সম্পাদকীয় ১

চক্রান্ত!

ক্ষ মতার কোনও তুলনা নাই। বিরোধী শিবিরে থাকিতে যে রাজনীতিক গণতন্ত্রের প্রতিমূর্তি, শাসনক্ষমতা পাইলে তিনিই হাতে মাথা কাটেন। সর্বাত্মক প্রতিবাদের পথ ধরিয়া জননেত্রী ভোটে জয়ী হইলেন, কিন্তু গদিতে বসিবার পরে তাঁহার আর প্রতিবাদ সহ্য হয় না, কেহ বেসুর গাহিলেই তিনি মাওবাদী দেখিতে পান, প্রতিবাদীকে পুলিশে ধরে।

Advertisement
শেষ আপডেট: ০৭ মে ২০১৫ ০০:০৪
Share:

ক্ষ মতার কোনও তুলনা নাই। বিরোধী শিবিরে থাকিতে যে রাজনীতিক গণতন্ত্রের প্রতিমূর্তি, শাসনক্ষমতা পাইলে তিনিই হাতে মাথা কাটেন। সর্বাত্মক প্রতিবাদের পথ ধরিয়া জননেত্রী ভোটে জয়ী হইলেন, কিন্তু গদিতে বসিবার পরে তাঁহার আর প্রতিবাদ সহ্য হয় না, কেহ বেসুর গাহিলেই তিনি মাওবাদী দেখিতে পান, প্রতিবাদীকে পুলিশে ধরে। পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকরা এই ম্যাজিক দেখিয়াছেন। দেখিয়া চলিয়াছেন। অরবিন্দ কেজরীবালের সুভাষিত শুনিয়া তাঁহারা কিছুমাত্র অবাক হইবেন না। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী গত কাল যাহা ভাবিয়াছেন, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী আজ তাহা করিতেছেন। সংবাদমাধ্যম তাঁহার দলের তথা সহকর্মীদের সম্বন্ধে অপ্রিয় তথ্য বা অভিযোগ প্রচার করিতেছে, ইহাতে অরবিন্দবাবু যারপরনাই ক্ষিপ্ত। তাঁহার অভিযোগ, সংবাদমাধ্যম তাঁহার সরকারকে ‘ফিনিশ’ করিবার চক্রান্ত করিতেছে। তাঁহার প্রস্তাব, এই অপরাধের শাস্তি হওয়া আবশ্যক, সে জন্য চাই জনতার আদালতে সংবাদমাধ্যমের বিচার। ভারতীয় দণ্ডবিধির কত নম্বর ধারায় সেই বিচার হইবে, তাহা তিনি বলিয়া দেন নাই। বোধ করি, দণ্ডবিধির প্রয়োজনও তাঁহার নাই। তাঁহার তত্‌পর সহকর্মীরা মজুত আছেন, কর্তার হুকুম পাইলে রাজপথে গণ-আদালত নামাইয়া দিবেন।

Advertisement

অরবিন্দ কেজরীবাল এবং তাঁহার সহযোগী রাজনীতিকদের অনেকের আচরণেই অসহিষ্ণুতা প্রথমাবধি প্রকট। গত মাসের গোড়াতেও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী বলিয়াছিলেন, তিনি পরিকল্পিত কুত্‌সার শিকার হইতেছেন। বিচিত্র মানসিকতা। যতক্ষণ কেহ কেজরীবালদের প্রশংসা করিতেছে ততক্ষণ তাঁহারা সৌজন্যের অবতার, কিন্তু প্রশ্ন তুলিলেই রক্তচাপ চড়িতে শুরু করে। অথচ এমন উষ্মা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। নূতন দৃষ্টান্তটিই ধরা যাক। আপ সরকারের এক মন্ত্রী আপন শিক্ষাগত যোগ্যতা বিষয়ে ভুল তথ্য দিয়াছেন— সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত এই অভিযোগের প্রতিক্রিয়াতেই মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিকতম ক্ষোভ। অথচ অতি সহজেই এই বিষয়টির নিষ্পত্তি সম্ভব ছিল। যদি তথ্যবিকৃতির অভিযোগ সত্য হয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী আপন বিদ্যার্জনের শংসাপত্র দেখাইয়া তাহা অনায়াসে প্রমাণ করিতে পারিতেন। আবার, তিনি ইহাও বলিতে পারিতেন যে, যে যাহা খুশি বলুক, তাঁহার কিছু যায় আসে না, তথ্যবিকৃতির অভিযোগে মামলা হইলে তিনি যাহা বলিবার আদালতে বলিবেন। কিন্তু তাহার পরিবর্তে মুখ্যমন্ত্রীকে ময়দানে নামিয়া জনতার আদালত বসাইবার হুঁশিয়ারি দিতে হইবে কেন?

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অরবিন্দ কেজরীবালের মতো স্বভাব-অসহিষ্ণু রাজনীতিকরা শেষ বিচারে গণতন্ত্রের একটি বড় ক্ষতি সাধন করেন। গণতন্ত্রের একটি প্রধান শর্ত: যুক্তি ও তথ্যের সাহায্যে বিরুদ্ধ মতের মোকাবিলা। সেই শর্ত বিরোধী রাজনীতিককেও পূরণ করিতে হয়, ক্ষমতাসীন রাজনীতিককেও। এই মোকাবিলা সুষ্ঠু ভাবে চলিলে তবেই বিভিন্ন মতের টানাপড়েনের মধ্য দিয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কাজ করিতে পারে, অগ্রসর হইতে পারে। কিন্তু তাহার জন্য সহিষ্ণুতা আবশ্যক, আবশ্যক যুক্তি মানিয়া এবং বৃহত্তর স্বার্থকে সম্মান করিয়া আপন অহঙ্কার হইতে সরিয়া আসা, প্রয়োজনে আপস করা। কিন্তু এই রাজনীতিকরা তাহাতে নারাজ। তাঁহারা আপন মহিমায় আপনি আপ্লুত, আপন গরিমায় আপনি আচ্ছন্ন। প্রশাসনের দায়িত্ব তাঁহাদের নিকট গৌণ, অহঙ্কারের রাজনীতিই প্রথম ও প্রধান। কে বলিতে পারে, হয়তো প্রশাসনিক অক্ষমতাই তাঁহাদের আত্মগরিমায় ইন্ধন জোগায়। দিল্লি বা কলিকাতার মুখ্যমন্ত্রীরা দক্ষ প্রশাসক হইয়া উঠিতে পারিলে কথায় কথায় চক্রান্ত খুঁজিতেন না, জনতার আদালত ডাকিবারও প্রয়োজন হইত না।

Advertisement
(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
Advertisement
Advertisement
আরও পড়ুন