সুপ্রিম কোর্ট। — ফাইল চিত্র।
ইডির আইনজীবী এসভি রাজু বলেন, ‘‘অবশ্যই অধিকার আছে। এফআইআর দায়ের করার অধিকার। এবং তিনি সেটি করেছেনও। কেউ তাকে বাধা দেয়নি। কিন্তু আমি যা বলছি তা হল—এফআইআর দায়ের করার অধিকার শুধু এফআইআর করা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, বরং সেই এফআইআর এমন জায়গায় দায়ের করার অধিকারও রয়েছে—যেখানে তদন্তটি ন্যায্য ও নিরপেক্ষ হবে।’’
‘‘একজনের এফআইআর করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই এফআইআরের তদন্ত তাঁর অধীনে থাকা অফিসারদের দ্বারা করানোর অধিকার নেই।’’
বিচারপতি মিশ্র বলেন, ‘‘আবেদনকারীরা কাকতালীয় ভাবে ইডির অফিসার, তাঁরা তাঁদের ব্যক্তিগত অধিকার দাবি করছেন। তা হলে কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত অধিকার নেই?”
মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে এফআইআর করা হয়েছে, ইডির এই সওয়াল শুনে বিচারপতি মিশ্রের মন্তব্য, ‘‘আমি অনেক কিছু বলতে চাই, কিন্তু সব কিছুই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে যায়। আমি বারবার একই কথা বলছি।’’
ইডি সুপ্রিম কোর্টে বলে, ‘‘আদালত যদি মনে করে যে মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে এবং দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, তবে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ অনুয়ায়ী ক্ষমতা প্রয়োগ করতে কোনও বাধা থাকতে পারে না। কারণ, অনুচ্ছেদ ৩২ নিজেই একটি মৌলিক অধিকার।’’
ইডির বক্তব্য, ‘‘এটা একেবারে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি। এটা কোনও আলাদা ঘটনা নয়, বরং একাধিক ঘটনার একটি ধারাবাহিকতা। আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা রয়েছে। তার অধীনে, আপনারা একটি পোস্টকার্ড পেলেও তার ভিত্তিতেই পদক্ষেপ নিতে পারেন।’’
ইডির আইনজীবী বলেন, ‘‘ইডি অফিসারেরা ভিক্টিম কারণ, আমরা যে নথি সংগ্রহ করেছিলাম, সেগুলি তাঁদের কাছ থেকে নিয়ে নেওয়া হয়েছে।’’
বিচারপতি মিশ্র বলেন, ‘‘ইডি অফিসারেরা তো সরাসরি ভিক্টিম নন। তাঁরা হয়তো কারও প্রতিনিধিত্ব করছেন।’’
ইডি বলে, ‘‘আইনের শাসনে যখনই রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, তখন আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারে।’’
ইডি বলে, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী মনে করেছিলেন কিছু রাজনৈতিক নথি নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তিনি আলাদা করে দেখেননি—কোনটা রাজনৈতিক আর কোনটা অপরাধ তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি সব কিছুই নিয়ে নিয়েছেন।’’
‘‘মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূলের প্রধান হিসাবে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই ইডির বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে। অর্থাৎ, মুখ্যমন্ত্রীই ইডি অফিসারদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছেন।’’
বিচারপতি এনভি অঞ্জরিয়া বলেন, ‘‘আপনি কি সত্যিই বলছেন যে, পশ্চিমবঙ্গের আইনের শাসনের একেবারে ভেঙে পড়েছে? কারণ, সেটা খুব বড় প্রশ্ন।’’
‘‘এই পুরো বিষয়টি বিবেচনা করে একমাত্র সাংবিধানিক আদালতই সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিতে পারে। তাই এই আদালতে মামলা করা।’’
ইডির আইনজীবী তুষার বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে যে আইনের শাসন নেই তার সাম্প্রতিক উদাহরণ হল, বিচারকদের ঘেরাও করে রাখা হয়েছে।’’
‘‘আদালতের কাছে আবেদন, সিবিআইকে তদন্তভার দেওয়া হোক। তদন্ত করা হোক মুখ্যমন্ত্রী, ডিজিপি এবং পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে। প্রয়োজনে আদালতের নজরদারিতে তদন্ত হোক।’’
‘‘ডিজি নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি গিয়েছিলেন কারণ, মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা জড়িত ছিল। অর্থাৎ, মুখ্যমন্ত্রী যেখানে যান, ডিজিও সেখানে যান!’’
