সম্পাদকীয় ২

জীবনধারার ছাপ

যু গ বদলাইয়াছে। সর্বাধিক বদলাইয়াছে শিশু ও কিশোররা। বোধোদয়ের কাল হইতে তাহারা কঠোর ‘বাস্তববাদী’। পাঠ্যপুস্তকে মহাজীবনের কাহিনি পড়িয়া পড়ুয়ারা আজ আর অনুপ্রাণিত হয় না, সেই কাহিনিও তাহাদের নিকট নম্বর তুলিবার উপকরণমাত্র।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১৭ জুন ২০১৬ ০০:০০
Share:

যু গ বদলাইয়াছে। সর্বাধিক বদলাইয়াছে শিশু ও কিশোররা। বোধোদয়ের কাল হইতে তাহারা কঠোর ‘বাস্তববাদী’। পাঠ্যপুস্তকে মহাজীবনের কাহিনি পড়িয়া পড়ুয়ারা আজ আর অনুপ্রাণিত হয় না, সেই কাহিনিও তাহাদের নিকট নম্বর তুলিবার উপকরণমাত্র।— এমন ধারণা বহুলপ্রচলিত। যাহা রটে, তাহার অনেকটাই ঘটে। কঠোর বাস্তবের তাড়না বাস্তবিকই মানুষকে অনেক বদলাইয়াছে, আশৈশব। কিন্তু মানুষ নামক প্রজাতিটির সম্বন্ধে কোনও কথাই সম্পূর্ণ সত্য বলিয়া ধরিয়া লইবার উপায় নাই, ধরিলেই বোকা বনিতে হইবে। যে কোনও সাধারণ তত্ত্বই মানুষ সম্পর্কে বলা হউক, এই গ্রহে এমন মানুষ ঠিক মিলিয়া যাইবে, যে সেই তত্ত্বের বাহিরে। অন্য রকম। যেমন নাতাশা মুন্ড্‌কুর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ভারতীয় বংশোদ্ভূত সদ্য-তরুণী বাল্যকালে পড়ার বইয়ে মুষ্টিযোদ্ধা মহম্মদ আলির জীবনকাহিনি পড়িয়াছিলেন। এক জন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ কী ভাবে সমস্ত প্রতিকূলতার উজান বাহিয়া অ-সম্ভবকে সম্ভব করিয়াছিলেন, সেই কাহিনি বালিকার মনে কতটা দাগ কাটিয়াছিল, তাহা সে তখন সম্পূর্ণ বুঝিতে পারে নাই। কিন্তু আর কিছু কাল পরে তাহার সঞ্চয়ে তিক্ত অভিজ্ঞতা জমিতে থাকে। ৯/১১-উত্তর আমেরিকায় অ-শ্বেতাঙ্গ মেয়েটি নানাবিধ বিরূপতা ও বিদ্রূপের নিশানা হয়। সেই অভিজ্ঞতায় সিঞ্চিত তাহার মনোভূমিতে মহম্মদ আলি নূতন করিয়া ফিরিয়া আসেন। ফিরিয়া আসেন পরম ঔষধি হিসাবে, ঘুরিয়া দাঁড়াইবার প্রেরণা হিসাবে।

Advertisement

সম্প্রতি প্রয়াত মহম্মদ আলির স্মরণসভায় এক মর্মস্পর্শী বক্তৃতায় নাতাশা বলিয়াছেন, আলির অদম্য প্রত্যয় তাঁহার মধ্যেও সংক্রামিত হইয়াছিল, তিনি বিস্তর সামাজিক লাঞ্ছনার সম্মুখীন হইয়াও আপন মনে তিক্ততার সঞ্চার ঘটিতে দেন নাই, বরং সেই লাঞ্ছনা হইতেই শক্তি সংগ্রহ করিয়া ঘুরিয়া দাঁড়াইয়াছেন, সমাজে মর্যাদার স্থান তৈয়ারি করিয়া লইয়াছেন। নাতাশা এখন সমাজের বিভিন্ন বর্গের শিশুদের শিক্ষা ও বিনোদনের প্রসারে ব্রতী একটি সংগঠনে কাজ করেন। সংগঠনটির নাম আলি সেন্টার, আলি অর্থে মহম্মদ আলি। সংখ্যাগুরু বা সাংস্কৃতিক ভাবে আধিপত্যকারী গোষ্ঠীর চাপে অন্যরা যাহাতে পর্যুদস্ত না হয়, বিভিন্ন বর্গের মানুষ যাহাতে পূর্ণ মর্যাদায় ও স্বাতন্ত্রে এক যথার্থ বহুবর্ণ সমাজ গঠন করিতে পারে, এই প্রতিষ্ঠান সেই উদ্দেশ্যেই কর্মরত। নাতাশা স্বাভাবিক ভাবেই এই প্রতিষ্ঠানের কাজে আপনার সার্থকতা খুঁজিয়া পাইয়াছেন।

নাতাশারা ব্যতিক্রমী থাকিয়া যান কেন? যে সৎ আবেগ তাঁহাকে বা তাঁহার মতো অল্প কয়েক জনকে অনুপ্রাণিত করে, অধিকাংশ মানুষ কেন তাহার শরিক হন না? অধিকাংশই স্বভাবে স্বার্থপর— এমন যুক্তি দিয়া অধিক দূর পৌঁছানো যাইবে না, কারণ স্বভাব আকাশ হইতে পড়ে না। সমাজের পরিবেশ সচরাচর স্বভাবকে অনেকখানি তৈয়ারি করে। এই কারণেই কালক্রমে মানুষের স্বভাব পালটায়, এই কারণেই দেশভেদে স্বভাব বদলায়। সমকালের অধিকাংশ কিশোরকিশোরী যদি মহাজীবনের কাহিনি হইতে প্রেরণা বা প্রত্যয় সংগ্রহ করিতে না পারে, তাহার কারণ তাহাদের সামাজিক পরিবেশের মধ্যে সন্ধান করাই শ্রেয়। জীবনধারার ছাপ তাহাদের চেতনাকে গড়ে, যেমন তাহাদের পূর্বপ্রজন্মগুলির চেতনাকেও গড়িত। সেই জীবনধারা কি তবে প্রেরণা অর্জনের মানসিক সামর্থ্যকে হরণ করিয়া লইতেছে? নাতাশার কাহিনি এই প্রশ্নটিই তুলিয়া দিয়াছে।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement