গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
পাঁচ বছর আগে হলদি নদীর তীরে শুভেন্দু অধিকারীর জমিতে লড়তে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাঁচ বছর পর আদিগঙ্গার তীরে মমতার জমিতে লড়তে এসেছেন শুভেন্দু। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ‘নন্দীগ্রাম’ হয়ে উঠেছে ভবানীপুর। ফের এক বার মমতা-শুভেন্দু দ্বৈরথ। বুধবার ভোটগ্রহণ সেই ভবানীপুরে। যে ভোটের দিকে তাকিয়ে শুধু পশ্চিমবাংলা নয় গোটা ভারত।
ভবানীপুরে যে বিদায়ী বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু নিজেই প্রার্থী হতে পারেন, সে গুঞ্জন বিজেপির প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হওয়ার বেশ কিছু দিন আগে থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। দল ভবানীপুরে তাঁকে লড়তে বললে তিনি লড়বেন, এমন মন্তব্যও শুভেন্দুর মুখে শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু এমন ‘মহাযুদ্ধে’র ছবি শেষ পর্যন্ত তৈরি হবে না বলে অনেকেই মনে করছিলেন। শুভেন্দু এক বার নন্দীগ্রামে মমতাকে হারিয়ে দিয়ে যে ‘শিরোপা’ মাথায় পরে নিয়েছেন, মমতার নিজের পাড়ায় লড়তে এসে তা ‘খোয়ানো’র ঝুঁকি তিনি নেবেন না বলেই তাঁরা মনে করছিলেন।
আবার উল্টো ভাষ্যও ছিল। ভবানীপুরে মমতার বিরুদ্ধে লড়তে এসে শুভেন্দু যদি হেরে যান, তা হলেও তিনি পিছিয়ে পড়বেন না। বড় জোর ‘ম্যাচ ড্র’ বলে ধরে নেওয়া হবে। কিন্তু সেই সুযোগে শুভেন্দু দলের অন্দরে নিজেকে মমতা-বিরোধিতার ‘প্রধান মুখ’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলবেন। কারণ, নিজের হাতে জেতা আসন থাকা সত্ত্বেও দলের নির্দেশে ভবানীপুরে এসে মমতার বিরুদ্ধে আবার নির্দ্বিধায় প্রার্থী হতে রাজি হওয়া কোনও ছোট বিষয় নয়। উপরন্তু, বিজেপি-ও যে মমতার বিরুদ্ধে প্রার্থী হিসাবে শুভেন্দুর চেয়ে উপযুক্ত হিসাবে কাউকে খুঁজে পেল না, সে বার্তাও স্পষ্ট হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত শুভেন্দুকেই মমতার বিরুদ্ধে প্রার্থী করেছেন নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহেরা।
প্রচার যত এগিয়েছে, ভবানীপুরে তত রাজনৈতিক উত্তাপও বেড়েছে। কখনও মমতার ব্যানার ছেঁড়ার অভিযোগ উঠেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। আবার পাল্টা শুভেন্দুর ব্যানার ছেঁড়ার অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের ‘ফ্যাম কমিউনিটি’র বিরুদ্ধে। তা নিয়ে উত্তেজনা ছড়ায়। ভবানীপুর থানার সামনে বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে তৃণমূলের ‘ফ্যাম’ কর্মীদের ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যায়। কখনও শুভেন্দু প্রচারে বেরিয়ে শিখ সমাজের একাংশের প্রতিবাদের মুখে পড়েন। কখনও আবার বিজেপির বিরুদ্ধে অসৌজন্যমূলক ভাবে মাইক চালিয়ে তৃণমূলের সভায় বিঘ্ন ঘটানোর অভিযোগ তুলে মমতা নিজের মঞ্চ ছেড়ে চলে যান।
দলের সর্বময় নেত্রী মমতার জন্য তৃণমূলের প্রস্তুতিও চরমে। তৃণমূল সূত্রে খবর, মুখ্যমন্ত্রী কালীঘাটের বাড়ি থেকেই সব কিছুর উপর নজর রাখছেন। মঙ্গলবার সারা দিন ভোট সংক্রান্ত প্রস্তুতির খবর শীর্ষ নেতাদের মারফত নিয়েছেন তিনি। বুধবার সারা দিনের ভোট পর্যবেক্ষণ করে ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে বিকালে ভোট দিতে যাবেন তিনি। শুধু ভবানীপুর নয়, মমতার নজর থাকবে বাকি ১৪১টি আসনেও।
