সম্পাদকীয় ১

নিপাট বাঙালি

কালিদাস সম্বন্ধে প্রচলিত গাছের ডাল কাটিবার গল্পটি যদি সত্যও হয়, তবুও তাঁহাকে বাঙালির সহিত তুলনা করিলে মহাকবি অপমানিত বোধ করিতেন। বাঙালির সমস্যা সম্ভবত তাহার ডিএনএ-তে। যে কোনও পরস্থিতিতে বাঙালি প্রথমে দেখিয়া লয়, কোন পথে হাঁটিলে নিজের সর্বাধিক ক্ষতিসাধন সম্ভব।

Advertisement
শেষ আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০১৫ ০০:০১
Share:

কালিদাস সম্বন্ধে প্রচলিত গাছের ডাল কাটিবার গল্পটি যদি সত্যও হয়, তবুও তাঁহাকে বাঙালির সহিত তুলনা করিলে মহাকবি অপমানিত বোধ করিতেন। বাঙালির সমস্যা সম্ভবত তাহার ডিএনএ-তে। যে কোনও পরস্থিতিতে বাঙালি প্রথমে দেখিয়া লয়, কোন পথে হাঁটিলে নিজের সর্বাধিক ক্ষতিসাধন সম্ভব। তাহার পর, সর্বশক্তিতে সেই পথে হাঁটিতে থাকে। ত্রিপুরী কংগ্রেসের সুভাষচন্দ্রই হউন অথবা রেলের পণ্য সমীকরণে সানন্দ সম্মতি দেওয়া বিধানচন্দ্র, বাঙালির আত্মঘাতের ইতিহাস সুদীর্ঘ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিঙ্গুর হইতে টাটা মোটরস-এর কারখানা বিতাড়ন করিয়াই মহাকরণের অধিশ্বরী হইয়াছিলেন। আনন্দবাজার পত্রিকা যাহাই বলুক না কেন, সেই আত্মঘাতে বাঙালির উল্লাস ছিল চোখে পড়িবার মতো। কেহ একেবারে হাতে ধরিয়া ভবিষ্যৎ ধ্বংস করিতেছে, দেখিলে মর্ষকামী জাতের বেজায় ফুর্তি হয় বইকী। সিপিআইএম এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠশালার ছাত্র হইয়াছে। লক্ষ্য স্থির করিয়া লউন। দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট এখনও আছে। যদি কারখানাটিকে তাঁহারা গুজরাতে পাঠাইয়া দিতে পারেন, কে জানে, হয়তো ভোটের দেবতা ফের তাঁহাদের প্রতি প্রসন্ন হইবেন।

Advertisement

ভোটের দেবতার সাক্ষাৎ পাইতে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের হতমান মনসবদারদের এখনও অনেক দেরি। কিন্তু, তাঁহাদের সাধনা ঠিক পথেই চলিতেছে। গত বৃহস্পতিবার কলিকাতার রাজপথে তাঁহারা যে কুনাট্য ফাঁদিয়া বসিয়াছিলেন, তাহা আত্মঘাতী বাঙালির হৃদয়ের বড় কাছাকাছি। রাজপথে তাঁহারা পুলিশকে তাক করিয়া পচা ডিম, টমেটো ছুড়িলেন, পুলিশও তাঁহাদের বেধড়ক পিটাইল। রক্তাক্ত নেতাদের ছবি টেলিভিশনের পর্দা বহিয়া বাঙালির ড্রয়িং রুমে পৌঁছাইল। শহিদ না হইলে বঙ্গ রাজনীতিতে কলিকা পাওয়া দুষ্কর। আর, শহিদ হইবার সেরা অস্ত্র রাস্তার রাজনীতিতে পুলিশের মার খাওয়া। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন এখনও প্রতি ২১ জুলাই তাঁহার বালখিল্যসুলভ হঠকারিতার বর্ষপূর্তি উদ্্যাপন করেন। মানুষ ‘খায়’ বলিয়াই তো। বিমান বসুদের শহিদ হইবার পথে বৃহত্তম সহায়ক পুলিশ। বাম আমলের ৩৪ বৎসরে পুলিশের কুশলতা শূন্যে ঠেকিয়াছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাড়ে চার বৎসর তাহাকে মহাশূন্যে পাঠাইয়াছে। কী ভাবে জনতা সামলাইতে হয়, পুলিশ সেই পাঠ ভুলিয়াছে। বাস্তব বৈদ্যের ন্যায় অফিসার নিতান্তই ব্যতিক্রমী। পুলিশ এখন ভয় পাইয়া লাঠি চালাইয়া দেয়। আর, লাঠি চলিলে শহিদ হওয়া ঠেকায় কে?

সম্পূর্ণ হঠকারী সিদ্ধান্তে শহিদ হওয়া বাঙালির ডিএনএ-তে অনপনেয়। তাহার কারণ, বাঙালি রাজনীতি বোঝে না। বালখিল্যসুলভ লম্ফঝম্পই তাহার রাজনীতির সার। একদা প্রেসিডেন্সি কলেজের এক ছাত্র নাকি কলেজের এক অধ্যাপককে ঠ্যাঙাইয়াছিলেন। কাহিনিটি সত্য না মিথ্যা, ছাত্রটি তাহা কখনও খোলসা করিয়া বলেন নাই। কিন্তু, অধ্যাপক-প্রহারের সেই ‘খ্যাতি’ই তাঁহাকে বাঙালির ‘নেতাজি’ করিয়াছিল। তাহারও পূর্বে এক বাঙালি বালক কোনও এক অত্যাচারী ইংরেজকে হত্যা করিবার চেষ্টায় দুই নিরীহ মহিলাকে খুন করিয়া ফাঁসি গিয়াছিলেন। বাঙালি সেই ক্ষুদিরামকে বিশেষণে পরিণত করিয়াছে বটে, কিন্তু তাহার হঠকারিতা হইতে শিক্ষা লয় নাই। ছাত্ররা না হয় অপরিণতমনস্ক, কিন্তু যাঁহার পরিচিতিই ‘মাস্টারদা’ হিসাবে, সেই সূর্য সেনও একটি গোটা অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ন্যায় এক বিচিত্র পরিকল্পনা করিতে এবং কিছু সাঙ্গোপাঙ্গ সমেত তাহার বাস্তবায়নে পিছপা হন নাই। তাঁহারা নিপাট বাঙালি। শহিদ হওয়াই তাঁহাদের সাধনা। সিপিআইএম ফের সেই পথ ধরিয়াছে। শত বার ধুইলেও যাহার কালিমা ঘুচে না, ডিএনএ তাহাকেই বলে।

Advertisement

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement