Satabdi Roy Interview

আমি যতটা নেত্রী, ততটা অভিনেত্রী! বড় হয়েছি অভিনয় করে, আর বুড়ো হওয়া রাজনীতিতে: শতাব্দী রায়

অভিনয় আর রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ততার ফাঁকে কাব্যের জন্য সময় বার করেছেন শতাব্দী রায়। একক কবিতা পাঠের আসরের আগে আনন্দবাজার ডট কম-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় বসলেন অভিনেত্রী-নেত্রী।

Advertisement

সুচন্দ্রা ঘটক

শেষ আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:২৪
Share:

শতাব্দী রায়। ছবি: সংগৃহীত।

সামনে এসে কে দাঁড়াবেন? অভিনেত্রী, নেত্রী, না কি অচেনা এক কবি?

Advertisement

দরজা খুলতেই মনে হবে, এই বুঝি ধন্দ কাটল! যে দিকেই চোখ যাবে, সে দিকেই শ্বেতশুভ্র সংসারের শৌখিন ঝলক। সাজানো হলঘরের একপ্রান্তে রুপোলি পর্দার নায়িকা শতাব্দী রায়ের দেওয়ালজোড়া ছবি।

চোখ ঘুরতে ঘুরতে ফের আটকাবে। দক্ষিণ কলকাতার সেই ফ্ল্যাটে রোদে উজ্জ্বল বসার ঘরের আর এক দেওয়ালের কোণে আছে বইয়ের তাক। সেখানে কবির বসবাস।

Advertisement

অভিনেত্রীরা তবে কি ততটাও নেত্রী হয়ে যান না? ছবি-কবিতায় শিল্পীমন ভরেই থাকে?

মনে মনে প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই সামনে এসে দাঁড়ান কেন্দ্রচরিত্র। হাতজোড় করে নম্র-দৃঢ় ভঙ্গিতে সাংবাদিককে স্বাগত জানান। ক্ষণিকেই চোখ যায় ঘরের কোণে উপস্থিত হওয়া সারমেয়র দিকে। পোষ্য ক’দিন ধরে অসুস্থ। গৃহকর্ত্রী এগিয়ে যান তার কাছে। কোলে টেনে নিয়ে সাদা সোফায় এসে বসেন শ্রীমতী।

‘‘সেশন চললে বাড়িতে সময় দিতে পারি না তো বিশেষ, আমাকে দেখে তাই এগিয়ে এসেছে ও,’’ পোষ্যের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে সস্নেহে আলাপ শুরু করেন লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের ডেপুটি লিডার শতাব্দী।

ঘরের এক কোণের আলমারিতে ভরা তাঁরই লেখা কবিতার বই। নিজেই সেখান থেকে বই বের করে কবিতা পড়ে শোনালেন শতাব্দী। — নিজস্ব চিত্র।

কাজের অনেক চাপ। কখনও দিল্লি তো কখনও বীরভূম, দৌড়োদৌড়ি লেগেই থাকে। তার মধ্যেই চলে মাঝেমধ্যে কবিতা লেখা। দুই সন্তান আর স্বামীকে নিয়ে সংসার তো আছেই। আছে পোষ্য সারমেয়, বৃহৎ অ্যাকোয়ারিয়াম ভর্তি মাছ, দিকে দিকে সাজানো গাছ। ‘‘বাড়ির সব কিছু নিজে বেছে কিনেছি। নিজে হাতে করে সব কিছুর যত্ন করতে পছন্দ করি’’, বলেন অভিনেত্রী-নেত্রী।

তবে এ আলাপের মূলে তাঁর রাজনীতি বা অভিনয় নয়। সংসার তো নয়ই। আছে কবিতা। যা কিনা রাজনীতির কাজের চাপে আজকাল প্রায় লেখাই হয় না। লেখা বলতে মাঝেমধ্যে যাওয়া-আসার মাঝে শুধু নাকি ফেসবুকে দু’কলম।

অথচ এই রাজনীতিকের ১২টি কবিতার বই আছে। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম বই। তখন তিনি বাংলা সিনেমার প্রথম সারির নায়িকা। অনেকেই নাকি কবিতার বই দেখে তাই অবাক হতেন। আবার লেখা দেখে উৎসাহও দিয়েছেন কেউ কেউ। তার পর কাজের চাপ বেড়েছে। নিজের জন্য সময় কমেছে। ফলে কবিতাও পেয়েছে কম সময়। নেত্রী কিংবা অভিনেত্রী শতাব্দীকে যাঁরা আজ চেনেন, তাঁদের অনেকেই কবি শতাব্দীর খোঁজ তেমন রাখেন না।

তিনিও কি চাননি কবি শতাব্দীকে আরও একটু বেশি পরিচিতি দিতে?

দিনে তো সেই ২৪ ঘণ্টাই থাকে! মনে করিয়ে দেন ব্যস্ত রাজনীতিক। এত কিছু করার সময় আসবে কোথা থেকে? তবে এ বার একটু সময় বার করেছেন কবি শতাব্দীর জন্য। কাল, শনিবার সন্ধ্যায় শিশির মঞ্চে বসাচ্ছেন একক কবিতাপাঠের আসর। নিজের লেখা কবিতা মঞ্চে বসে নিজেই পাঠ করবেন। বহুকালের মধ্যে এমন অনুষ্ঠান করেননি তিনি। ফলে উৎসাহীও বেশ। নেত্রী-কবি বলেন, ‘‘সব কাজই মন দিয়ে, ভালবেসে করি। কিন্তু কী জানেন, রাজনীতি সারা দিনের কাজ। তার ফাঁকে নিজের শিল্পচেতনাকে মদত দেওয়া সব সময়ে হয়ে ওঠে না। সে ইচ্ছাটা থেকে যায়। কবিতার জন্য একটু সময় বার করতে ইচ্ছা হল তাই।’’ তবে শুধু কবিতার জগতের নামীজনেরা নন, অনুষ্ঠানে তাঁর সিনেমার জগতের বন্ধুরা যেমন নিমন্ত্রিত, তেমনই নেমন্তন্ন পেয়েছেন রাজনীতির সহকর্মীরা।

খানিক ছন্দবদল। আলোচনায় ঢুকে পড়ে রাজনীতি।

সামনেই রাজ্যে নির্বাচন। ভোটের কাজের ব্যস্ততা আছে নিশ্চয়ই? ‘‘সে তো আছেই। কিন্তু শিল্পের সঙ্গে যুক্ত না থাকতে পারলে আমার মনখারাপ লাগে। তাই কবিতার জন্য একটু সময় বার করে নিয়েছি। এর পরেই তো আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ব,’’ উত্তর নেত্রীর।

আর রাজনীতির সেই ব্যস্ততার ঝড়ের কারণেই কি প্রায় অদেখা অভিনেত্রী শতাব্দী?

সময় পান না ঠিকই, তবে ছবিটি যদি কবিতার মতো মনে ধরে, তা হলে সময়ও করে নেবেন। শতাব্দী বলেন, ‘‘আমি যতটা নেত্রী, এখনও ততটাই অভিনেত্রী। ছোট থেকে বড় হয়েছি সিনেমা নিয়ে, বড় থেকে বুড়ো হয়েছি রাজনীতি করে।’’ মুখভঙ্গি বিশেষ বদলায় না প্রাপ্তমনস্ক রাজনীতিকের। মনে করিয়ে দেন, ‘‘এখন তো শুধু ছবি করার জন্য সময় বার করলে হয় না, তা চালানোর ভাবনাও ভাবতে হয়। সিস্টেম অনেক বদলে গিয়েছে। আগে সে সব ভাবতে হত না আমাদের।’’ সমাজমাধ্যমের দাপটকে মেনে নিতে পারেন না এককালের দাপুটে নায়িকা।

সফল রাজনীতিকের বাচনভঙ্গিতে স্পষ্ট থাকে, ব্যবসার কথা ভাবতে না হলেও, তাঁর তারকাদ্যুতিতে যে একের পর এক ছবি চলেছে, সেই বিশ্বাস। কিন্তু তখন তারকারা ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে সহজলভ্য ছিলেন না। তাঁদের দেখতে সিনেমাহলে যেতে হত সে সময়ে, মনে করান শতাব্দী। ‘‘এখন তো সমাজমাধ্যমের যুগে যেখানে-সেখানে তারকাদের দেখা যায়। আলাদা করে ছবি হিট হওয়ার দরকার পড়ে না জনপ্রিয় হওয়ার জন্য। ফলে ছবি হিট করানোর জন্য আলাদা করে ভাবতে হয়’’, বলে চলেন নায়িকা। সামনে বসা তারকার নির্লিপ্ত মৃদুস্বর বাক্যগুচ্ছের সঙ্গে ভেসে আসা আত্মবিশ্বাসের জোয়ারে সাংবাদিকের চোখ গিয়ে ফের আটকায় সাদা ডাইনিং টেবিলের পাশের দেওয়ালের প্রকাণ্ড ফ্রেমে বাঁধানো নায়িকার সেই ছবিটিতে। তা খেয়াল করে গৃহকর্ত্রীর চোখের কোণে সামান্য হাসি তখন। শুধু বলেন, ‘‘ডাবু রতনানি তুলেছিলেন!’’

তারকাকে যদি বাজারে যেতে দেখা যায়, রাস্তায় হাঁটতে দেখা যায়, তবে তাঁকে পর্দায় দেখার দরকার কী? প্রশ্ন ছুড়ে দেন বছরের পর বছর ম্যাটিনি শো ভরিয়ে রাখা তারকা। তিনি বলেন, ‘‘এখানে তো আর কোনও রজনীকান্ত নেই, বাংলা ছবি চলবে কী করে? তেমন স্টার থাকলে আলাদা কথা। তাঁকে যেমনই দেখতে লাগুক, লোকে ছুটে আসবে। আর না হলে ছবি খুব ভাল হতে হয়।’’

বাংলা ছবির দুঃসময় যাচ্ছে, মনে করেন শতাব্দী। তাঁর দলের নেতারা কি পাশে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারেন না? ‘‘এখন বাংলা ছবি খড়কুটো ধরে বেঁচে আছে। এর মধ্যে রাজনীতির জায়গা নেই। আমাকে কেউ জিজ্ঞাসা করলেই তা বলব’’, বলেন নেত্রী-অভিনেত্রী।

১২টি কবিতার বই আছে শতাব্দী রায়ের। ১৯৯৫ সালে প্রথম বইটি প্রকাশিত হয়। ছবি: সংগৃহীত।

ছবি দেখার সময় না পেলেও, সিনেমা জগতের বন্ধুরা এখনও তাঁর আপন। ফিল্মের পার্টি-প্রিমিয়ারে দেখা দেন না বটে, তবে ইন্দ্রাণী (দত্ত), শ্রীলেখার (মিত্র) নাম ঠোঁটের সামনেই থাকে। তাঁর একসময়ের নায়ক চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী-প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের নাম নিতেও ভোলেন না। জানান, রাজনীতিতে গিয়েও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়েছে সহকর্মীদের সঙ্গে। তবে কারও সঙ্গেই সময় কাটানো হয় না খুব একটা। অতিথিকে ঘুরে ঘুরে নিজের পছন্দের গাছ দেখাতে দেখাতে সে সব কথা বলে চলেন অভিনেত্রী। জানান, কলকাতায় থাকলে সংসারটা নিজে হাতে সামলাতে ভাল লাগে। গাছ-মাছেদের যত্ন করে কাটে বাড়িতে থাকার সময়টা।

দিনের শেষে যে তারকা তিনি। রাজনীতির প্রয়োজন ছাড়া ভিড়ের থেকে দূরে থাকাই তো অভ্যাস। শ্বেতশুভ্র সাজানো সংসারের গিন্নি বলেন, ‘‘অনেক সময়েই পার্টিতে যেতে বলেন কত জনে। কিন্তু পাব আর পার্টিত নিয়মিত যেতে থাকলে আমার বাড়ির সময়টা কমবে। কাজের সময় তো আর কমবে না। ফলে স্বামী আর সন্তানদের সঙ্গে বেশি দেখা হবে না। সেটা আমার ভাল লাগবে না।’’

চারকাজে দৌড়োতে হলেও যাপন চলে তাঁর এমনই ৪-৪-৪-২ ভারসাম্য রক্ষা করে। কোনও ক্ষেত্রেই যেন ছন্দপতন পছন্দ নয় নেত্রী-অভিনেত্রীর। ফিল্ম-রাজনীতি-সাংসারের রোজনামচার গল্পের মাঝেও এ ভাবে উঁকি দিয়ে অস্তিত্ব প্রমাণ করে যায় শতাব্দীর কবিমন! নিন্দকেরা অবশ্য একেই বলেন, ‘রাজনীতির নিছক গণিত’!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement