এসএসকেএম হাসপাতালে বৃহস্পতিবার যাহা ঘটিল, তাহার ব্যাখ্যা খুঁজিতে হইবে দুইটি ভবনে। স্বাস্থ্য ভবন এবং তৃণমূল ভবন। নেতা ও আমলা, এই দুই শ্রেণি এ রাজ্যের মেডিক্যাল কলেজগুলিকে খেলার সামগ্রী করিয়া তুলিয়াছে। কলেজের অধ্যক্ষ, হাসপাতালের সুপারিন্টেন্ডেন্টের স্বাতন্ত্র্য নাই, স্বাধীনতা নাই। যাঁহারা একটি ওয়ার্ডবয়কে ধমক দিতেও ভয় পান, শৃঙ্খলা রক্ষা করিবার ক্ষমতা তাঁহাদের থাকিবে না, তাহা প্রত্যাশিত। তাহার ফলে যাহা হইবার, তাহাই হইয়াছে। ক্ষিপ্ত রোগীর পরিবার ডাক্তারকে আক্রমণ করিয়াছে, ক্ষিপ্ত ডাক্তাররা অধিকর্তাকে ঘেরাও করিয়া কর্মবিরতি ঘোষণা করিয়াছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নির্বাক, নিশ্চেষ্ট। অরাজকতা চলিয়াছে দশ ঘণ্টা। রাজনৈতিক নির্দেশের অপেক্ষাতেই যে এই সময়টি অতিবাহিত, তাহা স্পষ্ট। মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিস্থিতি নাই, কখনওই ছিল না। সেই অবসরে রোগীর নিত্যদিনের যন্ত্রণা কয়েকগুণ বর্ধিত হইয়াছে। চিকিৎসা পাইবার আশাটুকু লইয়া অন্য দিন তাঁহারা ঘণ্টা গনিয়া থাকেন, ওই দিন সেই আশাটুকুও ছিল না। নাগরিকের টাকায় পরিচালিত হাসপাতাল, তাহাদের টাকায় বেতনভুক সরকারি ডাক্তার তাঁহাদেরই চিকিৎসা না দিয়া খেদাইয়া দিয়াছে।
এমন ঘটনা নূতন নহে, মাঝেমাঝেই এই নাটকের অভিনয় হইয়া থাকে। প্রহৃত ডাক্তার ও অবহেলিত রোগী, উভয়েই ন্যায়ের জন্য কোলাহল করিতে থাকেন। অতঃপর পুনরায় অদক্ষ, দুর্নীতিবিদ্ধ, দায়বদ্ধতাহীন চিকিৎসা পরিষেবা তাহার ‘স্বাভাবিক’ অবস্থায় ফিরিয়া আসে। সাধারণত হাসপাতাল প্রশাসনের কোনও এক নিধিরাম সর্দারকে বদলি করিয়া ন্যায়ের দৃষ্টান্ত রচনা করে রাজ্য সরকার। কিন্তু ‘অন্যায়’ কোথায়, সে প্রশ্নটি তলাইয়া দেখা হয় না। মেডিক্যাল কলেজগুলিতে চিকিৎসায় অদক্ষতা, দুর্ব্যবহার ও দুর্নীতি, সকল অন্যায়ের কেন্দ্রে রহিয়াছে নেতাদের দাপট। এক দিকে তাঁহারা চিকিৎসকদের নিয়োগ ও বদলি নিয়ন্ত্রণ করিতেছেন, অপর দিকে রোগী ভর্তির সুপারিশ পাঠাইতেছেন। হাসপাতালের সকল প্রশাসনিক কাজে নাক গলাইতেছেন। তাঁহাদের প্রভাব কোথায় পৌঁছাইয়াছে, তাহা কুকুরের ডায়ালিসিসের প্রস্তাবটি হইতেই স্পষ্ট হইয়াছিল।
রাশ কাহার হাতে, বিলক্ষণ বুঝিয়াছেন ডাক্তাররা। তাঁহারা নেতাদের তুষ্ট করিবার কাজে মনপ্রাণ দিয়াছেন। কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁহাদের শৃঙ্খলা, তৎপরতা, দক্ষতা দেখাইবার প্রয়োজন কী? রোগীদের প্রতি মানবিক হইবারই বা প্রয়োজন কোথায়? কর্তৃপক্ষের দশাও করুণ। আলস্য, অদক্ষতার জন্য কাহাকেও তিরস্কার করিলে তাঁহাদেরই পদ খোয়াইবার সম্ভাবনা। তাই মূল্যায়নের চেষ্টাও তাঁহারা করেন না। ফলস্বরূপ রোগী অকারণে ‘রেফার’ হইয়া বড় হাসপাতালে ছুটিতেছেন, হাসপাতালের এক বিভাগ থেকে অন্য বিভাগে লাঞ্ছিত, অপমানিত হইয়া ফিরিতেছেন, হাসপাতালে আসিয়াও বিনা চিকিৎসায় মরিতেছেন। এই সকল সমস্যার সমাধান, মেডিক্যাল কলেজগুলিকে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়া। চিকিৎসক নিয়োগ, পদোন্নতি হইতে হাসপাতাল প্রশাসনের সকল খুঁটিনাটির দায়িত্ব তাহাদের উপরেই ন্যস্ত করিতে হইবে। বিশ্বের কোনও উন্নত দেশে মন্ত্রীর সুপারিশে রোগী ভর্তি হয় না। মেডিক্যাল কলেজে নেতা-আমলাদের কর্তৃত্ব কায়েম করিবার ফলে চিকিৎসার কী দশা হইয়াছে, তাহা এসএসকেএম-কাণ্ড ফের স্পষ্ট করিয়া দিয়াছে।