কলকাতা পুরসভার ৭০, ৭১, ৭২, ৭৩ নম্বর ওয়ার্ডে মমতার হয়ে ভোট পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী। প্রিয়নাথ মল্লিক রোডের অফিসে বসে ভোট প্রক্রিয়ায় সাংগঠনিক নজরদারি করবেন তিনি। ৭৪, ৭৭ ও ৮২ নম্বর ওয়ার্ডে মমতার হয়ে ভোট দেখবেন ফিরহাদ হাকিম। যদিও, তিনি কলকাতা বন্দরের প্রার্থী। নিজের কেন্দ্রে ব্যস্ত থাকলেও, তাঁ চেতলার দফতরের কর্মীদের এ বিষয়ে নজরদারি করার নির্দেশ দিয়েছেন ববি। একই ভাবে কসবার প্রার্থী জাভেদ খানকে ৬৩ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনিও কসবা এলাকা থেকেই নজরদারি করবেন। তবে আটটি ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলরদের নিজ নিজ ওয়ার্ডে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প অফিস করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে কর্মীরা ভোট পরিচালনা সংক্রান্ত নির্দেশ গ্রহণ করবেন, সঙ্গে ভোটের প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিতে পারবেন। মঙ্গলবার সকালে সেই মর্মে ভবানীপুরের সব তৃণমূল কর্মীদের বার্তা পাঠানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রচারের শেষ দিন পর্যন্ত টানটান লড়াই দেখেছে দু’দলই। তবে সোমবার প্রচার থেমে যাওয়ার পরেও শুভেন্দু থেমে থাকেননি। আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও প্রচার তিনি করেননি। কিন্তু মঙ্গলবারও গোটা ভবানীপুর চষে বেড়িয়েছেন শুভেন্দু। প্রথমে গিয়েছেন চক্রবেড়িয়ায় নিজের নির্বাচনী কার্যালয়ে। তার পরে যান এলগিন রোডের গুরুদ্বারে। সন্ধ্যায় শুভেন্দু কালীঘাট মন্দিরে যান পুজো দিতে। তার পরে যান বিবাদীবাগ এলাকায় জৈন মন্দিরে। রাস্তায় নেমে বাদামচাট খেয়েছেন, সহকর্মীদের খাইয়েছেন। আবার অভিযোগ করেছেন, তৃণমূল ভোট চুরির চেষ্টা করছে। অনেকে মনে করছেন, প্রচার শেষের পরে তথা ভোটগ্রহণের আগের সন্ধ্যায়ও শুভেন্দু হিন্দু, শিখ ও জৈন সমাজকে প্রকারান্তরে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কারণ, ভবানীপুর আসনে যে বড় সংখ্যক অবাঙালি ভোট রয়েছে, তাঁদের মধ্যে শিখ এবং জৈন সমাজের অংশীদারি উল্লেখযোগ্য।
তবে ভোটের আগের দিনও দুই শিবিরে অঙ্ক কষা জারি রয়েছে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন থেকে ভবানীপুর বিধানসভার বড় অংশের ভোটার বিজেপিমুখী। সেই ভোটে ভবানীপুর কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী তথাগত রায় তৃণমূলের সুব্রত বক্সীকে ১৭৬ ভোটে পিছনে ফেলে দিয়েছিলেন। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী চন্দ্রকুমার বসু তৃতীয় স্থানে শেষ করলেও ২৬ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছিলেন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে আবার ভবানীপুর বিধানসভার অন্তর্গত আটটি ওয়ার্ডের মধ্যে ছ’টিতে এগিয়েছিল বিজেপি। এমনকি, মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির ওয়ার্ড ৭৩ নম্বরেও পিছিয়ে গিয়েছিল তৃণমূল।