ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ছবি: সংগৃহীত।
ব্রিগেডে দীর্ঘ বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেন, এ বার পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদল কেউ রুখতে পারবে না। তাঁর কথায়, ‘‘কেউ কেউ ভয় দেখানোর চেষ্টা করবেন, কেউ কেউ বলবেন বদল সম্ভব নয়। কিন্তু মনে রাখুন মানুষ যখন ঠিক করে নেন, তখন ঠেকানোর কেউ থাকে না। বাংলার মানুষ যখনই ঠিক করে নেন, তখন ইতিহাস বদলে যায়। আজ ব্রিগেড দেখে সেই আত্মবিশ্বাস পাচ্ছি।’’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘এ বারের ভোট সরকার বদলের নয়, বাংলার আত্মাকে বাঁচানোর। ব্যবস্থা বদলের নির্বাচন, কাটমানি থেকে, ভয় থেকে মুক্তির নির্বাচন। আগত পরিবর্তনের জন্য সকলকে আগাম শুভেচ্ছা। পশ্চিমবঙ্গের জনগণের জয় হোক।’’
‘‘ওঁরা শুধু রাষ্ট্রপতিকে অপমান করেননি। ওঁরা আদিবাসীদের অপমান করেছেন। কোটি কোটি মহিলাকে অপমান করেছেন। দেশের সর্বোচ্চ পদের গরিমাকে খাটো করেছেন। ওঁরা সংবিধানের অপমান করেছেন। বাবাসাহেব অম্বেডকরকে অপমান করেছেন। এর সাজা নির্মম সরকার পাবে। সাংবিধানিক ব্যবস্থার উপর প্রতি দিন হামলা করার রাস্তা খোঁজেন ওঁরা। সুষ্ঠু নির্বাচনী প্রক্রিয়ার কথা বললেই হামলা হয়। যে সংস্থা স্বতন্ত্র এবং নিরপেক্ষ ভাবে ভোট করায়, তাদের বিশ্বস্ততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। একই কথা বলা হয় দেশের সেনা নিয়ে। বালাকোটের সময়ও বায়ুসেনার কাছে প্রমাণ চেয়েছিলেন ওঁরা।’’
‘‘বাংলাকে অসুরক্ষিত করেছে সরকার। এখানে খোলাখুলি ধমক দেওয়া হচ্ছে যে একটি বিশেষ সম্প্রদায় আপনাদের খতম করে দেবে। সাংবিধানের কুর্সিতে বসে এমন কথা আপনার মুখে শোভা পায় না। ধমকানোই তৃণমূলের রাজনীতি। বাংলায় ভয়ের মহল বানিয়ে রাখা হচ্ছে, দুনিয়ার তা দেখা প্রয়োজন। এরা বলে তৃণমূলকে যে ভোট দেয় না, সেই বাঙালি-ই নয়! আমি তৃণমূলকে মনে করাচ্ছি, ওদের গুন্ডামির দিন এ বার শেষ হওয়ার মুখে। তৃণমূল সরকারের যাওয়ার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। বিজেপি সরকার তৈরি হওয়ার পরে সকলের উন্নয়ন হবে এক দিকে, অন্য দিকে সব কিছুর হিসাব হবে। তৃণমূলের গুন্ডারা, যারা আপনাদের ভয় দেখায়, তাদের খারাপ দিন আসছে। আইনের শাসন হবে। অপরাধীদের একটাই জায়গা জেল... জেল।’’
‘‘বামেদের হটিয়ে অনেক আশায় তৃণমূলকে এনেছিলেন এখানকার মানুষ। কিন্তু গুন্ডা, মাফিয়াদের নিদেরে দলে টেনে নিয়েছে। অপরাধীদের ছেড়ে রেখেছে ওরা। কলেজেও দুষ্কর্ম হচ্ছে। তৃণমূল কার্যালয়েও যৌন হেনস্থার ঘটনা ঘটছে। কোনও না কোনও অপরাধে যুক্ত থাকেন তৃণমূলের কেউ না কেউ। অপরাধীদের বাঁচানোর পূর্ণ চেষ্টা করা হয় এখানে। সন্দেশখালির সেই ছবি, আরজি কর কাণ্ড মানুষ ভোলেনি। তৃণমূল কী ভাবে প্রকাশ্যে অপরাধীদের সঙ্গে থাকে, সকলেই দেখেছে। মেয়েদের বলতে হয়, বাড়ি ফিরে এসো সন্ধ্যা নামার আগে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই পরিস্থিতি বদলে যাবে। এটাই মোদীর গ্যারান্টি। এ বার তৃণমূলকে কেউ বাঁচাতে পারবে না।’’ নতুন বাংলা গড়ার ডাক দিয়ে মোদী তৃণমূলের মা-মাটি-মানুষ স্লোগানকে কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘বাংলার মা নিঃস্ব, মাটি লুণ্ঠিত, মানুষ চলে যাচ্ছে!’’
‘‘বাংলার হাল আর লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। কয়েক দিন আগে চন্দ্রকোনায় এক আলুচাষি আত্মহত্যা করেছেন। তৃণমূলের কাটমানি, দুর্নীতি এবং খারাপ রাজনীতির জন্য কৃষক, নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তের জীবন দুর্বিষহ। মা-বোনেদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তৃণমূলের সরকার গেলেই গরিবদের পাকা বাড়ি বানানো শুরু হবে। প্রত্যেক বাড়িতে পরিশুদ্ধ জল যাবে।’’
দুর্নীতি ইস্যুতে তৃণমূলকে নিশানা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর। তিনি অভিযোগ করেন, চা-বাগানের শ্রমিকদেরও কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা দিতে দেয় না তৃণমূল। পাকা বাড়ি সর্বত্র পাচ্ছেন মানুষ। কিন্তু এখানে প্রকল্পের নাম বদলে দেওয়া হয়েছে। তার পরেও যাঁদের বাড়ি পাওয়ার কথা ছিল, তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। জলজীবন মিশন থেকে আয়ুষ্মান ভারত, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্প থেকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তৃণমূলের জন্য বঞ্চিত বলে অভিযোগ মোদীর।
‘‘এখানকার নির্মম সরকার যুবক-যুবতীদের পালিয়ে যাওয়ার অভিশাপ দিয়েছে। বাংলার যুবসমাজ মেহনতি। একসময় এই বাংলা সকলের আগে ছিল। আজ এখানকার যুবক-যুবতী না এখান থেকে ডিগ্রি পাচ্ছেন, না চাকরি। তাঁদের ভিন্রাজ্যে চলে যেতে হচ্ছে। প্রথমে কংগ্রেস, তার পর বাম এবং তৃণমূল... এরা একে একে এসেছে। নিজেদের পকেট ভরেছে। উন্নয়নের কাজ পড়ে থেকেছে। তৃণমূল সরকার প্রকাশ্যে চাকরি বিক্রি করেছে। এ বার সময় এসেছে এই হাল বদলের। বাংলায় যুবক-যুবতীরা এ বার বাংলায় কাজ পাবেন। এই স্বপ্নপূরণের গ্যারান্টি মোদীর। তৃণমূল না নিজে কাজ করে, না অন্যদের কাজ করতে দেয়। কাটমানি না পেলে কোনও প্রকল্পকে গ্রামেগঞ্জে পৌঁছোতে দেয় না। তাই কেন্দ্রীয় প্রকল্পকে পৌঁছোতে দেয় না।’’
মোদী বলেন, ‘‘বাংলার নবনির্মাণ করবে বিজেপি। বাংলায় এখন আমাদের সরকার নেই। তা-ও কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে বাংলার উন্নয়নে রয়েছি আমরা। আজও ১৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের উদ্বোধন হল।’’
‘‘এ বার বাংলায় জঙ্গলরাজ খতম হবে। বাংলার প্রত্যেক কোণ থেকে আওয়াজ উঠছে, ‘চাই বিজেপি সরকার’। কাল তৃণমূল আপনাদের সবাইকে চোর বলে গালি দিয়েছে। আসল চোর কে তা বাংলার তামাম মানুষ জানেন। কুর্সি বাঁচানোর জন্য এখানকার নির্মম সরকার সব হাতিয়ার বার করে ফেলেছে। আপনাদের আটকাতে গাড়ি থামিয়েছে। সেতু বন্ধ করেছে... কিন্তু নির্মম সরকার দেখে নাও, তোমরা কাউকে দমিয়ে রাখতে পারোনি। কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। সে দিন আর দূরে নেই। এ বার আইনের শাসন শুরু হবে। যে আইন ভাঙবে, তাকে খুঁজে বার করা হবে।’’
‘‘আমার প্রিয় বাংলাবাসী। আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে প্রণাম।’’ বাংলায় ভাষণ শুরু করলেন প্রধানমন্ত্রী। ‘ঐতিহাসিক ব্রিগেড’ থেকে তিনি বলেন, ‘‘যেখানেই চোখ পড়ছে, সেখানেই মানুষ। অদ্ভুত দৃশ্য।’’
‘‘১২০টি দেশকে কোভিডের সময় সাহায্য করেছেন। যিনি স্বপ্ন দেখতে পারেন এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতেন, সেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী এখানে উপস্থিত হয়েছেন।’’ বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক খোঁচা দেন সিপিএমকে। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, ‘‘এমন ভোটার লিস্ট কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানি সে যে আমার বঙ্গভূমি।’’ তৃণমূলকে নিশানা করে বলেন, ‘‘এখানে গণতন্ত্র আক্রান্ত, বিরোধী দলনেতা আক্রান্ত। এমনকি, রাষ্ট্রপতিও বাদ যান না। তৃণমূলের বিদায় নিশ্চিত। তৃণমূল পশ্চিমবঙ্গে আর ক্ষমতায় ফিরছে না। আপনারা শান্তিপূর্ণ ভাবে বাড়ি ফিরতে পারবেন। মনে রাখবেন, মানুষ যাঁর উপর ভরসা রাখেন, সেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এখানে উপস্থিত।’’
‘‘যাঁরা রাষ্ট্রের বিরোধিতা করছে, তাদের কর্ণগোচর হওয়া দরকার। জোরে বলুন, ‘জয় শ্রীরাম’। লক্ষ লক্ষ মানুষ এসেছেন, তাঁদের সকলকে ধন্যবাদ।’’ তিনি স্লোগান দেন, ‘‘বাঁচতে চাই, মা-বোনের সম্মান চাই, চাকরি চাই, চোরমুক্ত বাংলা চাই। তাই প্রধানমন্ত্রী বলে গিয়েছেন দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসাবে ১ নম্বর ছিল বাংলা। বাংলার সেই গৌরব ফেরাবেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি গ্যারান্টার। আমরা তাঁর নেতৃত্বে ডবল ইঞ্জিন সরকার করব।’’
মঞ্চে পৌঁছোলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর এক দিকে শমীক ভট্টাচার্য, অন্য দিকে বসেছেন শুভেন্দু অধিকারী।
সরকারি প্রকল্পের শিলান্যাস এবং উদ্বোধনের পরে ব্রিগেডে আর একটি মঞ্চ থেকে রাজনৈতিক ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
সড়ক এবং রেল যোগাযোগ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, জলপথের সংস্কারও ততটাই প্রয়োজনীয় বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, হলদিয়া ডক কমপ্লেক্সে এ জন্য সংস্কার হচ্ছে। কলকাতা ডকেও সংস্কার হচ্ছে। এর ফলে পূর্ব ভারতের ‘লজিস্টিক সিস্টেম’ আরও উন্নত হবে।
সরকারি অনুষ্ঠানে ভাষণ মোদীর। তিনি শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদার, শমীক ভট্টাচার্যদের শুভেচ্ছা জানিয়ে ভাষণ শুরু করেন। তিনি জানান, রেলকে আধুনিক করার কাজ করছে কেন্দ্র। পশ্চিমবঙ্গ যেন পিছিয়ে না থাকে, সেই প্রয়াস শুরু করেছেন তাঁরা।
প্রধানমন্ত্রী বেশ কয়েকটি জাহাজ চলাচল ও বন্দর-সম্পর্কিত প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছেন। হলদিয়া ডক কমপ্লেক্সে পাঁচ নম্বর বার্থের সংস্কারের উদ্বোধন করেন। যা দ্রুত পরিবেশ-বান্ধব পণ্য পরিবহণের সহায়ক হবে। তিনি খিদিরপুর ডকের সংস্কারের প্রকল্পেরও উদ্বোধন করেন। এ ছাড়াও রেলপ্রকল্প রয়েছে।
সরকারি অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পাশে রয়েছেন নতুন রাজ্যপাল রবীন্দ্র নারায়ণ রবি। মোদীর হাতে গৌর-নিতাইয়ের মূর্তি তুলে দিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।
ব্রিগেডে সরকারি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী। পাশে রাজ্যপাল।
রেসকোর্সে হেলিপ্যাড নামার পরে সড়কপথে ব্রিগেডের দিকে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদী।