গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম
নবম ও দশম— মাত্র দু’টি বছর আমি বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। বাবার ছিল বদলির চাকরি, তাই আসানসোল থেকে এসে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলাম বালিগঞ্জের সরকারি স্কুলে। সময়টা ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১। গোটা জীবনের নিরিখে দু’বছর খুব কম হলেও তা অমূল্য। আমি মনে করি, শুধু লেখাপড়া, ভাল ফল, সামাজিক প্রতিষ্ঠাই নয়; বরং ওই দু’বছরের শিক্ষা আমাকে গড়েপিঠে নিয়েছে। শিখিয়েছে অনেক কিছু।
বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাস সুপ্রাচীন। শতবর্ষের দ্বারে যে বিদ্যালয়, তার ঐতিহ্য নিয়ে আলাদা করে বলার আর কী-ই বা থাকতে পারে! তবে ওই বিশাল স্কুলভবন, সামনের খোলা মাঠ, বড় বড় জানলা, প্রার্থনাকক্ষের উঁচু ছাদ আমাকে শিখিয়েছে অনেক কিছু। শিখিয়েছেন আমাদের শিক্ষকেরা। আজও সেই মানুষগুলি মনের মধ্যে বাস করেন। তাঁদের শিক্ষাকে জীবনে বহন করে চলতে চেষ্টা করি, সেটাই আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য। দীর্ঘ দিন কলকাতার বাইরে রয়েছি। কিন্তু স্কুলের প্রতি টান আজও অমলিন। প্রবীণ শিক্ষকদের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল, কারও কারও সঙ্গে আজও রয়েছে। ছোটবেলার বন্ধুদের সঙ্গেও সম্পর্ক অটুট।
আজ, আমাদের স্কুলের শতবর্ষ উৎসবের সূচনা। পেশাগত দায়বদ্ধতার কারণে এ সময় কলকাতায় উপস্থিত থাকতে পারছি না। কিন্তু আগামী বছর উদ্যাপনে নিশ্চয়ই যোগ দিতে যাব।
বোটানিক্যাল গার্ডেনে ১৯৮১ মাধ্যমিক ব্যাচ। নীচে বসে বাঁ দিক থেকে তৃতীয় আমি, ঠিক পিছনে বন্ধু সৌম্যেন চট্টোপাধ্যায়। ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে পাওয়া ছবি।
বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় আর কলকাতা— যেন একে অপরের পরিপূরক। শুধু পড়াশোনা নয়, এই স্কুল শিখিয়েছে জীবনে বাঁচার মন্ত্র। প্রাক্তনীদের নামগুলির দিকে একবার তাকালেই সে কথা বোঝা যায়। এ দিকে যেমন রয়েছেন সুখময় চক্রবর্তীর মতো অর্থনীতিবিদ, পার্থসারথি গুপ্ত থেকে রজতকান্ত রায়ের মতো ইতিহাসবিদ তেমনই রয়েছেন ঋত্বিক ঘটক, সত্যজিৎ রায়, শম্ভূ মিত্রেরা। রয়েছেন রাহুলদেব বর্মন। শিক্ষা ক্ষেত্রের পাশাপাশি শিল্প সংস্কৃতির দিক থেকেও এই স্কুল অগ্রণী।
আর এ প্রসঙ্গে অবশ্যই বলতে হয় আমাদের স্কুলের মাঠটির কথা। অল্প-বিস্তর আজও প্রায় একই রকম রয়ে গিয়েছে। আমরা কখনও পড়ার বইয়ে মুখ গুঁজে থাকিনি তো! ওই মাঠ দাপিয়ে খেলেছি ফুটবল। গান গেয়েছি, নাটক করেছি। উৎসাহ দিয়েছেন শিক্ষকেরা। এই তো সে দিনও আমাদের শিক্ষক বেণীমাধববাবুর সঙ্গে দেখা হল। বছর খানেক আগে আমাদের বন্ধু সৌম্যেন (সৌমেন চট্টোপাধ্যায়, অধ্যাপক, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়) নৈনিতালে নিয়ে এসেছিলেন তাঁকে। সে সময় আমি আর্যভট্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এ অধিকর্তা হিসাবে কাজ করছিলাম।
প্রায় সকলের কথাই মনে রয়ে গিয়েছে। অঙ্ক করাতেন কাশীনাথ খামরুই, সুনীলবাবু। ইংরেজি পড়াতেন প্রভাতবাবু। তাঁর সঙ্গেও যোগাযোগ হয়েছে কিছু দিন আগেও। বাংলা পড়াতেন মনোরঞ্জনবাবু, ইতিহাসে শৈলেশবাবু। আমি নিজে বিজ্ঞানের ছাত্র। কিন্তু সাহিত্য, ইতিহাসের পাঠ তাঁরা এমন ভাবে দিয়েছিলেন, আজও তা অন্তরে অমলিন। আজও আমি বাংলা সংস্কৃতির চর্চায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে ভালবাসি। বেঙ্গালুরুতে থিয়েটার করি। কলকাতায়ও।
আমাদের শিক্ষকেরা এমন ভাবে পড়াতেন, যা আমাদের প্রাণিত করত। মনের গভীরে ছাপ রেখে গিয়েছে সেই শিক্ষা। ওই সময়ে সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের যে পাণ্ডিত্য, মেধা এবং মনন ছিল, তাতে তাঁরা যে কোনও কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতে পারতেন। আমি ব্যক্তিগত ভাবে এমনই মনে করি। বলতে দ্বিধা নেই, আজকাল স্কুলশিক্ষকদের মধ্যে সেই নিষ্ঠা, অধ্যবসায় এমনকি জ্ঞানেরও অভাব লক্ষ করি।
আমার জীবনে একটা আক্ষেপ রয়ে গিয়েছে। মাধ্যমিকের পর ফের স্কুল বদলেছিলাম। সে সময় সরকারি স্কুলের শিক্ষকেরা ঘন ঘন বদলি হয়ে যেতেন। আমার নির্বাচিত বিষয়ে শিক্ষকের অভাব ছিল বলে ভর্তি হয়েছিলাম এক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। বলতে দ্বিধা নেই, আমার সেই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল এবং এ কথা আমি বুঝতে পেরেছিলাম ছাত্রাবস্থায়ই।
ইংরেজি মাধ্যম আর বাংলা মাধ্যম স্কুল নিয়ে অনেক কথা হয় আজকাল। নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা মনে করে বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়লে পরবর্তী কালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়।
কিন্তু আমরা?
আমরা তো ছোটবেলা থেকে বাংলা মাধ্যম স্কুলেই পড়েছি। তার পর উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা, দেশ বিদেশে পড়াশোনা থেকে নানা পদে কাজ করেছি— কোথাও তো এতটুকু অসুবিধা হয়নি আমাদের। একাদশে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে গিয়ে দেখেছি, ব্যাকরণগত যেটুকু ভুল আমরা করি, ছোটবেলা থেকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়া ছেলেমেয়েরাও তা-ই করে। হ্যাঁ, সেখানেও কৃতিত্ব সেই আমাদের শিক্ষকদেরই। তাঁরাই গড়ে দিয়েছেন আমাদের ভিত।
আমি মনে করি, প্রাথমিক ভাবে শিক্ষা মাতৃভাষায় হওয়াই প্রয়োজন। তাতে বিকাশ আরও সুন্দর হয়, মজবুত ভিতের উপর গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ। এখন তো বাংলা ভাষার চর্চা প্রায় হারিয়েই যাচ্ছে। সত্যিই বেদনাদায়ক। আমাকে যদি কৃতী ছাত্র হিসাবে গণ্য করা হয়, তা হলে তো সত্যিই আমার বক্তব্যের একটা জোর থাকে। সে ক্ষেত্রে বালিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তনী হিসাবে আমি জোর গলায় বলতে চাই বাংলা ভাষার উপর টানটি গড়ে ওঠে বাংলা মাধ্যমে পড়লেই।
লেখক, ইন্ডিয়ান ইনস্টিউট অফ স্পেস টেকনোলজি-র উপাচার্য
(সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত)