হলমালিকদের পাশে কে দাঁড়াবেন? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
গত মঙ্গলবার থেকে বন্ধ বিনোদিনী থিয়েটার (সাবেক স্টার থিয়েটার)। উত্তর কলকাতার এই সিনেমাহলে কাল, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কোনও শো চলবে না বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। একই পথে হেঁটে বুধবার থেকে বন্ধ হয়ে গিয়েছে প্রিয়া সিনেমাহলও। মিনার, বিজলি, ছবিঘরে চলছে মাত্র দু’টি করে শো। সাবেক স্টার থিয়েটারের পথ ধরে সম্পূর্ণ বন্ধে শামিল হতে পারেন দক্ষিণ কলকাতার আরও দু’টি হলের মালিক, বলে সূত্রের খবর। একে একে আরও বহু সিনেমাহলেরই এই পথ ধরতে হবে বলে আশঙ্কা অনেকের।
কেন এমন পদক্ষেপ হলমালিকদের?
বার বার ঘুরে আসছে পশ্চিমবঙ্গের হলমালিকদের জন্য সম্প্রতি চালু হওয়া কয়েকটি নিয়মের প্রসঙ্গ। রাজ্যের হলমালিকদের অভিযোগ, বাংলা ছবিমুক্তির জোয়ার-ভাটায় নাভিশ্বাস দশা তাঁদের। কারণ, রাজ্য সরকারের নির্দেশ বলছে, হিন্দি ছবি যত থাকুক আগে বাংলা ছবিকে হলে জায়গা দিতে হবে। প্রত্যেক দিন প্রাইমটাইমে, অর্থাৎ দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যায়, অন্তত একটি করে শো দিতেই হবে বাংলা ছবিকে। তখন যথেষ্ট সংখ্যক বাংলা ছবি থাকুক বা না থাকুক।
এই নিয়ম তৈরির সূত্রপাত গত বছরের অগস্ট মাসে। ইদানীং দুর্গাপুজো-বড়দিনের মতো উৎসবের সময়ে একগুচ্ছ বাংলা ছবি মুক্তি পাচ্ছে। তখন বড় বাজেটের হিন্দি ছবিও মুক্তি পায়। শো দেওয়া নিয়ে খানিক টানাপড়েন চলে সে সময়ে। বিপদে পড়েন সিঙ্গল স্ক্রিনের হলমালিকেরা। কারণ তাঁদের হাতে দিনে সেই চারটি শো চালানোরই সুযোগ থাকে। তার মধ্যেই খুঁজতে হয় লাভের ব্যবস্থা।
সরকারি নিয়ম জারি হওয়ার পর থেকে উৎসবের সময়ে বড় বাজেটের হিন্দি ছবি মুক্তি পেলেও হল দিতে পারছেন না হলমালিকেরা। ফলে, বছরের যে সময়ে বাংলা ছবি মুক্তি পাচ্ছে না, তখন আর পশ্চিমবঙ্গের হলমালিকদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন না হিন্দি ছবির পরিবেশকেরা বলে অভিযোগ। চাইলেও এখন হিন্দি ছবি পাচ্ছে না সব হল।
এই ফেব্রুয়ারি মাসে যেমন মোটে দু’টি বাংলা ছবি চলছে, তখন হিন্দি ছবি চালিয়ে যে বাকি শো ভরাবেন তাঁরা, সে সুযোগ মিলছে না বলেই অভিযোগ হলমালিকদের একাংশের। ফলে একের পর এক শো খালি যাচ্ছে বিভিন্ন হলে। প্রতিবাদেই এমন পদক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কেউ কেউ বলে সূত্রের খবর।
এখন বাংলা ছবি বলতে ‘মন মানে না’ এবং ‘খাঁচা’। “ছবি দুটোর দর্শক নেই”, দাবি বিনোদিনী সিনেমাহলের মালিক জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের। সেই জন্যই তিনি ওই দুটো ছবির সঙ্গে ডিসেম্বর মাসে মুক্তি পাওয়া ছবি ‘প্রজাপতি ২’ দেখাচ্ছিলেন। বুধবার তিনি আনন্দবাজার ডট কম-কে বলেছেন, “দেবের ছবি ছাড়া আর কোনও ছবি দেখছে না দর্শক। চারটি শো-এর মধ্যে তিনটি শো চলছিল। ছবির অভাবে একটি শো এমনিতেই বন্ধ ছিল। এখন বাকি শোগুলোও বন্ধ করে দিতে হয়েছে। তাই মঙ্গলবার থেকে হল বন্ধ রেখেছি।” তিনি জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধ থাকবে প্রেক্ষাগৃহের দরজা। শুক্রবার মুক্তি পাবে নতুন বাংলা এবং হিন্দি ছবি। তখন আবার সিনেমাহল খুলবেন তিনি।
একই কারণে বুধবার থেকে বিনোদিনী সিনেমাহলের (সাবেক স্টার থিয়েটার) দেখানো পথে হেঁটেছেন প্রিয়া সিনেমাহলের মালিক অরিজিৎ দত্তও। তিনি সাফ বলেছেন, “বুধবার থেকে হল বন্ধ রেখেছি। শুক্রবার ‘কেরালা স্টোরি ২’ মুক্তি পাবে। তার সঙ্গে ‘মর্দানি ২’কে রাখব। সপ্তাহান্ত এ ভাবেই চলবে।” সোমবার থেকে আবার প্রিয়ার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন তিনি। শুক্রবার মুক্তি পাবে বাংলা ছবি ‘প্রমোটার বৌদি’। সেই ছবি প্রিয়াতে শো পাবে না? প্রশ্নের জবাবে অরিজিৎ জানিয়েছেন, প্রযোজক ছবি দেখানোর অনুরোধ জানালে নিশ্চয়ই দেখাবেন তিনি। তাঁর দাবি, হলে পাঁচ জনের বেশি দর্শক আসছিলেন না! এই পরিস্থিতিতে হল খোলা রেখে কী করবেন?
জয়দীপ-অরিজিতের মতো পুরনো দুটো ছবি দিয়ে কোনওমতে শো চালু রেখেছেন মিনার-বিজলি-ছবিঘরের মালিক সুরঞ্জন পাল। তিনি এই মুহূর্তে দেশের বাইরে। সেখান থেকেই আনন্দবাজার ডট কম-কে জানিয়েছেন, তাঁর প্রত্যেক হলেই চারটি করে শো। ছবির অভাবে তিনি ‘প্রজাপতি ২’ এবং ‘ধুরন্ধর’ চালাচ্ছেন। সুরঞ্জনবাবু বলেন, “উৎসবে আমরা বিরিয়ানি খাই। বাকি সময়ে উপোস! হলমালিকদের এই তো জীবন!”
কথা বলেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও এক হলমালিক। তাঁরও নিজের হলে সব ক’টি শো চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এই সমস্যার জন্য তিনি দায়ী করেছেন টলিউডের ‘মাথা’দের। তাঁর কথায়, “আগুপিছু না ভেবে রাজ্য সরকারের মাধ্যমে নতুন নিয়ম চালু করে দেওয়া হল। অথচ বছরের ৫২ সপ্তাহে কম করে ৫২টি ছবি আসছে কি না, তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই! এখন এর ফল তো ভুগতে হবেই।” ওই হলমালিকের আরও বক্তব্য, এখনও যদি বিষয়টি বিবেচনা না করা হয়, তা হলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে আরও কয়েকটি সিঙ্গল স্ক্রিন। সে ক্ষেত্রে রাজ্যে সিনেমাহলের সংখ্যা আরও কমবে। তখন কোথায় ছবি চালাবেন প্রযোজকেরা? তাই তাঁর অনুরোধ, রাজ্য সরকার যেন বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে। নিয়ম করে সারা বছর মুক্তি পাক বাংলা ছবি। সঙ্গে হিন্দি বা অন্য ভাষার ছবি দেখানোরও স্বাধীনতা দেওয়া হোক হলমালিকদের।