ফাইল চিত্র।
গেটে চড়িবার ধুম পড়িয়াছে। কেহ দিল্লির লালকেল্লায়, কেহ কলিকাতার বিধানসভায়। বেতন কাঠামো তৈরির দাবিতে অধিবেশনের প্রথম দিন দীর্ঘ ক্ষণ বিধানসভার ভিভিআইপি গেট আটকাইয়া রাখিল পার্শ্বশিক্ষকদের আন্দোলন-মঞ্চ। গেটের মাথায় বাঁধা হইল পতাকা-ফেস্টুন, স্লোগান উঠিল। তবে সাদৃশ্য ওইটুকুই। দিল্লির আন্দোলনের সহিত কলিকাতার তুলনা চলে না। দিল্লিতে এত বিশাল আন্দোলনের মধ্যে বিক্ষিপ্ত, অবাঞ্ছিত ঘটনা ঘটিয়াছে, নেতাগণ নিন্দা করিয়াছেন। কিন্তু কলিকাতার আন্দোলনের পরিসর এত বড় নহে যে, তাহার মধ্যে এই ঘটনাকে বিক্ষিপ্ত বলা যাইতে পারে। ইহাকে পরিকল্পিত কর্মসূচিই বলিতে হয়। অতএব, কলিকাতার ঘটনা অতীব নিন্দনীয়। কেবল নিন্দাই যথেষ্ট নহে। বঙ্গের নাগরিক সমাজকে ভাবিতে হইবে, কেন গণতান্ত্রিক পথে বিক্ষোভ তাঁহারা চালাইতে পারেন না। কেন প্রায় প্রতি ক্ষেত্রেই তাহা শেষাবধি নৈরাজ্যে পর্যবসিত হয়? কেন বারংবার অযাচিত ঘটনার জেরে আন্দোলনের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়? সমাধান লাভের পরিবর্তে সংঘর্ষের ইচ্ছাই কি প্রতিবাদীদের নিকট অধিক আকর্ষণীয়?
প্রশাসন একেবাের কান দেয় নাই, ইহাও নহে। শিক্ষামন্ত্রী দাবি শুনিয়াছেন এবং জানাইয়াছেন যে, পর্যায়ক্রমে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হইয়াছে, ভবিষ্যতের ব্যাপারেও আশ্বাস দিয়াছেন। বেতন বৃদ্ধির দাবিও মুখ্যমন্ত্রীর নিকট লইয়া যাইবেন বলিয়া প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হইয়াছেন। সঙ্গে সঙ্গে ইহাও মানিতে হইবে যে, আন্দোলনকারীদের দাবিটি সহজ নহে। পূর্ণসময়ের শিক্ষক নিয়োগ এবং পার্শ্বশিক্ষক স্থায়ীকরণ এক বস্তু নহে। আন্দোলনের দাবি মানিয়া দ্রুত সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থী ও শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে হানিকর হইতে পারে। সিভিক পুলিশদের ক্ষেত্রেও এই প্রশ্ন উঠে। কোন ক্ষেত্রে কতখানি নিয়োগ সম্ভব, তাহা প্রশাসনই স্থির করিবে। পার্শ্বশিক্ষকদের এহেন রণং দেহী মূর্তি দেখিয়া মনে হয়, তাঁহারা অধিকারের অপব্যবহার করিতেছেন, জটিল সঙ্কটের চটজলদি সমাধান চাহিতেছেন। যাঁহারা অস্থায়ী, তাঁহারা আপনাদের ‘স্থায়িত্ব’ সম্পর্কে জ্ঞাত হইয়াই কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করিয়াছিলেন। স্থায়ী শিক্ষকদের সহিত তাঁহাদের যোগ্যতার পার্থক্য আছে। আজ তাঁহাদের পরবর্তী ধাপে উন্নীত হইবার দাবি অন্যায্য নহে, অস্বাভাবিকও নহে। কিন্তু প্রশাসনও যে সতর্ক ভাবে পা ফেলিবে, চট করিয়া দাবিদাওয়া মানিয়া লইবে না, তাহাও কি স্বাভাবিক নহে?
আইনি জটিলতা এবং ‘দুর্নীতি’র অভিযোগে রাজ্যে বহু বৎসর শিক্ষক নিয়োগ স্থগিত। লিখিত পরীক্ষা বা ইন্টারভিউ পাশ করিয়া অপেক্ষমাণ বহু যোগ্য প্রার্থী। সেই স্থায়ী সমস্যা মিটাইতে অগ্রাধিকার না দিয়া চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগ করা যায় কি? অতীত সাক্ষী, বাম আমলে আংশিক সময়ের শিক্ষকদের স্থায়ীকরণ কলেজশিক্ষার বিপদ ডাকিয়াছে। অতএব, পার্শ্বশিক্ষকদের সমস্যা মিটাইবার পাশাপাশি প্রশাসনের নিকট অপর একটি দাবিও রহিল। কার্যক্রম যাহাই হউক, শিক্ষার মানের সহিত যেন আপস না করা হয়। গণতান্ত্রিক আন্দোলন তাহার নিজস্ব পথে চলুক, কিন্তু সরকারের শিক্ষক নিয়োগ নীতিরও একটি বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিত এবং স্পষ্টতর দিশা থাকা বাঞ্ছনীয়। আন্দোলনই পরিবর্তনের একমাত্র দিগ্দর্শক নহে।