AI Summit

হট্টমেলার মাঠে

প্রথমেই যে প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা প্রয়োজন, তা হল— এমন একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করা হয় কেন? তার নির্বিকল্প উত্তর: বিশ্বমঞ্চে ভারতের প্রস্তুতি ও দক্ষতার প্রদর্শন করা।

শেষ আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৬
Share:

দিল্লিতে সদ্যসমাপ্ত ‘ইন্ডিয়া এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬’-এর সাফল্য হিসাবে যদি গুগল-এর ১৫০০ কোটি ডলার, বা মাইক্রোসফট-এর ৫০০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাবের কথা উত্থাপন করা হয়, তবে তা নিতান্ত আত্মপ্রবঞ্চনা হবে। কারণটি জলবৎ— পৃথিবীর ছোট-বড় কোনও সংস্থাই কোনও একটি সম্মেলনের উৎকর্ষের ভিত্তিতে তাদের বিনিয়োগ-সিদ্ধান্ত করে না, বিনিয়োগের পরিমাণও স্থির করে না। ১৫০০ কোটি ডলারের মতো বিপুলায়তন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় মূলত লগ্নির কুশলতার মাপকাঠিতে— ভারতের শ্রমশক্তি, বাণিজ্যিক বিধি, বাজার, ইত্যাদির বিবেচনায়। ফলে, গুগল, আমাজ়ন, বা মাইক্রোসফট-এর মতো সংস্থার লগ্নিপ্রস্তাব নিঃসন্দেহে ভারতের সম্ভাবনার প্রতি বহুজাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থার পরিচায়ক— ভারত মণ্ডপম-এ আয়োজিত সম্মেলনের সাফল্যের মাপকাঠি নয়। এই কথাটি গোড়ায় স্পষ্ট হয়ে গেলে সম্মেলনের সাফল্য-ব্যর্থতা বিচারের কাজটি সহজতর হয়। তার জন্য প্রথমেই যে প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা প্রয়োজন, তা হল— এমন একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করা হয় কেন? তার নির্বিকল্প উত্তর: বিশ্বমঞ্চে ভারতের প্রস্তুতি ও দক্ষতার প্রদর্শন করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ক্ষেত্রে ভারত বৈশ্বিক স্তরে প্রতিযোগিতায় প্রস্তুত, এই বার্তা দেওয়া। তার আয়োজন বড় মাপেই হয়েছিল, সংশয় নেই। বিশ্বের বহু দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা যেমন উপস্থিত ছিলেন, তেমনই হাজির হয়েছিলেন প্রযুক্তি-বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংস্থাগুলির কর্তারা, বড় মাপের গবেষক ও উদ্ভাবকরা। অর্থাৎ, যাঁদের কাছে ভারতের প্রস্তুতি তুলে ধরার কথা, তাঁরা দর্শকাসনে ছিলেন। সাফল্য-ব্যর্থতার মাপকাঠিটি অতএব দ্ব্যর্থহীন— তাঁদের যা দেখানোর কথা ছিল, আর তাঁরা ঠিক যা দেখলেন, দুইয়ের মধ্যে ফারাক কতখানি?

শুধু অভ্যাগতরাই নন, গোটা দুনিয়া সাক্ষী রইল গলগোটিয়াস ইউনিভার্সিটির ‘রোবোডগ’ কাণ্ডের। কেউ বলতেই পারেন যে, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, একটি নির্দিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার প্রমাণ— এর থেকে গোটা দেশ সম্বন্ধে ধারণা করা চলে না। মুশকিল হল, বিশ্ববাসীর ধারণা কী ভাবে তৈরি হবে, তার উপরে এমনকি বিশ্বগুরুরও নিয়ন্ত্রণ নেই। গলগোটিয়াস ইউনিভার্সিটি-কাণ্ড প্রথমত বোঝাল যে, এমন শীর্ষ মঞ্চে কে কী প্রদর্শন করবে, সে বিষয়ে উদ্যোক্তাদের কোনও মাথাব্যথা ছিল না। নচেৎ, এই কারচুপি আগেই ধরা পড়ত। আর, ঘটনা যদি এমন হয় যে, প্রস্তুতিপর্বে এই ‘রোবোডগ’ দেখার পরও আয়োজকরা বোঝেননি যে, এটি চিনা পণ্য, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাসম্পত্তি নয়, তা হলে আরও বড় বিপদ। দ্বিতীয়ত, ভারতে এআই বিষয়ক শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান সম্বন্ধেও এই ঘটনা এক বড় উদ্বেগের জন্ম দিল। এই মঞ্চে উপস্থিত থাকতে পারে, এমন মাপের বিশ্ববিদ্যালয় যদি শিক্ষা সম্বন্ধে এতখানি অসৎ হয়, তবে তা বৈশ্বিক লগ্নিকারীদের ভরসা দেবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় লগ্নির অভিমুখ বহুলাংশে নির্ধারিত হয় মানবসম্পদের গুণমান অনুসারে। সেখানে এমন ছলচাতুরির একটি ঘটনাও ভারতের ভাবমূর্তির পক্ষে ভয়ঙ্কর হতে পারে।

গড়পড়তা মেলার সঙ্গে এমন শীর্ষ সম্মেলনের ফারাক কতখানি, আয়োজকরা সম্ভবত তা বোঝেননি। ফলে, গোটা অনুষ্ঠান জুড়ে চলল অবিশ্বাস্য অব্যবস্থাপনা। প্রধানমন্ত্রী রিল তৈরি করবেন বলে ঠায় আটকে থাকতে হল অভ্যাগতদের, সামান্য জলেরও সুব্যবস্থা করা গেল না। তথ্যপ্রযুক্তির শীর্ষ প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি প্রদর্শিত হচ্ছে যে সম্মেলনে, সেখানে কিউআর কোড কাজ না-করায় খাবার কিনতে পারলেন না অনেকেই। এমন যানজটের সৃষ্টি হল যে, কাজের দিনে রাজধানী কার্যত স্তব্ধ হয়ে গেল। এর কোনওটিতেই সম্ভবত বিনিয়োগকারীদের কাছে ভারতের গুরুত্ব সম্পূর্ণ নষ্ট হবে না— কারণ, লগ্নির সিদ্ধান্ত এমন মেলা দেখে হয় না— কিন্তু, বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হওয়ার যে বার্তাটি ভারত দিতে চাইছিল, তা সম্পূর্ণ মাঠে মারা গেল। ভারত মণ্ডপমের হট্টমেলার মাঠে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন