মৃত্যুরে লও সহজে

এমন কথা প্রচলিত রহিয়াছে, হস্তী নাকি মৃত্যু সমাসন্ন হইলেই স্বতন্ত্র স্থানে চলিয়া যায় ও অবসানের অপেক্ষা করে। কিন্তু ইহাকে রটনা বলিয়াই বৈজ্ঞানিকেরা প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন।

Advertisement
শেষ আপডেট: ০৪ জুন ২০১৭ ০০:৪৭
Share:

একটি সমীক্ষায় প্রকাশ পাইল, মৃত্যুপথযাত্রীরা তাঁহাদের আসন্ন অবসান লইয়া যত ভীত ত্রস্ত ও বিষণ্ণ থাকিবেন বলিয়া অন্যরা মনে করে, তাঁহারা অধিকাংশ সময়েই তাহা থাকেন না, অনেকেই শান্ত ও ইতিবাচক ভাবে মৃত্যুকে গ্রহণ করেন। গবেষকরা এমন কিছু রোগীর ব্লগ পাঠ করেন, যাঁহারা আরোগ্যাতীত রোগে ভুগিতেছেন, এবং অন্য কিছু মানুষকে কল্পনা করিতে বলেন যে তাঁহারা কোনও রোগে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হইতেছেন এবং তাঁহাদের ব্লগ লিখিতে বলেন। দেখা যায়, যাঁহারা প্রকৃত রোগী, তাঁহাদের ব্লগে মোটেও দুশ্চিন্তা, ত্রাস, বিষাদের ভাগ অধিক নহে। ইহার পর গবেষকরা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত মানুষদের চিঠিপত্র পাঠ করেন ও এক দল অন্য মানুষকে কল্পনা করিতে বলেন যে তাঁহারা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, এবং চিঠি লিখিতে বলেন। দেখা যায়, এখানেও, কল্পিত আসন্ন মৃত্যু অধিক ভয়ের জন্ম দিতেছে, প্রকৃত আসন্ন মৃত্যুর তুলনায়। ভাবিতে আশ্চর্য লাগে, অস্তিত্বের অন্তকে অনেকেই সহজে গ্রহণ করিতেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁহার পুত্রবিয়োগ সম্বন্ধে একটি চিঠিতে লিখিয়াছিলেন, তাহার পরের রাত্রে রেলে আসিতে আসিতে দেখিয়াছিলেন জ্যোৎস্নায় আকাশ ভাসিয়া যাইতেছে, কোথাও কিছু কম পড়িয়াছে তাহার লক্ষণ নাই। এমন মহৎ মনোভাব নিশ্চয় সমগ্র মানবজাতির মধ্যে এক-আধ জনের হৃদয়েই উদ্ভূত হয়, এই মানসিকতা ধারণ করিতে হইলে যে প্রবল গভীরতা, মেধা, ধ্যান, স্থৈর্য ও আস্তিকতা প্রয়োজন, তাহা অতি কম সংখ্যক মানুষের রহিয়াছে। তবু দেখা যাইতেছে নিতান্ত সাদামাটা, প্রতিভাহীন প্রজ্ঞাহীন মানুষও নিজ মৃত্যুর ন্যায় চরম দুর্ঘটনাকে যথেষ্ট স্থিত হইয়া মানিয়া লইতেছেন।

