New Labour Law

দারিদ্রের ফাঁদ

শিক্ষা বা স্বাস্থ্য এখন বহুলাংশে বাজারজাত পণ্য— শ্রমিক পরিবারগুলিও ক্রমে বাজারের উপরে নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছে।

শেষ আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩০
Share:

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

১৯৫৭ থেকে ২০২৫-এর দূরত্ব কত? পাটিগণিতের হিসাব কষে দিতে পারবে প্রাথমিক স্তরের ছাত্ররাও। কিন্তু, নীতিগত স্তরে এই দূরত্ব কত, সে প্রশ্ন করলে ভারতের নতুন শ্রমবিধি মাথা চুলকোবে। জানাবে, দূরত্ব নেই আদৌ। শ্রমবিধির অধীনে যে মজুরি বিধি প্রণীত হয়েছে, তার মূল সূত্রটি ১৯৫৭ সালের ইন্ডিয়ান লেবার কনফারেন্সের থেকে নেওয়া। অর্থাৎ, এক জন শ্রমিকের উপরে নির্ভরশীল চার সদস্যের পরিবারের জন্য প্রতি বছর ন্যূনতম কত আয় প্রয়োজন, ২০২৫ সালের ভারত সে হিসাবটি ১৯৫৭ সালের অঙ্ক মেনে কষছে। বলা বাহুল্য, তাতে মূল্যস্ফীতির পরিমাণ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু, সেটুকুই যথেষ্ট নয়, কারণ এই সাত দশকে ভারতের সমাজ এবং বাজার সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। শ্রমিক পরিবারের জীবনযাত্রাও পাল্টেছে— হয়তো আয়ের নিরিখে উপরের দিকে থাকা পরিবারগুলির মতো উল্কাগতিতে নয়, তবুও পাল্টেছে। দু’টি বিশেষ দিকে নজর দিলেই এই পরিবর্তনের অনিবার্যতা বোঝা সম্ভব হবে। প্রথমটি নগরায়ণ। সাত দশক আগের তুলনায় অনেক বেশি মানুষ এখন নগরাঞ্চলের বাসিন্দা— এবং, গ্রামীণ ভারতেও নাগরিক জীবনযাত্রার ছাপ ক্রমশ স্পষ্টতর হচ্ছে। দ্বিতীয় দিকটি হল, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক জীবন থেকে রাষ্ট্রের ক্রমশ সরে আসা, এবং বাজারের সে জায়গাটি দখল করে নেওয়া। শিক্ষা বা স্বাস্থ্য এখন বহুলাংশে বাজারজাত পণ্য— শ্রমিক পরিবারগুলিও ক্রমে বাজারের উপরে নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে, টাকার প্রয়োজনও ক্রমবর্ধমান। ১৯৫৭ সালের বাস্তবে কষা হিসাবে এই ছবি ধরা না-পড়াই স্বাভাবিক।

হিসাবের এই গরমিলের দু’টি উদাহরণ দেখা যেতে পারে। প্রথমটি হল, ১৯৫৭-র সূত্রে বলা হয়েছে, কোনও পরিবারের মোট মাসিক খরচের ২৫% ব্যয় হবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং বিনোদন খাতে। গরিবের জীবনে বিনোদনের অবকাশ কতটুকু, সে প্রশ্ন আপাতত বকেয়া থাক। কিন্তু, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের মতো দু’টি অত্যাবশ্যক ক্ষেত্রের জন্য ন্যূনতম মাসিক আয়ের ২৫% প্রয়োজনের তুলনায় নিশ্চিত ভাবেই কম। অনুপাতটিকে অপরিবর্তিত রাখতে হলে ন্যূনতম মজুরি যথেষ্ট পরিমাণে বৃদ্ধি করা জরুরি। অন্য দিকে, বাড়ি ভাড়ার অঙ্কটি বেঁধে দেওয়া আছে খাদ্যের পিছনে মাসিক ব্যয়ের একটি অনুপাত হিসাবে। অতীতে এ-হেন অনুপাতের কোনও অর্থ ছিল কি না, বলা মুশকিল— কিন্তু এখন যে নেই, সে কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু, এ ভাবে হিসাব কষেই স্থির করা হয়েছে ফ্লোর ওয়েজেস বা ন্যূনতম মজুরি, কোনও রাজ্য যার নীচে ন্যূনতম মজুরির হার ধার্য করতে পারবে না। বেশ কিছু রাজ্যে ন্যূনতম মজুরির হার কেন্দ্রীয় সরকারের বেঁধে দেওয়া ফ্লোর ওয়েজেস-এর চেয়ে অনেকখানি বেশি; আবার, বিশেষত আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া রাজ্যগুলিতে ন্যূনতম মজুরি সেই হারের কাছাকাছিই থাকে। তেমন রাজ্যগুলিতে শ্রমিকদের জীবনে কী ঘটে, তা অনুমান করা চলে। নুন আনার আগেই যেখানে পান্তা ফুরিয়ে যায়, সেখানে স্বভাবতই প্রথমে কোপ পড়ে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ে। মানব উন্নয়নে এই কোপের প্রভাব অপরিসীম। এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে দারিদ্র প্রবাহিত হয় এই পথে— শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যে ঘাটতি পরবর্তী প্রজন্মকেও সামাজিক গতিশীলতা অর্জন করতে দেয় না। ভারতে যে আর্থিক অসাম্য ইতিমধ্যেই ভয়ঙ্কর, এই ব্যবধান তাকে ভয়ঙ্করতর করে তুলতে পারে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন