Cockroach Janta Party

নব্য পরিসর?

যন্তর মন্তরে যাঁরা সমবেত হয়েছিলেন, যাঁরা অনলাইনে এই আন্দোলনকে ক্রমাগত সমর্থন জুগিয়ে চলেছেন, তাঁদের ক্ষোভের গভীরতায় সংশয় করা চলে না।

শেষ আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ ০৮:৩০
Share:

যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র জনসমাবেশ একাধিক কারণে কৌতূহল উদ্রেক করে। প্রথমত, মাত্র তিন সপ্তাহ আগে সমাজমাধ্যমে একটি প্যারডি অ্যাকাউন্ট হিসাবে যে দলের সূচনা হয়েছিল, এত অল্প দিনে তার এই জনপ্রিয়তা অর্জন ভারতীয় রাজনীতিতে সুপরিচিত ঘটনা নয়। তবে গত কয়েক বছরে দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে যে জেন-জ়ি আন্দোলন হয়েছে, তা খেয়াল করলে সিজেপির এই ‘সাফল্য’ খানিকটা ব্যাখ্যা করা সম্ভব। ‘ডিজিটাল নেটিভ’ এই প্রজন্ম রাজনৈতিক সংগঠনের কাজেও সমাজমাধ্যম ও ইন্টারনেটকে দক্ষ ভঙ্গিতে ব্যবহার করতে পারে। যে ভাবে রাজধানীর বুকে সিজেপির এই সমাবেশটি আয়োজন করতে পারল, সাম্প্রতিক ভারতে সেটিও খুব সহজ নয়। দলের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের আশঙ্কা ছিল যে, দিল্লিতে নামলেই তাঁকে গ্রেফতার করা হতে পারে। তেমন কিছু হয়নি, যন্তর মন্তরে সমাবেশ হয়েছে, জাতীয় স্তরের সব সংবাদমাধ্যম তা সবিস্তার দেখিয়েছে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে অনেক। যে শাসক বিরুদ্ধমতের আভাস পেলেই তাকে ‘দেশদ্রোহ’ বলে দাগিয়ে দেয়, যার রোষানলেপড়ে বিরুদ্ধবাদী ছাত্র থেকে যাজক, অধ্যাপক, সাংবাদিক, বহু মানুষকে দীর্ঘ কারাবাস করতে হয়, সিজেপির প্রতি তাদেরই এই সহনশীলতার ব্যাখ্যা নিয়েই প্রশ্ন।

প্রশ্ন যতই উঠুক, কয়েকটি কথা অনস্বীকার্য। যন্তর মন্তরে যাঁরা সমবেত হয়েছিলেন, যাঁরা অনলাইনে এই আন্দোলনকে ক্রমাগত সমর্থন জুগিয়ে চলেছেন, তাঁদের ক্ষোভের গভীরতায় সংশয় করা চলে না। এও ঠিক, এই ক্ষোভের চরিত্র, জেন-জ়ি আন্দোলনের বৈশ্বিক চরিত্র মেনেই— সঙ্কীর্ণ। সিজেপির সূচনাপর্বে তাদের ঘোষিত লক্ষ্যগুলির মধ্যে বৃহত্তর সামাজিক ন্যায়ের দাবি ছিল— কিন্তু, তার পরবর্তী পর্যায়ে যে নির্দিষ্ট প্রশ্নটিকে কেন্দ্র করে আন্দোলন এগিয়েছে, তা কেবলই পরীক্ষা প্রক্রিয়ার অব্যবস্থা। সিবিএসই এবং নিট পরীক্ষায় যে বিপুল অনিয়ম হয়েছে, তার বিরুদ্ধে সিজেপি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছে। তাদের তরফে এটি রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচায়ক, কারণ স্পষ্টতই বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নের তুলনায় ব্যক্তিগত স্বার্থ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িত প্রশ্নের গ্রহণযোগ্যতা এখন বেশি, জনসমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনাও অধিক। এই বাস্তবকে অস্বীকার করে এখনকার সময়ে আন্দোলন চালানো মুশকিল। বস্তুত, সমাজের যে অংশটি মূলত বাজারনির্ভর, তার সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের একটি বড় সূত্র শিক্ষা— বাজার থেকে কেনা শিক্ষার যথাযথ মূল্যায়ন করবে রাষ্ট্র, এবং তাকে বাজারের উপযোগী বলে শংসাপত্র দেবে। রাষ্ট্র এই অলিখিত চুক্তির শর্তপালনে ব্যর্থ হলে নাগরিকের ক্ষোভ স্বাভাবিক। সিজেপি সেই ক্ষোভকেই সূচিমুখ হিসাবে ব্যবহার করছে।

মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণির এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী ক্ষোভকেই রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসাবে ব্যবহার— উত্তর-আদর্শবাদী এই সময়ে রাজনীতির এই চরিত্রকে অস্বীকার করা, অথবা হেয় করা নির্বুদ্ধিতা। সিজেপির আন্দোলনটি চরিত্রগত ভাবেই জেন-জ়ি আন্দোলন। এই ভোগবাদী, আত্মকেন্দ্রিক, বিচ্ছিন্ন জীবনসর্বস্ব, মূলত অনলাইন অস্তিত্বে বিশ্বাসী এই সময়ের রাজনীতি এমনই— তাকে গ্রহণ বা বর্জন করার সিদ্ধান্ত বৃহত্তর সমাজের। সম্ভবত আন্দোলনের এই কেন্দ্রীয় চরিত্রটি খেয়াল করেই বিরোধিতার পরিসরটিতে মোদী সরকার বিশেষ হস্তক্ষেপ করেনি। এই সুযোগে সিজেপি জনশক্তিকে অন্তত সাময়িক ভাবে চালিত করতে পেরেছে। মূলধারার রাজনীতি শেষ অবধি তাকে দমন করতে চাইবে, হয়তো পারবেও। বিরোধী রাজনীতিও সম্ভবত চাইবে তার অর্জনটুকু দখল করে নিতে। কিন্তু, জেন-জ়ি’কে তার রাজনৈতিক পরিসরের অধিকার দিয়ে কী ভাবে বৃহত্তর সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নের সঙ্গে গাঁথা যায়, বর্তমান রাজনীতিকে এই প্রশ্নের উত্তরও সন্ধান করতে হবে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন