কলকাতার স্কুলে খাবার জোগাবে ইসকন! গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
মিড-ডে মিলের দায়িত্ব পাবে ইসকন।
সোমবার রাজ্য বাজেটে কলকাতা পুরসভা এলাকার স্কুলগুলির জন্য এমনই ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। আর তার পরই ছড়িয়েছে ধোঁয়াশা। ইসকন কী ভাবে মিড-ডে মিলের দায়িত্ব নেবে? কারা পরিচালনা করবে? কী খাবার পড়বে পড়ুয়াদের পাতে? তা হলে স্কুল পড়ুয়ারা দুপুরের পাতে ডিম পাবে কী করে? কলকাতায় কি তবে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে গুজরাত মডেল? প্রশ্ন অনেক, উত্তর অমিল।
যদিও বিধানসভার অধিবেশন শেষ হওয়ার পরই সাংবাদিকদের মুখোমুখি বসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “পাইলট প্রজেক্ট হিসাবে কলকাতার স্কুলগুলির জন্য মিড-ডে মিলের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে ইসকনকে। তারাই খাওয়াবে। খেয়ে দেখুন গুণমানে ভাল। আপনার ইচ্ছা না বলে ‘হরেকৃষ্ণ’ বলবেন না।” ফলে একপ্রকার স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, কলকাতা এলাকার স্কুলগুলিতে মিড-ডে মিল সরবরাহ করবে ওই সংস্থাই।
কিন্তু কলকাতার কিছু স্কুলে এখনও মিড-ডে মিল রান্না হয়। কিছু স্কুলে কমিউনিটি কিচেন থেকে খাবার আসে। কবে থেকে এই পদ্ধতিতে বদল আসবে, তা পরিষ্কার নয় দফতরের কাছেও। দফতরের এক কর্তা জানান, দায়িত্ব বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, তা নির্দেশিকা না আসা পর্যন্ত বলা যাবে না।
হিসাব বলছে, ইসকন খাবার দেয় দেশের বেশ কিছু রাজ্যের পড়ুয়াদের। ‘অক্ষয় পাত্র’ নামের বিশেষ প্রকল্পের আওতায় ওই সংস্থাটি দরিদ্র শিশুদের খাবার জোগায়। জানা গিয়েছে, গুজরাতে মিড-ডে মিলের দায়িত্বে রয়েছে ইসকন। কিন্তু সেখানেই প্রশ্ন উঠছে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে। কলকাতার এক শিক্ষক প্রশ্ন তুলছেন, “গুজরাত তো নিরামিষভোজী রাজ্য। সেখানে বিষয়টি নিয়ে এত প্রশ্ন উঠবে না। কিন্তু কলকাতার পড়ুয়ারা তো প্রাণিজ প্রোটিন পেতে চাইবে। কী খাওয়ানো হবে তাদের?”
বিকাশ ভবন সূত্রের খবর, স্কুলশিক্ষা দফতরের অধীনস্থ স্কুলগুলিতে প্রতি সপ্তাহেই ডিম দেওয়া হয়। দক্ষিণ কলকাতার একটি স্কুলের প্রধান দাবি করেন, পুষ্টিগুণের বিচারে মিড-ডে মিলের খাদ্যতালিকা তৈরি করা হয়। সেখানে আমিষ খাবার রাখা জরুরি। কিন্তু ইসকনকে যদি খাবারের দায়িত্ব দেওয়া হয় তা হলে শিশুরা নিরামিষ খেতে পাবে, এটা মনে করা যেতেই পারে। কিন্তু তা অনেকের পছন্দ নাও হতে পারে। তাঁর প্রশ্ন, “সরকার কি এ ভাবে জোর করে খাদ্যাভ্যাস পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে?” আর এক স্কুলের প্রধান তুলেছেন রুজির প্রশ্ন। তিনি বলেন, “আমাদের স্কুলে তো রান্না হয়। রাঁধুনি এবং সহযোগী নিযুক্ত হয়েছেন। ইসকন দায়িত্ব নিলে তো তাঁদের চাকরি যাবে?” ইতিমধ্যেই সরকার ঘোষণা করেছে যে রাঁধুনিদের বেতন প্রতি মাসে ১ হাজার টাকা করে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বর্তমানে ২ হাজার টাকার পরিবর্তে তাঁরা পাবেন ৩ হাজার টাকা। কিন্তু আদৌ চাকরিটা থাকবে তো? প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষকদের একাংশ।
দেশের বহু রাজ্যেই নিরামিষাশীর সংখ্যাধিক্য। সে সব রাজ্যের স্কুলেও নিরামিষ খাবারই দেওয়া হয়। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ আমিষাশী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী এলাকায় এই সিদ্ধান্ত কী ভাবে হতে পারে, তা বুঝতে পারছেন না শিক্ষামহলের অনেকেই।
তা ছাড়া, আপাতত পাইলট প্রজেক্ট হিসাবে কলকাতার নাম ঘোষণা করেছেন অর্থমন্ত্রী। তাতে সম্মতি জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ফলে ধরে নেওয়া যায়, অন্য জেলার স্কুলগুলিতে মিড-ডে মিলের পাতে পড়বে প্রাণিজ প্রোটিন। কলকাতার পড়ুয়ারা কি বঞ্চিত হবে?
সোমবারের বাজেটে প্রাথমিক স্তরে মিড-ডে মিল খাতে বরাদ্দ পড়ুয়া পিছু ১০ টাকা করা হয়েছে। আগে তা ছিল ৬ টাকা ৭৮ পয়সা। উচ্চ প্রাথমিকে ১০ টাকা ৭১ পয়সা ছিল বরাদ্দ। সেখানে কোনও পরিবর্তন করা হয়নি। শিক্ষকদের একাংশ বলছেন, বয়সের মাপকাঠি এবং চাহিদার উপর ভিত্তি করেই বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়। সে ক্ষেত্রে কেন উচ্চ প্রাথমিকের বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হল না তা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। শিক্ষকদের দাবি, প্রাথমিকের থেকে উচ্চ প্রাথমিকের পড়ুয়াদের চাহিদা বেশি, খরচও বেশি। সেখানে কেন দু’টো স্তরের বরাদ্দ অর্থ কেন প্রায় সমান রেখে দেওয়া হল উঠছে সেই প্রশ্নও।
এ প্রসঙ্গে নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুজিত দাস বলেন, ‘‘একই রাজ্যের কোনও পড়ুয়ারা ডিম ও মাংস পাবে, আর কলকাতার পড়ুয়ারা নিরামিষ খাবে। এই বৈষম্য কেন? এই তো সরকার বলছিল তারা মাছ মাংস ও আমিষের বিরুদ্ধে নয়। বাস্তবে এ কেমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তারা?’’
অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের ( বিদ্যালয় শাখা) রাজ্যের সাধারণ সম্পাদক বাপি প্রামাণিক বলেন, ‘‘ইসকনের বিষয় নিয়ে কোনও লিখিত নির্দেশ আমরা পাইনি। তাই এই নিয়ে কোনও মন্তব্য করছি না। তবে আমরা মনে করি এই দায়িত্বগুলি কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হাতে গেলেই ভাল হয়।’’