Nilanjana Ghosh Dastidar

ব্যান্ডেলে শিকড়! রহমানের দলে বেস গিটার, গান ইমতিয়াজ়ের ছবিতে, নীলাঞ্জনা শোনালেন সফরের গল্প

এআর রহমানের সঙ্গে বেস গিটারিস্ট হিসাবে কাজ করছেন বেশ কয়েক বছর। এ বার সুরকারের পরিচালনায় ইমতিয়াজ় আলির ছবি ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’-য় গাইলেন বঙ্গতনয়া নীলাঞ্জনা ঘোষ দস্তিদার।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ ০৯:০১
Share:

বঙ্গতনয়া নীলাঞ্জনা গেয়েছেন ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’ ছবিতে। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

হুগলির ব্যান্ডেল থেকে শুরু হয়েছিল সঙ্গীত সফর। এখন তাঁর কণ্ঠে ‘মাসকারা’র জয়জয়কার দেশ জু়ড়ে। এআর রহমানের সঙ্গে বেস গিটারিস্ট হিসাবে কাজ করছেন বেশ কয়েক বছর। এ বার সুরকারের পরিচালনায় ইমতিয়াজ় আলির ছবি ‘ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা’-য় গাইলেন নীলাঞ্জনা ঘোষ দস্তিদার। আনন্দবাজার ডট কমকে জানালেন সঙ্গীতজগতে কী ভাবে এগিয়েছেন ধাপে ধাপে।

Advertisement

ভরতনাট্যমে আপত্তি

সাঙ্গীতিক পরিবারে বড় হওয়া নীলাঞ্জনার। গায়িকার বাবা পেশায় বেস গিটারিস্ট। মঞ্চে অনুষ্ঠান করতেন। মা রবীন্দ্রসঙ্গীত গান। নীলাঞ্জনার কথায়, “জন্মের পর গানবাজনার মধ্যেই বড় হয়েছি। মা হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতেন, আর বাবা গিটার বাজাতেন।” তবে নীলাঞ্জনাকে প্রথমে তাঁর মা ভরতনাট্যম নাচের প্রশিক্ষণকেন্দ্রে ভর্তি করিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “আমি ছোটবেলায় বুঝতে পারিনি, আমি গান গাইতে পারি। মা নাচের স্কুলে নিয়ে যেত জোর করে, ভাল লাগত না। একদিন আলমারির পিছনে লুকিয়ে জেদ ধরলাম, নাচ নয়। আমি গান শিখব। মা খুশি হয়েছিল। তবে মা-ও তখনও জানত না, আমি গাইতে পারি।”

Advertisement

‘জিনে কে হ্যায় চার দিন’

এমনই একদিন নীলাঞ্জনার কণ্ঠে বলিউডের এক সময়ের জনপ্রিয় গান ‘জিনে কে হ্যায় চার দিন’ শুনে তাঁর মা বোঝেন, মেয়ের সুরজ্ঞান আছে। নীলাঞ্জনার কথায়, “সেই আমার গানের হাতেখড়ি। তার পর শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম শুরু হল।” ক্রমশ নীলাঞ্জনা বুঝলেন, তিনি পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রতি বেশি আকৃষ্ট। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর আগেই বিভিন্ন রিয়্যালিটি শো-এ যোগ দিতেন, তবে সফল হননি। গায়িকার স্বীকারোক্তি, “তখন ছোট ছিলাম। খুব আগ্রহীও ছিলাম না। খুব ভাল গাইতামও না। তাই অডিশন দিয়েও সুযোগ পেতাম না। দ্বাদশ শ্রেণির পার করার পরে সারেগামাপা-য় অডিশন দিই এবং সুযোগ পাই। প্রথম নয়ে জায়গা পেয়েছিলাম। সেখান থেকেই বুঝেছি, কোন ধরনের গান আমার কণ্ঠে মানায়। তার পরেই মঞ্চে অনুষ্ঠান করা শুরু করি।”

আঙুল কেটে রক্তারক্তি

গান গাওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছিলেন নীলাঞ্জনা। আর্থিক নিরাপত্তার জন্য ইংরেজিতে স্নাতক পাঠ শেষ করেছেন মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। স্নাতকের পরে চাকরির চেষ্টাও করছিলেন। সঙ্গে বেস গিটারের চর্চা। ছোটবেলা থেকে বাবাকে বেস গিটার বাজাতে দেখেছেন। ফলে একটা আগ্রহ ছিলই। তাঁর কথায়, “গানের মধ্যেও বেস গিটারের সুরটাই আমার কানে আগে আসত। শিখতে শুরু করি। বেস গিটারের স্ট্রিং তুলনামূলক অনেকটাই শক্ত। প্রথম কয়েক দিন আঙুল কেটে রক্তারক্তিও হয়েছিল। তা-ও ভাল লাগত। এমনও হয়েছে সকাল ১০টা থেকে বিকেল পর্যন্ত নাওয়া-খাওয়া ভুলে বাজাতাম।”

কঠিন ‘হোমওয়ার্ক’

