জয়ললিতার জীবনাবসনের পরে সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলি কি দ্রাবিড়ভূমিতে আত্মপ্রতিষ্ঠার একটা সুযোগ পাবে? কোনও নতুন তারকা দ্রাবিড় রাজনীতির শূন্যস্থান পূরণ করবেন কি? এই সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো অদূর ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে। তবে দ্রাবিড় রাজনীতি আর তামিল সিনেমার ওতপ্রোত সম্পর্ক আমাদের সেই উত্তর খুঁজতে অনেকটা সাহায্য করবে।
তামিলনাড়ুর নিজের একটি স্টেট অ্যানথেম বা ‘রাজ্য-সংগীত’ আছে। গানটি প্রতিটি সরকারি অনুষ্ঠানে জাতীয় সংগীতের আগে বাজানো হয়। ‘ভারত পৃথিবীর সুন্দর মুখ, যাকে জড়িয়ে রয়েছে তরঙ্গময় সমুদ্র, তার ভ্রূ-যুগল হল অর্ধচন্দ্রাকৃতি দাক্ষিণাত্য আর কপালে সুরভিত তিলক হল আশীর্বাদধন্য দ্রাবিড়ভূমি...’ এই সংগীত অনুযায়ী, তামিল কেবল একটি ভাষাই নয়, তামিল হলেন এক আরাধ্যা দেবী। এই গানের দ্রাবিড়ভূমি বর্তমান অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা, কর্নাটক ও কেরল রাজ্য নিয়ে গঠিত। আদি গানটিতে আরও বলা রয়েছে যে তামিল হল কন্নড়, তুলু ও মালয়ালমের জননী।
বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক পেরিয়ার (মহামানব) ই ভি রামস্বামী বা ইভিআর ১৯২৫ সালে স্বসম্মান আন্দোলন শুরু করেন, যে আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল দ্রাবিড় সমাজে জাতপাত প্রথার অবসান ঘটিয়ে নিম্নবর্ণের মানুষদের নিজেদের অবস্থান যুক্তি দিয়ে বিচার করার, নিজেদের সম্মান করার এবং ব্রাহ্মণদের সমান ভাবার শিক্ষা দেওয়া। কংগ্রেস দলে ব্রাহ্মণদের প্রতিপত্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে ইভিআর জাস্টিস পার্টি বা সাউথ ইন্ডিয়ান লিবারাল ফেডারেশন নামক একটি অ-ব্রাহ্মণ রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছিলেন। ক্রমে এই দলটিকে তিনি এমন ভাবে গড়ে তুললেন, যার সংস্কৃতির মূল ধারা ছিল ব্রাহ্মণত্ব-বিরোধী, এবং উত্তর ভারতের প্রতিস্পর্ধী। ১৯৪৪ সালে ইভিআর এই পার্টির নতুন নাম দেন দ্রাবিড় কাজাগম (দ্রাবিড় ফেডারেশন)।
সর্বভারতীয় জাতীয় সত্তা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে কংগ্রেস সরকার যখন হিন্দি ভাষাকে প্রতিটি স্কুলে আবশ্যিক করার নির্দেশ দেয়, তার বিরুদ্ধে তামিলনাড়ুতে ভয়ংকর আন্দোলন শুরু হল। তামিল-জাতীয়তাবাদীরা এই প্রয়াসকে দ্রাবিড় সংস্কৃতির ওপর জোর করে আর্য সংস্কৃতিকে চাপিয়ে দেওয়ার একটা সুচতুর উপায় বলে মনে করলেন। দ্রাবিড় কাজাগম এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা তামিল-জাতীয়তাবাদী ভাবনাকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে ও আরও বড় করে প্রচারের জন্য ‘বয়েজ কম্পানি’ নামক নাট্যদলকে নিযুক্ত করে। তারা সারা রাজ্যে ঘুরে ঘুরে রাজনৈতিক ও সামাজিক নাটক করতে থাকে। তামিলনাড়ুতে বিনোদনের মাধ্যমে মানুষের কাছে রাজনৈতিক বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার শুরুটা এরাই প্রথম করেছিল। নাটকের লেখক ও অভিনেতারা তামিল-জাতীয়তাবাদের মন্ত্রে দীক্ষিত ও ‘গেরিলা-থিয়েটার’-এ প্রশিক্ষিত ছিলেন।
পরবর্তী কালে এঁরাই তামিল সিনেমা জগতে রাজত্ব করেছেন, আবার তামিল রাজনীতির মূলধারাটি এঁরাই তৈরি করেন। বিখ্যাত শিল্পী ও নাট্যকার সি এন আন্নাদুরাই তাঁর লেখায় আর কথায় বহু মানুষকে মোহিত করে রাখতেন। তাঁকেই এই ভাষা-আন্দোলনের পথিকৃৎ বলা চলে, যে আন্দোলনে ভর করে দ্রাবিড় কাজাগম নিজের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে তুলেছিল। ১৯৪৯ সালে আন্নাদুরাই তাঁর গুরু ইভিআর-এর থেকে নিজেকে স্বতন্ত্র করে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক দল দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগম তৈরি করেন। ইভিআর-এর সঙ্গে আন্নাদুরাইয়ের একটা বড় মতপার্থক্যের কারণ ছিল এই যে, আন্নাদুরাই তাঁর রাজনৈতিক মতবাদ প্রচারের মাধ্যম হিসেবে সিনেমাকে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
রুপোলি পর্দার রাজনীতির ওপর তাঁর গবেষণায় প্রবীণ প্রকাশ বলেছেন, ডিএমকে-এর প্রথম পর্বের (১৯৪৮-৫৭) সিনেমায় সংলাপ এবং বিশেষ করে বড় বড় মোনোলগ ব্যবহার করে রাজনৈতিক মতবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছিল প্রবল, চরিত্রনির্মাণে নজর ছিল তুলনায় অনেক কম। এই ভাবে রাজনৈতিক আত্ম-ঘোষণার উদ্যোগ দেখা যেত, যার রাশ ধরেছিলেন সি এন আন্নাদুরাই এবং করুণানিধি। এই সিনেমাগুলিতে তামিল-জাতীয়তাবাদ ছিল অতি প্রকট, তার সঙ্গে ছিল কংগ্রেস সরকারের তীব্র সমালোচনা। শিবজি গণেশন, এন এস কৃষ্ণন, এস এস রাজেন্দ্র, কে আর রামস্বামীদের মতো অভিনেতারা এই আমলে নাম করেছেন। এর পরবর্তী পর্বে সিনেমায় অ্যাকশন জোরদার হল, দলীয় প্রচারের গুরুত্ব বাড়ল। এই পর্বেই প্রথম সারিতে উঠে এলেন মারুথুর গোপালন রামচন্দ্র— এমজিআর।
নির্বাচনী রাজনীতিতে আসার পরে ডিএমকে পেরিয়ারের অনেক আদর্শকেই শিথিল করতে শুরু করল। তাদের চলচ্চিত্রে বিনোদন এবং তারকাদের আকর্ষণকে ভোটের স্বার্থে অনেক বেশি ব্যবহার করা হতে থাকল। এক বিশেষজ্ঞের মন্তব্য, ‘এমজিআর দক্ষিণ ভারতের দরিদ্র মানুষের সামনে আশার প্রতীক। নিঃসন্তান মানুষটি দরিদ্রদের লালনপালনের দায়িত্ব নিয়েছেন। যে কোনও বিপর্যয়ে তিনি প্রথম ত্রাণ নিয়ে এগিয়ে আসেন, তিনি স্কুল এবং অনাথ আশ্রম চালানোর সংস্থান করেন... এমজিআর-এর মহানুভবতা সুবিদিত, সেটাই তাঁর খ্যাতির মূল কারণ।’ সি কে আন্নাদুরাই এক বার বলেছিলেন, এমজিআর একটা নির্বাচনী জনসভায় দাঁড়ালে আমাদের চল্লিশ হাজার ভোট বাড়ে, তিনি
একটা ভাষণ দিলে চার লাখ। আন্নাদুরাইয়ের মৃত্যুর পরে এমজিআর ডিএমকে-র হাল ধরলেন এবং মুখ্যমন্ত্রী হলেন। তবে শিগগিরই তিনি তাঁর নিজের দল তৈরি করলেন— আন্না দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগম (এডিএমকে)। তিনি দেশের প্রথম সুপারস্টার মুখ্যমন্ত্রী। বিনোদনের দুনিয়া, জনমোহিনী নেতৃত্ব, লোকরঞ্জক রাজনীতি এবং দ্রাবিড় জাতীয়তা তামিল রাজনীতির জন্মলগ্ন থেকে তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
এমজিআর-এর মৃত্যুর পরে তামিলনাড়ুর দুই প্রধান দলই দ্রাবিড় জাতীয়তার প্রশ্নে অনেকটা আপস করল। তারা কংগ্রেস এবং বিজেপির সঙ্গে হাত মেলানো শুরু করল। জয়ললিতার এডিএমকে তাদের নির্বাচনী ইস্তাহারে অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণের প্রস্তাবে সমর্থন জানাল। তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে দ্রাবিড় জাতীয়তা বলতে এখন প্রধানত জনমনোরঞ্জনের রাজনীতি, তামিল সিনেমা যার একটা বড় অঙ্গ। সুপারস্টার রজনীকান্ত এই পরিসরটিতে একটা বড় ভূমিকা নিতে পারেন।
রজনীকান্ত কার্যত তাঁর পূর্বসূরির সমস্ত ভূমিকাই পালন করেছেন। তাঁর সাম্প্রতিকতম ছবি কাবালি বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এই ছবির নায়ক মালয়েশিয়ায় চিনা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে তামিল ঐক্যের প্রবক্তা হিসেবে আবির্ভূত। রজনীকান্ত তাঁর বিনীত ভাবমূর্তি এবং অনাড়ম্বর জীবনযাপনকে নিপুণ ভাবে বিপণন করেছেন। তামিলনাড়ুর নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী ও পনীরসেলভন জয়ললিতার শূন্যস্থান পূরণ করতে পারবেন না, সেই সামর্থ্য তাঁর নেই। শশিকলারও নানা সমস্যা। রজনীকান্ত যদি সময় বুঝে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন, অবাক হওয়ার কিছু নেই।