সুপ্রিম কোর্ট। — ফাইল চিত্র।
বিচারপতি এনভি অঞ্জরিয়া বলেন, ‘‘আপনি কি সত্যিই বলছেন যে, পশ্চিমবঙ্গের আইনের শাসনের একেবারে ভেঙে পড়েছে? কারণ, সেটা খুব বড় প্রশ্ন।’’
‘‘মুখ্যমন্ত্রী মনে করেছিলেন কিছু রাজনৈতিক নথি নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তিনি আলাদা করে দেখেননি—কোনটা রাজনৈতিক আর কোনটা অপরাধ তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি সব কিছুই নিয়ে নিয়েছেন।’’
‘‘মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূলের প্রধান হিসাবে একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই ইডির বিরুদ্ধে এফআইআর হয়েছে। অর্থাৎ, মুখ্যমন্ত্রীই ইডি অফিসারদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছেন।’’
‘‘এই পুরো বিষয়টি বিবেচনা করে একমাত্র সাংবিধানিক আদালতই সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিতে পারে। তাই এই আদালতে মামলা করা।’’
ইডির আইনজীবী তুষার বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে যে আইনের শাসন নেই তার সাম্প্রতিক উদাহরণ হল, বিচারকদের ঘেরাও করে রাখা হয়েছে।’’
‘‘আদালতের কাছে আবেদন, সিবিআইকে তদন্তভার দেওয়া হোক। তদন্ত করা হোক মুখ্যমন্ত্রী, ডিজিপি এবং পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে। প্রয়োজনে আদালতের নজরদারিতে তদন্ত হোক।’’
‘‘ডিজি নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি গিয়েছিলেন কারণ, মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তা জড়িত ছিল। অর্থাৎ, মুখ্যমন্ত্রী যেখানে যান, ডিজিও সেখানে যান!’’
বিচারপতি মিশ্র বলেন, ‘‘এই যুক্তি ধরলে প্রতিটি সরকারি সংস্থাই বলবে যে, সে আইনের শাসন সুনিশ্চিত করছে। এবং সবাই তো সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ ধারা অনুযায়ী পিটিশন দায়ের করে বলবে, আমরা ভারতের নাগরিকদের স্বার্থে এখানে এসেছি।’’
‘‘এখানে মৌলিক অধিকার জনগণের। স্বাধীন সংস্থা হিসাবে ইডির বিষয় নয়। কারণ, যে সম্পদ উদ্ধার হবে শেষ পর্যন্ত তা দেশের নাগরিকদের কল্যাণেই ব্যবহার হবে।’’
‘‘মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে সহযোগিতা করার বদলে তদন্তে বাধা সৃষ্টি করেছেন। কোনও ঘটনায় সক্রিয় ভাবে রাজ্যের প্রশাসনকে ব্যবহার করা হলে সাংবিধানিক আদালতের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন।’’
ইডি বলে, ‘‘টাকা নয়ছয় এবং জনগণের সম্পত্তি নিয়ে দুর্নীতি যাঁরা করেছেন, তাঁদের শাস্তি দেওয়ার জন্য মৌলিক অধিকার ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সংবিধানের ১৪ এবং ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই তদন্ত হওয়া উচিত।’’
‘‘এখানে কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসাবে এই মামলা দায়ের করেছে। রাষ্ট্র হিসাবে একটি ইতিবাচক দায়িত্ব পালন এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত করতে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে বৃহৎ আকারের অর্থনৈতিক অপরাধ জড়িত এবং পশ্চিমবঙ্গের সরকারি আধিকারিকদের সাহায্যে তা ঘটেছে।’’
ইডি দাবি করে বলে, ‘‘পুলিশ সিসি ক্যামেরাগুলি সরিয়ে দিয়েছে, যেখানে মুখ্যমন্ত্রীর কথা এবং বেআইনি কার্যকলাপ রেকর্ড হয়েছিল।’’
ইডি বলে, ‘‘এই মামলায় যখন মুখ্যমন্ত্রী হঠাৎ করে ঢুকে পড়লেন, তখন ডিজিপি এবং পুলিশ কমিশনার সেখানে কী করছিলেন? ওরা বলছে, মুখ্যমন্ত্রীর জেড ক্যাটাগরি নিরাপত্তা রয়েছে। তাই নিরাপত্তা দিতে সেখানে গিয়েছিলেন। তা হলে তো বিষয়টি দাঁড়াল রাজ্যের ডিজিপি একজন ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী হিসাবে কাজ করেছেন।’’
ইডির বক্তব্য, ‘‘ওই পুলিশ কমিশনারকে রাজ্যসভার সাংসদ করা হয়েছে (রাজীব কুমার)। এই ঘটনাগুলি একজন নাগরিক হিসাবে অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং লজ্জাজনক। এমনকি, আইনমন্ত্রী লোকজন নিয়ে আদালতে গিয়ে চাপ তৈরি করেন।’’
ইডি আদালতে বলে, ‘‘সেই দিন কলকাতার তৎকালীন পুলিশ কমিশনারকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে দেওয়া হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলিতেও তল্লাশি চালাতে দেওয়া হয়নি।’’
‘‘আবার আরেকটি ঘটনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশ বাহিনী ও লোকজন নিয়ে সিবিআইয়ের দফতরে প্রবেশ করেন। সেই সময়ও বাইরে ভিড়ের মধ্যে থেকে পাথর ছোড়া হয়েছিল।’’
‘‘তখন সিবিআইয়ের জয়েন্ট ডিরেক্টরের বাড়িতেও জমায়েত করা হয়। ওই জমায়েত থেকে ওই অফিসারের দরজা-জানালায় জোরে আঘাত করা হয়। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয় যে ওই অফিসারকে নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার জন্য বার বার ফোন করে সাহায্য চাইতে হয়। পরে কেন্দ্রীয় বাহিনী গিয়ে উদ্ধার করে।’’
ইডির বক্তব্য, ‘‘এর আগে অন্য একটি মামলায় সিবিআই আদালতের নির্দেশে তদন্ত করছিল। সিবিআই পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। সেই সময়ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিপুল পুলিশ বাহিনী নিয়ে পুলিশ কমিশনারের বাড়ির মূল গেটের সামনে বসে পড়েন। এর পরে সিবিআই অফিসারদের স্থানীয় পুলিশ গ্রেফতার করে। তাঁদের নিকটবর্তী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এবং তাদের ভয় দেখানো হয়।’’
ইডি বলে, ‘‘এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় যে, আমরা তাড়াহুড়ো করে আদালতের কাছে চলে এসেছি। এটাকে আলাদা একটি ঘটনা হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। পশ্চিমবঙ্গ এই দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসাবে পরিচিত। সেখানে বাস্তব পরিস্থিতি কী? সেখানে আইনের শাসন ভেঙে পড়েছে।’’
ইডির আইনজীবী বলেন, ‘‘ইডির তল্লাশি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ এবং আইনসম্মত ভাবে চলছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পশ্চিমবঙ্গের ডিজিপি, পুলিশ কমিশনার-সহ প্রায় ১০০ জন পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে প্রবেশ করেন।’’
‘‘প্রতীক জৈনের বাড়িতে, যেখানে তল্লাশি চলছিল, সেখানে বেআইনি ভাবে প্রবেশ করেন। ইডি যে নথিপত্র নিজেদের হেফাজতে নিয়েছিল, সেগুলি জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়।’’
সুপ্রিম কোর্টে ইডি বলে, ‘‘পুলিশ অফিসারেরা ইডির কাছ থেকে নথিপত্র নিয়ে যান। কম্পিউটার সিস্টেমের ব্যাকআপ নেওয়া হচ্ছিল, তা মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়া হয়। সিসিটিভি ক্যামেরার স্টোরেজ ডিভাইসও নিয়ে নেওয়া হয়। আইপ্যাকের কর্মীদের মোবাইল ফোনও নিয়ে নেওয়া হয়।’’
ইডির আইনজীবী তুষার বলেন, ‘‘ইডির তল্লাশির সময় পুলিশ সেখানে যায় এবং জানায়, যদি তল্লাশি চালাতে হয়, তবে স্থানীয় পুলিশকে জানাতে হবে।’’
‘‘ওই সময় বেশ কিছু ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করা হয়। যেগুলি আর্থিক পাচার মামলার তদন্তে প্রাসঙ্গিক বলে মনে করা হচ্ছে।’’
‘‘পরে পুলিশ অফিসার প্রিয়ব্রত রায় ঘটনাস্থলে গিয়ে জানান, বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ নিয়ে অভিযোগ দায়ের হয়েছে।’’
‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুপুর ১২টা ৪০ মিনিট নাগাদ শতাধিক পুলিশ অফিসার নিয়ে ঘটনাস্থলে প্রবেশ করেন।’’
তুষার বলেন, ‘‘এটি বেআইনি কয়লা পাচার। এই দুর্নীতির পরিমাণ প্রায় ২৭০০ কোটি টাকা।’’
‘‘ ইডির অফিসারেরাও ভারতীয় নাগরিক। তাঁরাও দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মৌলিক অধিকারের সুরক্ষা চাইছেন।’’
‘‘যা ঘটনা ঘটেছে বিআর অম্বেডকর কখনও এমন পরিস্থিতি কল্পনা করেননি।’’
সওয়াল শুরু করেছেন কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল তথা ইডির আইনজীবী তুষার মেহতা। তিনি বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। এই মামলায় দেখাব কী ভাবে আইনের শাসন লঙ্ঘিত হয়েছে।’’
বিচারপতি মিশ্র বলেন, ‘‘আদালতের ভিতরের কথা আর বাইরের কথার কেন তুলনা করছেন? আমরা সব পক্ষের যুক্তি শুনতে চেষ্টা করি। মিডিয়াকে আমরা থামাতে পারি না। আমরা কিছু বললেই সেটা মিডিয়ায় তুলে ধরা হয়। তারপর দুই পক্ষই সেটাকে ব্যবহার করে। অনেক সময় আমাদেরও ভাবতে হয়, আমরা আদৌ কিছু বলব কি না।’’