বিচারপতি মিশ্র বলেন, ‘‘এই যুক্তি ধরলে প্রতিটি সরকারি সংস্থাই বলবে যে, সে আইনের শাসন সুনিশ্চিত করছে। এবং সবাই তো সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ ধারা অনুযায়ী পিটিশন দায়ের করে বলবে, আমরা ভারতের নাগরিকদের স্বার্থে এখানে এসেছি।’’
‘‘এখানে মৌলিক অধিকার জনগণের। স্বাধীন সংস্থা হিসাবে ইডির বিষয় নয়। কারণ, যে সম্পদ উদ্ধার হবে শেষ পর্যন্ত তা দেশের নাগরিকদের কল্যাণেই ব্যবহার হবে।’’
‘‘মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে সহযোগিতা করার বদলে তদন্তে বাধা সৃষ্টি করেছেন। কোনও ঘটনায় সক্রিয় ভাবে রাজ্যের প্রশাসনকে ব্যবহার করা হলে সাংবিধানিক আদালতের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন।’’
ইডি বলে, ‘‘টাকা নয়ছয় এবং জনগণের সম্পত্তি নিয়ে দুর্নীতি যাঁরা করেছেন, তাঁদের শাস্তি দেওয়ার জন্য মৌলিক অধিকার ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সংবিধানের ১৪ এবং ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই তদন্ত হওয়া উচিত।’’
‘‘এখানে কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসাবে এই মামলা দায়ের করেছে। রাষ্ট্র হিসাবে একটি ইতিবাচক দায়িত্ব পালন এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত করতে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে বৃহৎ আকারের অর্থনৈতিক অপরাধ জড়িত এবং পশ্চিমবঙ্গের সরকারি আধিকারিকদের সাহায্যে তা ঘটেছে।’’
ইডি দাবি করে বলে, ‘‘পুলিশ সিসি ক্যামেরাগুলি সরিয়ে দিয়েছে, যেখানে মুখ্যমন্ত্রীর কথা এবং বেআইনি কার্যকলাপ রেকর্ড হয়েছিল।’’
ইডি বলে, ‘‘এই মামলায় যখন মুখ্যমন্ত্রী হঠাৎ করে ঢুকে পড়লেন, তখন ডিজিপি এবং পুলিশ কমিশনার সেখানে কী করছিলেন? ওরা বলছে, মুখ্যমন্ত্রীর জেড ক্যাটাগরি নিরাপত্তা রয়েছে। তাই নিরাপত্তা দিতে সেখানে গিয়েছিলেন। তা হলে তো বিষয়টি দাঁড়াল রাজ্যের ডিজিপি একজন ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী হিসাবে কাজ করেছেন।’’
ইডির বক্তব্য, ‘‘ওই পুলিশ কমিশনারকে রাজ্যসভার সাংসদ করা হয়েছে (রাজীব কুমার)। এই ঘটনাগুলি একজন নাগরিক হিসাবে অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং লজ্জাজনক। এমনকি, আইনমন্ত্রী লোকজন নিয়ে আদালতে গিয়ে চাপ তৈরি করেন।’’
ইডি আদালতে বলে, ‘‘সেই দিন কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনারকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেওয়া হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলিতেও তল্লাশি চালাতে দেওয়া হয়নি।’’
‘‘আবার আরেকটি ঘটনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশ বাহিনী ও লোকজন নিয়ে সিবিআইয়ের দফতরে প্রবেশ করেন। সেই সময়ও বাইরে ভিড়ের মধ্যে থেকে পাথর ছোড়া হয়েছিল।’’
‘‘তখন সিবিআইয়ের জয়েন্ট ডিরেক্টরের বাড়িতেও জমায়েত করা হয়। ওই জমায়েত থেকে ওই অফিসারের দরজা-জানালায় জোরে আঘাত করা হয়। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয় যে ওই অফিসারকে নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার জন্য বার বার ফোন করে সাহায্য চাইতে হয়। পরে কেন্দ্রীয় বাহিনী গিয়ে উদ্ধার করে।’’