বেস গিটার বাজিয়ে ছোট ছোট ভিডিয়ো সমাজমাধ্যমে পোস্ট করতেন নীলাঞ্জনা। তেমনই একটি ভিডিয়ো দেখে ২০২০ সালে এআর রহমানের দল থেকে আসে কাজের প্রস্তাব। এআর রহমানের গানের দলে বাজানোর অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে নীলাঞ্জনা বলেন, “ওঁর সঙ্গে বাজানো একেবারেই সহজ নয়। প্রচুর ‘হোমওয়ার্ক’ করতে হয়। এক সপ্তাহে ৪২টা গানের সঙ্গে বাজানোর অভ্যাস করেছিলাম। তবে মঞ্চে অনুষ্ঠান করার পরে কখনও রহমান স্যর বা অন্য কেউ আমাকে বুঝতে দেয়নি, আমি নতুন। প্রতি মুহূর্তে মনে হয়েছে, সবার মতোই আমিও এই দলের অংশ। উৎসাহ পেয়েছি বলেই পেরেছি।”

আমেরিকার হোটেলে রহমানের ঘরে

বেস গিটারিস্ট হিসাবে কাজ করলেও এই প্রথম রহমানের সুরে গাইলেন নীলাঞ্জনা। কী ভাবে সেই সুযোগ এল? শিল্পীর কথায়, “একদিন এক অনুষ্ঠানের মহড়ায় গাইতে বলা হয় আমাকে। স্যরের এক অসাধারণ ক্ষমতা আছে। কার কণ্ঠে কোন গান মানাবে, সহজেই বুঝে যান। একটি লাইভ অনুষ্ঠানে ‘ছইয়াঁ ছইয়াঁ’ গানটির মহিলা কণ্ঠের অংশটি গেয়েছিলাম। সেখান থেকেই রহমান স্যর জানতেন, আমার কণ্ঠে কেমন গান মানায়।” রহমান মনে রেখেছিলেন নীলাঞ্জনার গায়কির কথা। ২০২৪-এ আমেরিকায় সদলবলে অনুষ্ঠান করতে গিয়েছিলেন রহমান। হোটেলে হঠাৎই একদিন রহমানের আপ্তসহায়ক নীলাঞ্জনাকে ডাকেন। গায়িকা বলেন, “হোটেলে তো স্টুডিয়োর আয়োজন থাকে না সাধারণত। কিন্তু সেই দিন হোটেলে স্যার-এর ঘরে গিয়ে দেখি কিবোর্ড, ল্যাপটপ, রেকর্ডিং সেট আপ তৈরি করা হয়েছে। আমাকে একটি গান রেকর্ড করতে বলা হল। এটা কোনও ছবির গান কি না, তা জানতাম না।”

‘সত্যিই কি আমার কণ্ঠই এই গানে থাকছে?’

রেকর্ডিং-এর পরে নীলাঞ্জনা জানতে পারেন, ইমতিয়াজ় আলির ছবির জন্য গানটি রেকর্ড করা হয়েছে। তখনও ছবির নামকরণ হয়নি। গায়িকা ভেবেছিলেন, তাঁর কণ্ঠ ‘স্ক্যাচ’ হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। চূড়ান্ত রেকর্ডিং-এ অন্য কোনও নামী গায়িকা গাইবেন। তিনি বলেন, “এই গানটিই আর এক বার রেকর্ড করার জন্য পরে আমি চেন্নাই গিয়েছিলাম। তখনও আমি জানতাম না শেষ পর্যন্ত আমার কণ্ঠই এই গানে থাকবে।” অবশেষে একদিন রহমানের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারকে নীলাঞ্জনা প্রশ্ন করে বসেন, “সত্যিই কি আমার কণ্ঠই এই গানে থাকছে?” তখনই জানতে পারেন, ইমিতিয়াজ় আলির ছবির গানে তাঁরই কণ্ঠ থাকছে। তাঁর কথায়, “আমি খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সে এক অন্য অনুভূতি।”

ইমতিয়াজ়ের মুখোমুখি

ছবির গানের মুক্তির সময়ে মুম্বইয়ে ইমতিয়াজ় আলির মুখোমুখি হয়েছিলেন নীলাঞ্জনা। বঙ্গতনয়াকে করমর্দন করে অভিবাদন জানিয়েছিলেন পরিচালক। ‘মাসকারা’ গানটিতে রয়েছে অভিনেতা বেদাঙ্গ রায়নারও কণ্ঠ। রেকর্ডিং আলাদা হয়েছিল। তাই সঙ্গীত মুক্তির দিনই বেদাঙ্গের সঙ্গেও দেখা হয় নীলাঞ্জনার। গানটি এই মুহূর্তে সমাজমাধ্যমে ভাইরাল। প্রশংসাও পাচ্ছেন গায়িকা। সাফল্য উপভোগও করছেন। তবে এই সাফল্যকে কেবল সঙ্গীত সফরের প্রথম ধাপ বলে মনে করছেন নীলাঞ্জনা। এখনও থাকছেন পশ্চিমবঙ্গেই। বর্তমানে তিনি তেঘড়িয়াতে স্বামীর সঙ্গে থাকেন শিল্পী। নীলাঞ্জনার স্পষ্ট বক্তব্য, “আমি প্রশংসা ও সমালোচনা পাচ্ছি, দুটোই গ্রহণ করছি। এই গানটা গাওয়া আমার কাছে একটা কাজ ছিল। তবে এই সাফল্যই আমাকে বুঝিয়েছে, পরবর্তী কাজগুলোর জন্য আরও পরিশ্রম করে যেতে হবে।”

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement