সংবাদ আছে বলিয়াই বাস্তব ঘটে? না কি বাস্তব ঘটে বলিয়াই সংবাদ হয়? উত্তরাখণ্ড যে বিরাট দাবানলে ভস্মীভূত হইতেছে, এই খবর যে ভাবে দেশময় টিভি ও সংবাদপত্রে প্রচারিত হইতেছে, তাহার জন্যই বাস্তবকে আজ বাস্তব বলিয়া জানিতে পারিতেছি। নতুবা এমন বাস্তব নাই অর্থাৎ অনস্তিত্বশীল বলিয়াই জানিয়া রাখিতাম। প্রতি বৎসর এই সময়ে উত্তরাখণ্ড জ্বলিতে থাকে, প্রাকৃতিক সম্পদ বিনষ্ট হয়, এমনকী মানবসম্পদও ধ্বস্ত হয়, অথচ ‘খবর’ হয় না বলিয়া দেশবাসী জানিতে পারেন না। এই বার আগুনের বিস্তার ও ধ্বংসলীলা কিছুটা অতিরিক্ত বলিয়াই তাহার সংবাদ জাতীয় রাজনীতির দ্বার পর্যন্ত পৌঁছাইয়া গিয়াছে। দশ হাজার মানুষ যে ত্রাণপ্রচেষ্টায় রত আছে, তাহাও জানা গিয়াছে। এমনকী ইহাও জ্ঞানের পরিসরের মধ্যে আসিয়াছে যে গত পাঁচ বৎসরে এক লক্ষ আড়াই হাজার দাবানলের ঘটনা ঘটিয়াছে। সংখ্যাটি বিরাট, সন্দেহ নাই। বিষয়টি জরুরি অবস্থা হিসাবে দেখা উচিত। অরণ্যের বৃক্ষ-গুল্ম-লতাদি হইতে শুরু করিয়া পশুপক্ষী, এক বিশাল ‘ইকো-সিস্টেম’ বা বাস্তুতন্ত্র সমাজের অবজ্ঞায় ও অবহেলায় বিনষ্ট, বিধ্বস্ত হইতেছে।
এক সমাজের অবহেলা গভীর বলিয়া অন্য সমাজের অপব্যবহারও লাফাইয়া লাফাইয়া বাড়িতেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দাবানল তৈরি হয় মানুষের হাতেই। চোরাকারবারিদের বিশাল নেটওয়ার্ক ইহাতে যুক্ত থাকে, থাকে কাঠ-ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য বনসম্পদ ব্যবসায়ের মুনাফার হাতছানি। পোড়া কাঠ দিয়া আসবাবপত্র তৈরি হয়, সুতরাং অগ্নিকাণ্ডে কাঠ-ব্যবসায়ীদের সব সময়েই আখের গুছাইবার সুবিধা। যে ভাবে স্থানীয় মানুষদের অর্থলোভ দেখাইয়া অগ্নিসংযোগে লিপ্ত করিবার কথা শোনা যাইতেছে, তাহা উদ্বেগজনক। সাধারণ ভাবে মনে করা হয়, স্থানীয় মানুষ স্থানীয় সম্পদের যত্ন লয়, দেখভাল করে, তাই মন্দ কাজ ঠেকাইতে হইলে ‘বহিরাগত’দের অথবা দুর্ঘটনা আটকাইলেই চলিবে। উত্তরাখণ্ডের সংবাদে চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিল, বহু ক্ষেত্রেই এই মডেল পুরাতন হইয়া গিয়াছে। দাবানলের ঘটনা এখন আর স্বাভাবিক সামাজিক-অর্থনৈতিক-পরিবেশগত কাহিনি নয়। ইহা এখন অপরাধজগৎ ও রাজনীতি-জগতের যুগলবন্ধনের গল্প। এই বার উত্তরাখণ্ডে নাকি অনেক ব্যক্তি স্বীকার করিয়াছেন, টাকার বদলে আগুন ধরাইবার কাজটি তাঁহারা স্বহস্তে করিয়াছেন।
অর্থাৎ ভারতে বাজার-অর্থনীতির যুগে চোরাকারবার ও দুর্নীতি-কারবারের পারস্পরিক বোঝাপড়ায় একটি সম্পূর্ণ নূতন মডেল উদ্ভূত হইয়াছে। তাহাকে আটকাইবার জন্যও নূতন মডেলের প্রতিরোধ লাগিবে। এই ভয়ানক অপরাধ যে কোনও ভাবে বন্ধ করা এবং এই সব অপরাধীর শাস্তির ব্যবস্থা করা রাজ্য সরকারের জরুরি দায়িত্ব। কেবল উত্তরাখণ্ড নয়, অন্তত ১১৫টি প্রদেশে এই সমস্যা অতি নিয়মিত দেখা যায়। বিশেষ করিয়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলি অনেক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এত বৎসর পরে যে বিষয়টিতে ভারতীয় সমাজের মনোযোগ আকৃষ্ট হইয়াছে, ইহা সুখবরের প্রারম্ভিকা মাত্র। কিন্তু আগুন আপাতত নিবিলেই যদি সমাজ ও রাষ্ট্রের দৃষ্টি অন্য দিকে সরিয়া যায়, তবে কাজের কাজ কিছুই হইবে না। এই মনোযোগের প্রেরণায় বা তাড়নায় যদি অন্তত কিছু দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈয়ারি করা যায়, শাস্তিদান সম্ভব হয়, তাহা হইলে প্রকৃত সুখবরটি নির্মিত হইবে।