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অবশ্য হারানো জমি অনেকটাই উদ্ধার করে তৃণমূল। বিধানসভা ভোটে তৃণমূল প্রার্থী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় ২৮ হাজার ভোটে জয়ের সঙ্গে পাঁচটি ওয়ার্ডে তৃণমূলকে এগিয়ে দিয়েছিলেন। আর উপনির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রী সব ক’টি ওয়ার্ডেই জয়ী হয়েছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর জয়ের ব্যবধান ছিল ৫৮ হাজার ৮৩৬। যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল বিজেপি । সে বার সব ক’টি ওয়ার্ডে পিছিয়ে ছিল বিজেপি। আর ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে আবার বিজেপি হারানো জমি অনেকটাই উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল। আটটি ওয়ার্ডের মধ্যে পাঁচটিতে জিতেছিল তারা । যদিও ভবানীপুর বিধানসভায় সাড়ে ৮ হাজার ভোটে এগিয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী মালা রায়।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয়, ভবানীপুর বিধানসভার অন্তর্গত ৭৭ নম্বর ওয়ার্ড বরাবরই তৃণমূলকে নিরাপদ ব্যবধানে এগিয়ে দিয়েছে। এই ওয়ার্ডের বিরাট অংশের সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলের ‘ভরসা’। মূলত এই ওয়ার্ড এ বারের ভোটে মমতাকে বড় ব্যবধানে এগিয়ে দেবে বলেই মনে করছেন ভবানীপুরের তৃণমূল নেতারা। প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের উপনির্বাচনে ৭৭ নম্বর ওয়ার্ড থেকে মমতা ২১ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধান পেয়েছিলেন। তবে এসআইআরের কারণে ভবানীপুরে ৫০ হাজার নাম বাদ পড়েছে। ৭৭ নম্বর ওয়ার্ড থেকেও বড় অংশের সংখ্যালঘু ভোট বাদ পড়েছে। সেই বিষয়টিও কিছুটা হলেও চিন্তায় রেখেছে শাসক শিবিরকে।
প্রার্থী তালিকা ঘোষিত হওয়ার আগে থেকেই শুভেন্দু নিজের মতো করে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিলেন ভবানীপুরের জন্য। কখনও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে, কখনও সামাজিক কর্মসূচিতে তিনি মাঝেমধ্যেই ভবানীপুরে হাজির হচ্ছিলেন। জনসংযোগ করছিলেন। কখনও দলের স্থানীয় মণ্ডল কমিটিগুলির পদাধিকারীদের নিয়ে বৈঠক করছিলেন। কখনও দলের স্থানীয় কোনও দফতরে হাজির হচ্ছিলেন। জল্পনা তীব্র হয়ে ওঠে ফেব্রুয়ারির শেষে। কারণ, জাতীয় গ্রন্থাগারের প্রেক্ষাগৃহে শুভেন্দু বৈঠক করেন ভবানীপুর বিধানসভার বুথস্তরীয় বিজেপি কর্মীদের নিয়ে। শুভেন্দু ভবানীপুর আসনে নিজের মতো করে ঘুঁটি সাজানো শুরু করছেন, তা সেই কর্মসূচিতেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
ভবানীপুরের লড়াই কতটা ‘ধুন্ধুমার’ হতে চলেছে, তা বোঝা গিয়েছিল শুভেন্দুর মনোনয়ন জমার দিনেই। শুভেন্দুর হয়ে সে দিন প্রথমে হাজরা মোড়ে সভা করেছিলেন অমিত শাহ। তার পরে রোড শোয়ে সওয়ার হয়ে রওনা দিয়েছিলেন আলিপুর সার্ভে বিল্ডিংয়ের দিকে। নরেন্দ্র মোদী ছাড়া আর কারও মনোনয়ন পর্বে শাহকে সাধারণত উপস্থিত থাকতে দেখা যায় না। এ হেন শাহ শুভেন্দুর মনোনয়নে হাজির থেকে বুঝিয়ে দেন, ভবানীপুরের লড়াইকে বিজেপি কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে। যদিও মোদী ভবানীপুর বা দক্ষিণ কলকাতায় কোনও নির্বাচন কর্মসূচি করেননি।