প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়িয়া দিবার ঠিক আগে বারাক ওবামা মার্কিন সমাজের একটি বিরাট উপকার করিলেন। তাঁহার বিদায়ী ভাষণ দিয়া সমাজের এক বড় অংশের গভীর মানসিক ক্ষতের চিকিৎসা করিলেন। তিনি স্বভাবতই সুবাগ্মী। কিন্তু এ দিনের বক্তৃতাটি কেবল লালিত্যে বা শক্তিতে সমৃদ্ধ বলিলে কম হয়, সামাজিক প্রয়োজনের দিক দিয়াও ইহার গুরুত্ব অশেষ। নভেম্বর মাসের পর হইতেই মার্কিন নাগরিকদের এই অংশটিকে দেখিয়া-শুনিয়া বোধ হইতেছিল, তাঁহাদের জন্য বাস্তবিক কিছু মন-চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, উজ্জীবনী বার্তা জরুরি। নির্বাচনে কেহ জেতেন, কেহ হারেন, ইহা নিয়মিত ব্যাপার। কিন্তু ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের জয় ঠিক নিয়মিত ঘটনার মধ্যে পড়ে না। তাহার মধ্যে এমন এক আঘাত ছিল, যাহা আমেরিকার এত দিনের অস্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাসের মূলটি কাঁপাইয়া দিয়াছে। লিবারেল আমেরিকা এই মুহূর্তে রীতিমতো ব্যাধি-কাতর, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, বড় শহরের পাড়ায় পাড়ায়, দেশজোড়া অভিবাসী সমাজের দৈর্ঘ্যপ্রস্থব্যাপী সেই অসহায় অসুখ দৃশ্যমান। ইঁহারা সংখ্যায় কত, বিপরীত পক্ষ অপেক্ষা কম না বেশি, সে সব বিচার নিষ্প্রয়োজন (যদিও তথ্যমতে সংখ্যাটি কম নহে, অর্ধাংশের বেশিও হওয়া সম্ভব)। ঘটনা হইল, আধমরাদের ঘা দিয়া বাঁচাইবাবার দায়টি যে ওবামা বিদায়কালে ভুলিয়া যান নাই, তাঁহার দেশের ইতিহাস সে জন্য তাঁহাকে মনে রাখিবে।
আট বৎসরে ওবামা বহু পরাজয় দেখিয়াছেন। ওবামাকেয়ার নামক তাঁহার ঐতিহাসিক স্বাস্থ্যবিমা সংস্কার নীতিটি অত্যল্প ব্যবধানে পাশ হয়। একের পর এক তাঁহার আন্তরিক পছন্দের নীতি (যেমন বন্দুক সংবরণ) কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরীক্ষায় ফেল করে। তাঁহার পশ্চিম এশিয়া নীতি সমালোচনার ঘায়ে মূর্ছা যাইবার জোগাড় হয়। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে ইজরায়েল-বিরোধিতার সিদ্ধান্তে ছিছিক্কারের সীমা থাকে না। সংবেদনশীল মুসলিম-অভিবাসী নীতির জন্য তাঁহাকে মুসলিম-তোষণের দায়ে ‘প্রেসিডেন্ট ওসামা’ পরিচয়ে ভূষিত হইতে হয়। অথচ শেষ বক্তৃতায় তিনি সব ব্যর্থতা, অসম্পূর্ণতা, মালিন্যের ঊর্ধ্বে উঠিয়া একটি সবল আশাবাদিতার স্বপ্ন বুনিয়া দিতে পারিলেন। গণতন্ত্রের বিরাট সম্ভাবনায় আস্থা রাখিতে বলিলেন। দেশের বহুধর্ম বহুবর্ণ বহুসংস্কৃতি পরিচয়ে গর্ব প্রকাশ করিলেন। মার্কিন সংস্কৃতির মধ্যে যে বহুত্ব আপনিই আগাগোড়া উপস্থিত কিন্তু বর্তমানে যাহা ভিতর-বাহিরের আঘাতের ভয়ে টলোমলো, ওবামা তাহার উপর আবার বিশ্বাস ফিরাইয়া আনিতে চাহিলেন।
ওবামা হয়তো জানিলেন না— তাঁহার নিজ দেশের সীমারেখা ছাড়িয়া দূর-দূরান্তরেও তাঁহার সে দিনের বক্তব্যের আমূলপ্রোথিত লিবারেল গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার বার্তা কতখানি আশ্বাস ছড়াইয়া দিল। গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে সংখ্যাগুরুর তন্ত্রের অভিযান তো কেবল মার্কিন দেশেরই বাস্তব নয়, বিশ্বের বহু দেশেই সংখ্যালঘু ও ভিন্ন পরিচয়ের মানুষ একই ভাবে শাসিত হইতেছে। আমেরিকাই শুধু অভিবাসীদের হাতে-গড়া দেশ নয়, অন্যান্য দেশেও জাতীয় সংস্কৃতি, জাতীয় পরিচিতি ভিতর-বাহিরের নিরন্তর সংযোগে নির্মিত: আজ হঠাৎ দরজা বন্ধ করিয়া দিয়া ভূমিপুত্র পরীক্ষা লইতে বসিলে সেই দেশগুলিও বাঁচিবে না। আসলে লিবারেল গণতন্ত্র একটি আদর্শ মাত্র নয়, ইহা একটি ‘ওয়ে অব লাইফ’ বা বাঁচিবার ধরন। আঘাত বা প্রতিরোধ আসিতেছে বলিয়া সেই ধরনটি পত্রপাঠ বাতিল করিয়া দেওয়া যায় না, বরং আরও বেশি করিয়া তাহাকে তুলিয়া ধরিতে হয়। কেননা, ওবামা স্মরণ করাইয়াছেন যে, ইতিহাস সর্বদা সোজা পথে এগোয় না, বাঁকাচোরা ঘুরপথেও এগোয়। কেবল— পথটি গুলাইয়া গেলে চলিবে না।