নিজস্ব চিত্র।
মার্চ থেকেই রান্নার গ্যাসের জোগান কমতে চলেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। চলতি সপ্তাহের শুরু থেকে মিড ডে মিল রান্না নিয়ে চিন্তায় স্কুলগুলি। মঙ্গলবার অনেক স্কুলের তরফেই জানানো হয়েছিল আগামী দু’দিনে কী হবে তা বুঝেই উঠতে পারছেন না কর্তৃপক্ষ। বিকল্প ব্যবস্থার কথা আগামী ভাবতে শুরু করেছেন তাঁরা। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার তিনি বলেন, “কোনও ভাবেই মিড ডে মিল বন্ধ করা যাবে না। গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্রটি কেমন তা জানাতে হবে কেন্দ্রকে।”
মঙ্গলবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার মথুরাপুর এলাকার কৃষ্ণচন্দ্রপুর হাই স্কুলে রান্নার গ্যাসের বিকল্প হিসাবে কাঠ মজুত করা হয়েছিল। বুধবার গ্যাস না পেয়ে সেই কাঠের জ্বালানিতেই ১৫০০ পড়ুয়ার মিড ডে মিল রান্না হল। মাটির উনুনই আপাতত ভরসা। বৃহস্পতিবার বা তার পর কী হবে, তা নিয়ে ভাবছেন কর্তৃপক্ষ। প্রধানশিক্ষক চন্দন মাইতি এ দিন বলেন, “মঙ্গলবারই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম কী হতে চলেছে। তাই প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কিন্তু কাঠের জোগান তো পর্যাপ্ত নয়। এ ভাবে কতদিন চলবে! সরকারের তরফে পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
বড়জাগুলি গোপাল অ্যাকাডেমির ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক রাজকুমার হাজরা বুধবার বলেন, “আজকের মতো যা রান্না হয়েছে, তাতে সিলিন্ডার ফুরিয়ে গিয়েছে। আগামী কাল কী হবে জানি না। বিডিও অফিসে, গ্যাস সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। কোনও ভাবেই মিড ডে মিল বন্ধ হতে দেওয়া যাবে না।” মিড ডে মিল চালু রাখার তাগিদেই আপাতত ছুটছেন শিক্ষকেরা। নদিয়ার একটি স্কুলে শিক্ষকদের চা-জলখাবারের জন্য রাখা ছোট সিলিন্ডার দিয়ে নাকি বুধবার কোনও রকমে কিছু খাবার তৈরি করে দেওয়া হয়েছে পড়ুয়াদের। কিন্তু এর পর কী হবে, তা নিয়ে রয়েছে দুশ্চিন্তা।
হুগলি জেলার পিএম পোষণ স্কিমের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক শিক্ষা দফতরকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, জেলার ইতিমধ্যেই রান্নার গ্যাসের সঙ্কট তৈরি হয়েছে। অবিলম্বে হস্তক্ষেপ না করলে পড়ুয়াদের মিড ডে মিলে সমস্যা তৈরি হবে।
কাঠের জ্বালানি সংগ্রহে হাত লাগিয়েছেন স্কুলের শিক্ষকও। নিজস্ব চিত্র।
পরিস্থিতি প্রায় একই কলকাতায়। সেখানে স্কুলে স্কুলে রান্না হয় না। কমিউনিটি কিচেনে রান্না করে তা সরবরাহ করা হয়। রান্নার দায়িত্বে থাকা এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ ইন্দ্রনীল মুখোপাধ্যায় বলেন, “কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার প্রায় ৭০টি স্কুলে প্রত্যেক দিন খাবার দিতে হয়। প্রতিদিন অন্তত চারটি সিলিন্ডার প্রয়োজন হয়। বুধবার ২টি সিলিন্ডার পাওয়া গিয়েছে। তাই ডিম সিদ্ধ দেওয়া হয়েছে। তবে তাতে স্কুলগুলি থেকে আপত্তি উঠেছে। বৃহস্পতিবার তাই খিচুড়ি দেওয়া হবে।”
কলকাতার রানি রাসমণি হাই স্কুলের প্রধানশিক্ষক মহসিন ইমাম বলেন, “অনেক পড়ুয়া দুপুরের খাবার স্কুলেই খায়। আমাদের স্কুলে রোজ ৭০-৮০ জন পড়ুয়া মিড ডে মিল পায়। বুধবার তাদের শুধু ডিম সিদ্ধ দেওয়া হয়েছে। আমরা শিক্ষা দফতরকে বিষয়টি জানিয়েছি। আশা করি দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে।”
কলকাতা জেলার প্রাইমারি স্কুল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান কার্তিক মান্না বলেন, “রান্নার গ্যাসের একটা সঙ্কট তৈরি হয়েছে। কিন্তু পড়ুয়াদের খাবার কোনও ভাবেই বন্ধ করা যাবে না। আমরা ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি, বিকল্প হিসাবে কাঠ কয়লা ও ডিজেলের ব্যবহার করার চেষ্টা করা হবে, যত দিন না পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে।”
অন্য দিকে রাজ্য সমগ্র শিক্ষা মিশনের তরফে সব জেলার প্রাইমারি কাউন্সিলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তারা যেন গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটরদের সঙ্গে যোগাযোগ কথা বলেন। যাতে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে। পাশাপাশি মুখ্য সচিবের নেতৃত্ব শিক্ষা দফতরের প্রধান সচিবের উপস্থিতিতে বৈঠক চলছে। এই পরিস্থিতি কী ভাবে সামাল দেওয়া যায়।
শিক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, সরকারি তরফে আরও আগেই তৎপরতার প্রয়োজন ছিল। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডল বলেন, “যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকেই সরকারের বুঝে নেওয়া উচিত ছিল যে, গ্যাসের জোগানে টান পড়তে পারে। এত পড়ুয়ার মধ্যাহ্নভোজনের দায়িত্ব সরকারের। তাই আরও আগেই বিষয়টি নিয়ে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল।”
দক্ষিণবঙ্গের এক জেলার মিড ডে মিলের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক আধিকারিক বলেন, “সরকারি ভাবে আমাদের কাছে কোনও নির্দেশিকা নেই। বিভিন্ন স্কুল থেকে আমাদের কাছে জানতে চাইছে। কিন্তু আমরা তো বুঝতে পারছি না কী করব! তাই সকলকে নিজেদের মতো বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে বলা হয়েছে। বিকাশ ভবনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছি।”
যদিও বিকাশ ভবন সূত্রের খবর, ইতিমধ্যে রাজ্যের সমস্ত জেলায় জেলাশাসকের অফিসে মিড-ডি মিল বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, প্রাথমিক ভাবে গ্যাস সরবরাহকারীদের কথা বলার। তাদের বক্তব্য-সহ রিপোর্ট পাঠাতে হবে স্কুলশিক্ষা দফতরে। একই ভাবে সরকারের সঙ্গেও এই বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে, সেখানেই বিকল্প রূপরেখা নির্ধারণ করা হবে।
বিকাশ ভবনের এক কর্তা বলেন, “মিড ডে মিল কোনও ভাবেই যাতে বন্ধ না হয়, সে চেষ্টা চলছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।”