Jadavpur University 2026

‘আমরা সন্ত্রাসবাদী নই’! প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিবাদে মিছিল, স্লোগান যাদবপুরের পড়ুয়াদের

হোক কলবর থেকে উপাচার্য ঘেরাও, সমাবর্তনের দিনে রাজ্যপাল তথা আচার্যের কাছ থেকে মেডেল নিতে অস্বীকার করার পাশাপাশি নানা আন্দোলনের সাক্ষী থেকেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। এ বার নজিরবিহীন ভাবে প্রধানমন্ত্রীর নিশানায় চলে আসায় ক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালের পড়ুয়া থেকে শিক্ষকেরা।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:৫০
Share:

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে প্রতিবাদ মিছিল। ছবি: সংগৃহীত।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়ালে লেখা হয় দেশবিরোধী স্লোগান, পড়াশোনার বদলে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেন শিক্ষার্থীরা, এমনই অভিযোগ করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। গত শুক্রবার বারুইপুরের এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের প্রতিবাদে সোমবার পথে নামলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া ও প্রাক্তনীরা।

Advertisement

সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টায় ক্যাম্পাস থেকে শুরু হয় প্রতিবাদ মিছিল। পোস্টারে লেখা, ‘আমার নাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, আমি সন্ত্রাসবাদী নই’। কোথাও লাল ব্যানারে পড়ুয়ারা লিখে ফেলেন, ‘বাবুল থেকে ব্রাত্য যাদবপুরেই ব্যর্থ’। মিছিল থেকে স্লোগান ওঠে, ‘নরেন্দ্র মোদী দূর হঠো, দাঙ্গাকারী দূর হঠো’।

গত শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল বারুইপুরের প্রচারসভায় প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা হচ্ছে না। তাঁর দাবি, রাজ্যের অন্যতম নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষা করতে পারছে না রাজ্য সরকার। অভিযোগ করেন, ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেছেন, যাদবপুরের ক্যাম্পাসে হুমকি দেওয়া হয়। দেওয়ালে দেশবিরোধী কথাবার্তা লেখা হয়। ছাত্রদের মিছিলে হাঁটতে বাধ্য করা হচ্ছে। পড়াশোনা হচ্ছেই না। তিনি বলেন, ‘‘পড়াশোনার বদলে রাস্তায় চলছে আন্দোলন, আমরা অরাজকতা চাই না, শিক্ষার পরিবেশ চাই।’’ এর পরই কড়া প্রতিক্রিয়া দেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

Advertisement

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রতিবাদী ছাত্রছাত্রীরা নিজস্ব চিত্র।

তবে, এই প্রথম নয়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নানা সময় নানা কথা বলেছেন রাজনীতিবিদেরা। ২০১৮-য় তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছিলেন কেন গোলমাল শুধু প্রেসিডেন্সি ও যাদবপুরেই হয়? হিন্দু স্কুলের ২০১তম প্রতিষ্ঠা দিবস অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেছিলেন, যাদবপুর-প্রেসিডেন্সির ৫-১০টা ছেলের জন্য পুরো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে!

আরও এক ধাপ এগিয়ে ২০১৬-এর অগস্টে বালিগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে তৎকালীন পঞ্চায়েতমন্ত্রী প্রয়াত সুব্রত মুখোপাধ্যায় যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সংস্কৃতি নিয়ে বলতে গিয়ে বলেন, ‘‘একটা রুমালে যতটুকু কাপড় থাকে, কেউ যদি ততটুকু কাপড় দিয়ে পোশাক বানিয়ে পরে, তবে তা অপসংস্কৃতি।’ তাঁর সংযোজন ছিল, ‘‘আমি আন্দোলনের বিরুদ্ধে নই। কিন্তু তা যেন সভ্যতা-ভব্যতা বজায় রেখে হয়। প্রেসিডেন্সি, যাদবপুরের ছেলেমেয়েরা অনেক বেশি উগ্র। এখন মনে হয়, ভাগ্যিস এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পড়িনি!” কয়েক বছরের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়ার পক্ষেও সওয়াল করেছিলেন সুব্রত।

২০২৫-এ শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুকে হেনস্থার অভিযোগ ওঠে যাদবপুরের পড়়ুয়াদের বিরুদ্ধে। পাল্টা শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ির ধাক্কায় এক পড়ুয়ার জখম হওয়ারও অভিযোগ তোলেন তাঁরা। এ বার বিধানসভা নির্বাচনের আবহে অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেন, “এতটা নীচে নামতে পারেন?’’ মুখ্যমন্ত্রী এ-ও জানান, প্রধানমন্ত্রী এমন মন্তব্য করে মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদেরই অপমান করলেন। আর ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা মানেই সেটা অরাজকতা নয়।

সে দিনই প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করে পড়ুয়ারা জানিয়েছিলেন, যাদবপুরের শিরদাঁড়া শক্ত। তাঁরা কাউকে ভয় পান না। প্রধানমন্ত্রী ভয় পেয়েই এই মন্তব্য করেছেন বলেও দাবি করেছিলেন তাঁরা। সোমবার পড়ুয়ারা জানান, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মিছিল করার অনুমতি দিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিক ভাবে সুলেখা মোড় পর্যন্ত মিছিল করার কথা ভাবা হলেও নির্বাচনী আবহে তা ক্যাম্পাসের ভিতরেই সীমায়িত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ দিনের প্রতিবাদ মিছিলে অবশ্য কেন্দ্র ও রাজ্য— দুই শাসকের বিরুদ্ধেই সুর চড়িয়েছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা। সোমবার সন্ধ্যায় ৪ নম্বর গেট থেকে বেরিয়ে ২ নম্বর গেট পর্যন্ত যায় পড়ুয়াদের মিছিল। রাস্তায় খানিক্ষণ অবস্থান বিক্ষোভ করেন পড়ুয়ারা। তার পর ফের ক্যাম্পাসের ভিতরে ঢুকে পড়েন তাঁরা।

হোক কলবর থেকে উপাচার্য ঘেরাও, সমাবর্তনের দিনে রাজ্যপাল তথা আচার্যের কাছ থেকে মেডেল নিতে অস্বীকার করার পাশাপাশি নানা আন্দোলনের সাক্ষী থেকেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। এ বার নজিরবিহীন ভাবে প্রধানমন্ত্রীর নিশানায় চলে আসায় ক্ষুব্ধ বিশ্ববিদ্যালের পড়ুয়া থেকে শিক্ষকেরা। তাই প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে প্রতিবাদের বার্তা পৌঁছে দিতে এই মিছিল বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

যাদবপুরের শিক্ষক সংগঠন জুটা জানিয়েছে, যাবতীয় যোগ্যতা সত্ত্বেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বিবৃতিতে জুটা দাবি করেছে, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম। স্বাধীনতা আন্দোলনের উত্তরাধিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য। আশ্চর্যজনকভাবে ‘ইনস্টিটিউট অফ এমিন্যান্স’-এর যাবতীয় শর্ত পূরণ করে যোগ্যতা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়কে বঞ্চিত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় উচ্চতর শিক্ষা অভিযানের টাকাও পাওয়া যায়নি। ইউজিসি তুলে দিয়ে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বরাদ্দও বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগও তুলেছে সংগঠন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement