যে সকল হিংসাত্মক ভিডিয়ো গেম এখন সর্বত্র প্রচলিত ও বিশেষত শিশু ও কিশোরগণের নিকট প্রবল জনপ্রিয়, সেইগুলিকে বিদ্বান ও ভাবুক ব্যক্তিরা সাধারণত অন্তর হইতে ঘৃণা করেন। তাঁহারা মনে করেন, খেলাগুলি মস্তিষ্ককে দুর্বল করিয়া দেয়, চিন্তার ক্ষমতাকে পঙ্গু করে ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশকে রুদ্ধ করে। তাঁহাদের সন্তানেরা এই খেলাগুলিকে ভজনা করিলে তাঁহারা নিশ্চিত ভাবেই এইগুলি ছুড়িয়া ফেলিয়া নবীন হস্তে গভীর সাহিত্য ধরাইয়া দিবেন ও দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করিয়া ভাবিবেন, যুগ নিতান্ত ইতর না হইলে, গুলি করিয়া শত্রু হত্যা করিবার খেলা ব্যবসায়ের স্বার্থে মানুষ শিশুদিগকে গিলাইয়া দেয় না। কিন্তু সম্প্রতি এই ক্ষোভে প্রবল বালি ঢালিয়া নিউ ইয়র্কের এক বিশ্ববিদ্যালয় এক সমীক্ষা চালাইয়া সিদ্ধান্তে উপনীত হইল: যে ভিডিয়ো-খেলায় শত্রুকে মারিতে হয়, তাহা মস্তিষ্ককে করিয়া তুলে অতি ক্ষিপ্র ও সক্ষমতর। ইহার ফলে খেলোয়াড় যুগপত্ একাধিক কর্ম সম্পাদন করিবার ক্ষেত্রে নিপুণ হইয়া উঠে, তাহার মনোযোগ বৃদ্ধি পায়, নূতন তথ্য স্মরণে রাখিবার ক্ষমতাও বাড়িয়া যায়। এমনকী দৃষ্টিশক্তিও উন্নত হয়। এক জন অ-খেলোয়াড়ের তুলনায় এক জন এই ধরনের ভিডিয়ো-খেলোয়াড় তাই উত্তম ছাত্র হইয়া উঠে। এমনকী যাহারা নিয়মিত এই খেলা খেলিতে অভ্যস্ত নহে, তাহারা নূতন খেলাটির অভ্যাস গড়িয়া তুলিতে শুরু করিলেই তাহাদের মধ্যে সদর্থক পরিবর্তনগুলি লক্ষ করা যায়। এই অ্যাকশন-ক্রীড়া খেলোয়াড়দের অনুমানশক্তিও এমনই বাড়াইয়া দেয়, তাহারা ওই খেলার সহিত সম্পর্কবিহীন কোনও বিন্যাস বা ছাঁদ দেখিয়াও, পরবর্তী কোন ধাপ বা ঘটনা আসন্ন, তাহা বুঝিয়া ফেলিবার দিকে অগ্রসর হইয়া থাকে। শিক্ষার ক্ষেত্রে তো অবশ্যই, এমনকী স্ট্রোকগ্রস্ত বা অন্য মস্তিষ্কের আঘাতে রুগ্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও এই খেলাগুলিকে ব্যবহার করিয়া সুফল পাওয়া যাইতে পারে।
আসলে, রক্ষণশীলতা এমনই সর্বব্যাপ্ত, যাঁহারা চিন্তাভাবনাকে অবশ্যপালনীয় আচার হিসাবে বরণ করিয়াছেন, তাঁহারাও প্রায়ই এই প্রবণতার শিকার। এই যুগে গ্রন্থকে হটাইয়া বিনোদনের কেন্দ্রে আসিয়া বসিয়াছে দৃশ্য-শ্রাব্য মাধ্যম। শিশুরাও বই পড়িবার পরিবর্তে টিভি দেখিতে বা ভিডিয়ো গেম খেলিতে অধিক উত্সাহী হইয়া পড়িয়াছে। এই অপরিচিত ব্যাপারগুলিকে বহু ভাবুক প্রথমেই গ্রন্থের তুলনায় অগভীর স্থূল ঠাওরাইয়া লইয়াছেন এবং খেলাগুলি বা শিশুমোদী অনুষ্ঠানগুলি যে নিজেদের প্রতি অনুপলে বহুল পরিমাণে উন্নত ও সমৃদ্ধ করিতেছে, তাঁহাদের নজরে পড়ে নাই। কমিক স্ট্রিপ নিজেকে গ্রাফিক নভেলে রূপান্তরিত করিয়াছে, শিশুদের টিভি চ্যানেল গণিত ও ছড়ার পাশাপাশি ধ্রুপদী পাশ্চাত্য সংগীতে দীক্ষা দিতেছে, ভিডিয়ো-খেলা খেলোয়াড়ের নিকট হইতে প্রতিনিয়ত মস্তিষ্কের চূড়ান্ত সজাগতা দাবি করিতেছে। শত্রুকে হত্যা করিতে হয় যে খেলাগুলিতে, সেইগুলি অত্যন্ত দ্রুতিসম্পন্ন ও মুহুর্মুহু ইহাদের পট পরিবর্তন ঘটে, মুহূর্তে শত্রুপক্ষের নয়া অবস্থান ও পরিবর্তিত পরিস্থিতি বুঝিয়া নিজ মোকাবিলা-কৌশল ভাঁজিতে ও বদলাইতে হয়। এবং খেলাটি দক্ষ ভাবে না খেলিলে, কেবল পরাজয় ঘটে না, নিজ ভার্চুয়াল-প্রতিনিধি নিহত হয়। তাই এই খেলা অংশীকে সতত উত্তেজিত ও প্রখর রাখে, প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিশ্চিহ্ন করিবার নিমিত্ত খেলোয়াড়ের সমগ্র সত্তা একাগ্র হইয়া উঠে। গ্রন্থ পড়িবার অভ্যাস নিঃসন্দেহে মানুষকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ করে, কিন্তু তাহাকে বাদ না দিয়া, তাহার পাশাপাশি কেহ যদি ভিডিয়ো গেম খেলিয়া চলে, ক্ষতি কী? নূতনকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা ও সত্ কৌতূহল লইয়া না দেখিয়া, যথার্থ মুক্ত মন লইয়া বিশ্লেষণ না করিয়া, প্রথমেই রায় দিয়া দিবার প্রবণতাকে এই সমীক্ষা আঘাত করিয়া ভাল করিয়াছে। মস্তিষ্কের আলস্য এক বৃহত্ রাক্ষস, যাহাকে হত্যা করিবার খেলা যত শীঘ্র সম্ভব আরম্ভ করা আবশ্যক।
য ত্ কি ঞ্চি ত্
প্রখ্যাত পরিচালক আদুর গোপালকৃষ্ণণ কেরলের ফিল্মোত্সব সম্পর্কে বললেন, ফেস্টিভ্যাল দেখার জন্য ন্যূনতম শিক্ষা ও চলচ্চিত্র-দীক্ষা প্রয়োজন, বেনোজল রুখতে অ্যাডমিশন টেস্ট চালু হোক। কলকাতার ফিল্মোত্সব উদ্বোধনে বলিউডের জগঝম্প বেনোজলকে ‘আয় আয়’ ডাকল; উদ্বোধনী ছবি জনতোষী হোক: মমতা আর্জি রাখলেন। ঠিকই, কোটি কোটি খরচা করে আঁতেল-সার্ভিসের মানে কী? অমর্ত্যবাবুর থিয়োরিগুলোও ‘সর্ববোধগম্য’ করে মেট্রোর দেওয়ালে লেখা হউক!