাপেক্ষী না থেকে সমাজের অন্তস্তল হতে উৎসারিত জোরালো প্রতিরোধের সময় এসেছে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন