Mid day Meal

হেতু সন্ধান

আমিষ ভাল না নিরামিষ, সয়াবিন-রাজমাতেও ডিমের সমধিক প্রোটিন আছে কি না, প্রশ্ন আদৌ সেগুলি নয়।

শেষ আপডেট: ২৭ জুন ২০২৬ ০৬:৫৪
Share:

এক-একটি জিনিস এক-এক সময় রাজনীতি, সমাজ, জনমন ও প্রশাসনেরও অভিজ্ঞান হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গে সেই বস্তুটি যে ডিম, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ পূর্বতন সরকারের নেতা-মন্ত্রীদের উদ্দেশে ক্রুদ্ধ জনতার ডিম ছোড়াছুড়ি সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা দেখে প্রতিবাদের পথ হিসেবে এই অতি পুষ্টিকর খাদ্যবস্তুটির প্রবল অপচয় ঘিরে চিন্তার উদ্রেক অবান্তর নয়। সেই পর্ব না মিটতেই আবারও চর্চায় ডিম, এ বার নতুন রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তে সরকার-পোষিত স্কুলে মিড-ডে মিল থেকে তার বাদ যাওয়া নিয়ে কথা উঠেছে। কথা ওঠারই কথা, তবে জন-আলোচনায় বিষয়টি যে ডিম বনাম সয়াবিন-রাজমা অর্থাৎ আমিষ বনাম নিরামিষের তুল্যমূল্য বিচারের প্রশ্নে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, তার চেয়েও জরুরি ও গোড়ার প্রশ্নটি আগে করা দরকার— পশ্চিমবঙ্গে লক্ষ লক্ষ শিশু-কিশোরের যে বর্তমান খাদ্যাভ্যাস, মিড-ডে মিলের সূত্র ধরে তাতে বিচ্যুতি বা বদল হচ্ছে কেন? কেন সরকার-পোষিত স্কুলে ছেলেমেয়েদের আমিষ খাদ্যতালিকাকে নিরামিষে পরিবর্তন করা হচ্ছে? বিধানসভা ভোটের প্রচারে বিজেপির নেতা-প্রার্থীরা বড় মুখ করে বলেছিলেন ভোটে জিতলে মাছ বা আমিষ খাওয়া নিয়ে এ রাজ্যে কোনও ব্যত্যয় হবে না, ভোটে জিতে সরকার গড়ে এখন তা হলে স্কুলপড়ুয়াদের জন্য নিরামিষ খাবারের বন্দোবস্ত করার হেতুটি কী?

আমিষ ভাল না নিরামিষ, সয়াবিন-রাজমাতেও ডিমের সমধিক প্রোটিন আছে কি না, প্রশ্ন আদৌ সেগুলি নয়। যদিও ডিমের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে— প্রোটিন অনেক খাবারে থাকলেও ডিমে থাকা প্রোটিন মানবশরীরে সহজে মেশে, বিশেষত শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য তা নির্বিকল্প— এমন যথেষ্ট বিজ্ঞানসম্মত তথ্য ও গবেষণা রয়েছে। তর্কের খাতিরে সে সব যদি সরিয়েও রাখা যায়, এই প্রশ্ন কিন্তু এড়ানো চলে না কোনও ভাবেই: যে অঞ্চল, প্রদেশ বা রাজ্যে যে খাদ্যাভ্যাসের আবহমান প্রচলন, কিংবা যে খাবার আবালবৃদ্ধের পছন্দ, কেন তারা তা পাবে না; স্কুলপড়ুয়াই হোক বা প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক, সরকার কেন ঠিক করে দেবে কে কী খাবে, কিংবা খাবে না। এমনকি একটি রাজ্যের মধ্যেও এক-এক অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাসে তফাত আছে। পশ্চিমবঙ্গেই পুরুলিয়া বা মেদিনীপুরে শিশুরা মিড-ডে মিলে যা খেতে পছন্দ করবে, নদিয়া বা দার্জিলিঙে তা না-ও হতে পারে— সেটাই স্বাভাবিক। অঞ্চলভেদে খাদ্যাভ্যাসের পার্থক্য ও বৈচিত্র বুঝে, তেমন খাবারই বরং সরকারি স্কুলে মিড-ডে মিলে রাখা ভাল। প্রশ্ন এও নয় যে আগেকার খাদ্যতালিকায় যা যা লেখা থাকত, সব ঠিকমতো দেওয়ার চল ছিল কি না। যদি না থেকে থাকে, সে দিক দিয়েই পূর্বতন সরকারকে দায়ী করা চলে। অভিযোগ তোলা চলে। কিন্তু তালিকা পাল্টে দেওয়া চলে না— অকারণে।

ঘোষণা, কলকাতায় পুরসভা এলাকার সরকারি স্কুলগুলিতে নিরীক্ষামূলক ভাবে একটি ধর্মীয় সংগঠনকে মিড-ডে মিল রান্না ও পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর উপযোগিতা ও কার্যকারিতা সময়ই বলবে, তবে মিড-ডে মিলের রান্না স্কুলেই হলে শিশু-কিশোর পড়ুয়াদের পছন্দ-অপছন্দ, স্থানীয় খাদ্য-উপকরণ (তা সে ডিমই হোক বা শাকসব্জি) ইত্যাদি যে সহজে মিড-ডে মিলে চলে আসে বা রান্নায় রাখা চলে, এ নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই। কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থায়— একটি জায়গায় এক ধরনেরই খাবার তৈরি হচ্ছে এমন বন্দোবস্তে সেটি হয় না। তাই যেখানে সম্ভব, সেখানে বরং স্কুলের রান্না স্কুলেই হবে— এমন বিকেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা মেনে চলাই সমীচীন। সেখানে কিছু স্থানীয় কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা হত, নতুন ব্যবস্থায় যা সম্ভব নয়। পুরনো মিড-ডে মিল কর্মীদের এখন কর্মহীন হতে হল। আরও এক বার স্পষ্ট করা দরকার: নতুন সরকার মিড-ডে মিলে যে বরাদ্দ বাড়িয়েছে তা সুসংবাদ। এখন দরকার, পড়ুয়াদের পাতে তাদের প্রিয় পুষ্টিদায়ক খাবার নিশ্চিত করা।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন