Fuel

ক্ষমতার উৎস

বৃহত্তর প্রশ্নটি হল, বৈশ্বিক শক্তি-নীতির ভবিষ্যৎ কী হবে? ইতিহাস বার বার দেখিয়েছে যে, তেলকে ভূ-রাজনীতির অস্ত্র বানানো যায়। কিন্তু, সূর্যের আলোকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা অসম্ভব— তার উপরে কোনও দেশের ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক আধিপত্য নেই।

শেষ আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২৬ ০৭:২৭
Share:

বিশ্ব-অর্থনীতির শিরা-ধমনীতে যা প্রবাহিত হয়, তা বিশুদ্ধ পেট্রলিয়াম। কথাটি অর্ধশতাব্দী আগে যতখানি সত্য ছিল, এখনও ঠিক ততটাই। পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির প্রসার, সৌর ও বায়ুশক্তিতে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ, বৈশ্বিক শক্তি-ক্ষেত্রে ব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশ এই খাতে যাওয়া— গত অর্ধ শতকে বৈশ্বিক শক্তি নীতিতে যে পরিবর্তনগুলি ঘটেছে, তাতে আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, পৃথিবী ধীরে ধীরে পেট্রলিয়াম-নির্ভরতা থেকে সরছে। এক অর্থে কথাটি ঠিক— এখন দুনিয়ার মোট জ্বালানির মাত্র ৩০% পেট্রলিয়াম থেকে আসে। কিন্তু, একই সঙ্গে এ কথাটিও ঠিক যে, ১৯৭০-এর দশকের তুলনায় আজ পেট্রলিয়ামের চাহিদার পরিমাণ দ্বিগুণ। অতএব, আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে তেল এখনও এক প্রবল ক্ষমতার উৎস। যে রাষ্ট্র তার উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে, অথবা যে শক্তি তার পরিবহণপথের উপরে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, পেট্রলিয়াম তাদের হাতে এখনও এক অমোঘ অস্ত্র। পেট্রলিয়াম-সমৃদ্ধ দেশে ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা’য় আমেরিকার ঐতিহাসিক আগ্রহের মূল কারণ নিহিত এখানে— ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অত্যুৎসাহকেও এই পরিপ্রেক্ষিতেই দেখা বিধেয়। সাম্প্রতিক ইরান-যুদ্ধও সেই পুরনো সত্যটিকেই আবার সামনে এনেছে। পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বাড়তেই আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম দ্রুত ১১০ ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। ইরান হরমুজ় প্রণালীতে তেল পরিবহণ ব্যাহত করে চাপ তৈরি করতে চাইছে বিশ্ব-অর্থব্যবস্থার উপরে। অতীত অভিজ্ঞতায় দুনিয়া জানে, যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংঘাতের মুহূর্তে তেল কূটনৈতিক চাপের মোক্ষম অস্ত্র। বিশ্বমঞ্চে সেই নাটকেরই পুনরভিনয় চলছে।

স্বভাবতই ফিরে আসছে গত শতকের সত্তরের দশকের তেল সঙ্কটের স্মৃতি। সে সময় পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের অভিঘাতে হঠাৎ করে তেলের সরবরাহে টান পড়েছিল, টালমাটাল হয়েছিল বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা। সে দিনের সঙ্গে আজকের পরিস্থিতির অবশ্যই ফারাক আছে। কিন্তু, গভীরতম সত্যটি এখনও অপরিবর্তিত— পশ্চিম এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে তা এখনও বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গাটিকে নাড়া দেয়। তেলের দাম বাড়া মানে কেবল জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নয়। তার প্রভাব পড়ে পরিবহণের খরচে, শিল্প উৎপাদনের ব্যয়ে, এমনকি খাদ্যদ্রব্যের মূল্যস্তরেও। জ্বালানি-বাজারে অস্থিরতা বাড়লে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে, প্রায় সব দেশই কঠোর মুদ্রা নীতি গ্রহণে বাধ্য হয়, অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে পড়ে। তেলের বাজারে যে সঙ্কট তৈরি হয়, তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থার সর্বপ্রান্তে। এই কারণেই ইরান-যুদ্ধকে একটি আঞ্চলিক অস্থিরতা বলে দেখার উপায় নেই, এটি আক্ষরিক অর্থেই একটি বৈশ্বিক সঙ্কট। রাশিয়া-ইউক্রেন, বা ইজ়রায়েল-প্যালেস্টাইন যুদ্ধের সঙ্গে তার চরিত্রগত ফারাকটি মৌলিক।

বৃহত্তর প্রশ্নটি হল, বৈশ্বিক শক্তি-নীতির ভবিষ্যৎ কী হবে? ইতিহাস বার বার দেখিয়েছে যে, তেলকে ভূ-রাজনীতির অস্ত্র বানানো যায়। কিন্তু, সূর্যের আলোকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করা অসম্ভব— তার উপরে কোনও দেশের ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক আধিপত্য নেই। পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তির মূল রাজনৈতিক গুরুত্ব এখানেই। কথাটি বিশেষ করে ভারতের মতো দেশের ক্ষেত্রে সত্য, যেখানে শক্তির চাহিদা প্রবল, অথচ পেট্রলিয়ামের জন্য যে দেশ প্রায় সম্পূর্ণত আমদানি-নির্ভর, ফলে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপরে নির্ভরশীল। বিশ্ব যদি সত্যিই শক্তি-নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতির দীর্ঘমেয়াদি পথ খুঁজতে চায়, তবে বিকল্প শক্তির ব্যবহারে আরও জোর দিতে হবে। বস্তুত, বিকল্প শক্তির ব্যবহারের প্রশ্নটিকে রাষ্ট্রনায়করা যদি কেবলমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশল হিসাবে না-দেখে ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধের আয়ুধ হিসাবে দেখেন, তা হলে পরিবর্তনের গতি বাড়তে পারে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন