এ যাবত্ ৩৪টি শব শনাক্ত। নিম্ন অসমের কোকরাঝাড়, বাকসা প্রভৃতি জেলার গ্রামগঞ্জে ঝোপঝাড় হইতে আরও মৃতদেহ উদ্ধার হইতে পারে। মৃতেরা সকলেই নিরীহ, নিরস্ত্র, হতদরিদ্র মানুষ। মৃতদের মধ্যে তিন বছরের শিশু এবং মহিলারাও আছেন। তাঁহাদের সকলের অবশ্য ভোটাধিকার ছিল না। তবে ২৪ এপ্রিলের নির্বাচনে বড়ো প্রার্থীদের ভোট না দিবার অপরাধেই তাঁহাদের হত্যা করা হইয়াছে। গণতন্ত্রের দেবী বোধহয় তাঁহার যজ্ঞভূমিতে প্রাণের অঞ্জলি বুঝিয়া লইতেছেন।
ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট অব বড়োল্যান্ড-এর (এনডিএফবি) ‘সংবিজিত’ গোষ্ঠীর জঙ্গিরা ধরিয়া লয়, স্বশাসিত বড়ো পরিষদের অধীন জেলাগুলিতে বসবাসকারী বাংলাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠী স্বতন্ত্র বড়োল্যান্ড প্রার্থীদের ভোট দেয় নাই। সেই আক্রোশেই রাতের অন্ধকারে মুসলিম বস্তিতে আগ্নেয় হামলা এবং নির্বিচার হত্যালীলা। গণতন্ত্রের মূল কথা যে পছন্দের স্বাধীনতা এবং সেই স্বাধীনতার প্রয়োগ, বড়ো জঙ্গিরা স্পষ্টতই তাহা স্বীকার করে না। ভয় দেখাইয়া নিজেদের প্রার্থীদের অনুকূলে ভোটদানে বাধ্য করার এই প্রবণতাই বাহুবলী-নির্ভর রাজনীতির সার। অসমের বড়ো-অধ্যুষিত জেলাগুলিতে তাহা গণহত্যার চরম চেহারায় আত্মপ্রকাশ করিয়াছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ-সহ অন্যত্রও প্রতিপক্ষকে সমর্থনের অপরাধে ভোটদাতাদের মারধর করা, গুরুতর রূপে জখম করা, এমনকী হত্যা করার দৃষ্টান্তও রহিয়াছে। এনডিএফবি-র জঙ্গিরাও চাহে নাই, বাংলাভাষী মুসলিমরা আদৌ বুথে গিয়া নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন। সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করাতেই এই গণহত্যা। আগামী কোনও নির্বাচনেই যাহাতে এই জনগোষ্ঠী নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে, তাহার জন্য ভীতিপ্রদর্শনও সম্পন্ন হইল।
বড়োল্যান্ড-এর জাতিবৈরের সমস্যা বিষয়টিতে ভিন্ন মাত্রা সংযোজন করিয়াছে। এখানকার বাংলাভাষী মুসলিমদের বড়োরা ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলিয়া গণ্য করে, নিজেদের দাবি করে মূলবাসী বা ভূমিপুত্র রূপে। এলাকার জমি ও জঙ্গলের উপর ভূমিপুত্রের অধিকার অনুপ্রবেশকারীরা কাড়িয়া লইতেছে, এমন বিপন্নতার বার্তা ও শঙ্কা ছড়াইয়াই তাহারা একজোট হয়, সশস্ত্র হয়, আক্রমণের নকশা রচনা করে। ইহা সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনজাতীয় স্বাধিকার আন্দোলনের চরিত্রলক্ষণ। আত্মপরিচয়ের রাজনীতি মাত্রেই এই লক্ষণাক্রান্ত। অন্যত্র মূল ভারতীয় ভূখণ্ড হইতে চাকুরি কিংবা ব্যবসায় উপলক্ষে আগত অনাদিবাসীদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন দানা বাঁধিয়া ওঠে। বড়োল্যান্ডে, বস্তুত সমগ্র অসমের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বেলাতেই আক্রমণের বর্শামুখ সঞ্চালিত হয় বাংলাভাষী শরণার্থীদের বিরুদ্ধে। প্রসঙ্গত ‘বঙাল-খেদা’ আন্দোলন স্মর্তব্য। স্মর্তব্য আশির দশকে নেলি’র গণহত্যা। ২০১২ সালে কোকরাঝাড়কে কেন্দ্র করিয়া বড়ো বনাম বঙ্গভাষী মুসলিমদের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়, তাহাতে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান, উদ্বাস্তু হন সাড়ে চার লক্ষ মানুষ। ইতিমধ্যেই সন্ত্রস্ত বাঙালি মুসলিমরা ভিটেমাটি ছাড়িয়া ত্রাণ-শিবিরের পথে। তাঁহাদের ছাড়িয়া যাওয়া খেতখামার, ঘর-দুয়ার বড়োরা দখল লইবে, যেমন প্রতিটি দাঙ্গার পর ঘটিয়া থাকে (মুজফ্ফরনগরেও ঘটিয়াছে)। তাহার পর ‘প্রতিশোধ’ হিসাবে অবশিষ্ট ভারতে হয়তো উত্তর-পূর্বের মঙ্গোলয়েড জনগোষ্ঠীর নারীপুরুষদের বিতাড়ন শুরু হইবে, যেমন দেড় বছর আগে হইয়াছিল। বড় চমত্কার ব্যবস্থা!