Advertisement

এমন কথা প্রচলিত রহিয়াছে, হস্তী নাকি মৃত্যু সমাসন্ন হইলেই স্বতন্ত্র স্থানে চলিয়া যায় ও অবসানের অপেক্ষা করে। কিন্তু ইহাকে রটনা বলিয়াই বৈজ্ঞানিকেরা প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন। জন্তুরা জানে না, তাহারা মরিবে। অন্তত মানুষের ধারণা, অন্য প্রাণী আঘাত বা দংশনের ভয় নিশ্চিত ভাবেই পায়, কিন্তু বিলোপের ভয় তাহাদের পীড়িত করে না, জীবনকে তাহারা নির্ভেজাল হর্ষে গ্রহণ করে। মানুষ একমাত্র প্রাণী যে জ্ঞানী, সুতরাং মৃত্যুর নিকট পরাধীন। কেবল সে-ই বুঝিতে পারে, তাহার নিস্তার নাই। যখন সত্যই সেই লগ্ন নিকটে উপস্থিত হয়, তাহার তো নিরবচ্ছিন্ন আর্তনাদ বা রোদন করার কথা, কিংবা জীবনকে গালি দিয়া তিক্ততা উগরাইয়া দেওয়ার। অথচ চতুর্দিকেই এমন মানুষ দেখা যায় যাঁহারা হাসপাতালের শয্যা হইতে শেষ দিন অবধি আত্মীয়দের ভালমন্দের খোঁজ লইতেছেন, কখনওই ভদ্রতা ভুলিতেছেন না, রাজনীতি বা খেলার ফলাফলের প্রতি মনোযোগী থাকিতেছেন। বোর্হেস লিখিয়াছিলেন, তাঁহার মাতামহী মৃত্যুশয্যায় বলিয়াছিলেন, এক বৃদ্ধা তাঁহার মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হইতেছেন, ইহার অধিক স্বাভাবিক ও সাধারণ আর কিছুই নাই। হয়তো অধিকাংশ মানুষ শারীরিক শ্রান্তি ও পীড়ার দরুন, এবং ‘অনিবার্যকে মানিয়া লইতেই হইবে’ বোধের দ্বারা স্তিমিত, শমিত হইয়া যান। হয়তো প্রাণশক্তি এমনই নিভিয়া আসে যে বিদ্রোহ করিতে দেয় না, হয়তো আত্মমর্যাদাবোধ বা স্নেহবন্ধন তাঁহাদের তখনও জীবনের দৈনন্দিন অনুপুঙ্খগুলির প্রতি উৎসুক করিয়া রাখে। ডিলান টমাস যতই বলুন, ‘ডু নট গো জেন্টল ইনটু দ্যাট গুড নাইট... রেজ, রেজ আগেন্সট দ্য ডাইং অব দ্য লাইট’, কিন্তু ঘরে ঘরে মৃত্যুর পূর্বে এই ক্ষমাহীন খড়্গের প্রতি নম্র থাকিবারই উদাহরণ লক্ষিত হয়।

ইহাও ঠিক, বিপদের কল্পনা করিলে যে পরিমাণ ভয় করে, বিপদটি সত্যই আসিয়া পড়িলে অধিকাংশ সময়ে মনে হয়, এইমাত্র? আর কিছু নহে? যুদ্ধে যাইবার পর বহু সৈন্যের নিকট তাহার প্রেমিকার ছাড়িয়া যাইবার চিঠি আসিত, বলা হইত ইহা গুলি লাগিবারই ন্যায়— ঘটিলে দেখা যায়, তেমন ভয়াবহ নহে। আনন্দের তীব্রতাও কল্পনায় অধিক। প্রথম চুম্বনের কথা ভাবিয়া যে শিহরন ঘটে, প্রকৃত ওষ্ঠব্যায়ামটি সেই পুলক-প্লাবন ঘটাইতে সক্ষম হয় কি? হয়তো মানুষ এমন অদ্ভুত ক্ষমতা লইয়া জীবনপথে চলে, কল্পনার স্তরে সকল কিছুকেই সে প্রবল মাত্রায় অনুভব করে, কিন্তু প্রকৃত ঘটনার ক্ষেত্রে তাহার বাস্তববোধ তাহাকে এক মধ্যবিন্দুতে খাড়া করিয়া রাখে, ব্যাপার সাপটাইয়া লইতে দেয়। সে না সুখে ভাসিয়া যায়, না দুঃখে ধ্বস্ত হইয়া পড়ে। মৃত্যুভয় যেমন, তেমন নিজ মৃত্যুকেও শান্ত হইয়া মানিয়া লইবার নিয়ন্ত্রণ-যন্ত্র তাহার মধ্যে পুরিয়া দেওয়া হইয়াছে!

Advertisement

যৎকিঞ্চিৎ

প্রিয়ঙ্কা চোপড়া পা-দেখানো পোশাক পরে মোদীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন বলে রক্ষণশীলরা তাঁকে যাচ্ছেতাই গাল দিলেন, প্রগতিশীলরা আহাবাহা করলেন। দু’দিনের মধ্যে প্রিয়ঙ্কা ‘হলোকস্ট মেমোরিয়াল’-এ সেলফি তুলে পোস্ট করে দিলেন। নাৎসিদের হাতে লক্ষ লক্ষ ইহুদির মৃত্যুকে তরল করা হল বলে হইহই শুরু। এ বার প্রগতিশীলরাও ব্যাকফুটে। এই গাম্ভীর্যের সামনে চটুলতার সমর্থন তাঁদের সিলেবাসে নেই। তর্ক বাড়ছে, প্রিয়ঙ্কার টিআরপি-ও।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement