মঞ্চেও কি নারীরাই ‘বস’? প্রতীকী ছবি।
ওঁরাও কাঁধে করে ‘প্রপস’ বয়ে দেন। রাত জেগে মহড়ায় থাকেন। কলকাতার বাইরে কল শো-তে পৌঁছে যান। কিন্তু তাঁদের বলা কথা কতটা গ্রহণযোগ্য? তাঁদের থেকে কেউ পরামর্শ চান? ওঁরা পরামর্শ দিলে আদৌ কি কেউ শোনেন?
এই ‘ওঁরা’ কারা? ‘ওঁরা’ মঞ্চের নারী। একুশ শতক বলে, পেশাজীবনে প্রত্যেকে যেন ‘খোলা তরবারি’! তার পরেও প্রশ্ন, মঞ্চাভিনেত্রীদের জীবন আদতে কতটা এগিয়েছে। পেশা এবং ব্যক্তিগত জীবন কি আদৌ মসৃণ? তার চেয়েও বড় কথা, ওঁরা কি মঞ্চের ‘বস’ হয়ে উঠতে পেরেছেন? এঁদের পরিচালনা, উপস্থাপনা, অভিনয়, সম্মান কতটা উদ্যাপিত হয়? আন্তর্জাতিক নারী দিবসে আনন্দবাজার ডট কম-এর কাছে ‘খোলা খাতা’ মঞ্চের ‘পঞ্চকন্যা’ নিবেদিতা মুখোপাধ্যায়, সেঁজুতি মুখোপাধ্যায়, দেবযানী চট্টোপাধ্যায়, অবন্তী চক্রবর্তী, শিরিণ পাল! প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, আনন্দ-বেদনা, অপমান-অনুরাগের হিসাব কষলেন নিজেদের জীবন হাতড়ে।
পুরুষ অভিনেতারা ফুলের স্তবক পেলেন, আমার হাত শূন্য!
একুশ শতকে পৌঁছে এটাই মঞ্চাভিনেত্রীর জীবন! আন্তর্জাতিক নারীদিবসের আগের রাতে হাসতে হাসতে বললেন অভিনেত্রী নিবেদিতা মুখোপাধ্যায়। নাট্যব্যক্তিত্ব অরুণ মুখোপাধ্যায়ের পুত্রবধূ। মঞ্চ-পর্দার খ্যাতনামী অভিনেতা সুজননীল মুখোপাধ্যায় তাঁর স্বামী। মঞ্চে দীর্ঘ দিন অভিনয় করছেন। অভিনেত্রীদের জীবন কি একটুও উন্নত হল? প্রশ্ন ছিল তাঁর কাছে। তখনই তিনি ছোট্ট গল্প শোনালেন। বললেন, “একবার নাটকশেষে উদ্যোক্তারা ফুলের স্তবক দিয়ে সম্মানিত করছেন সবাইকে। আমার পাশে পুরুষ অভিনেতারা ফুল পেলেন। আমার হাত শূন্য! উদ্যোক্তা মঞ্চেই ঘোষণা করছেন, আমাদের ফুলের তোড়া কম পড়ে গিয়েছে। তাই ওঁকে দেওয়া সম্ভব হল না।” যাঁরা অভিনেত্রীকে ‘অভিনেতা’ হিসাবেই গণ্য করেন না, তাঁরা নিবেদিতাকে কী পুষ্পস্তবক দেবেন? প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানিয়ে সে দিন মঞ্চ ছেড়েছিলেন অভিনেত্রী।
মঞ্চ এবং পর্দার সফল অভিনেত্রী নিবেদিতা মুখোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
এই ধরনের অপমান গা সওয়া হয়ে গিয়েছে নিবেদিতার। অনুভূতিগুলোকে ঘুম পাড়িয়ে নাটকের মহড়া দেন। নির্দিষ্ট দিনে মঞ্চাভিনয় করেন। তাঁর কথায়, “দর্শক আমার পাশে। আট থেকে আশি প্রচণ্ড ভালবাসেন। কেউ উপহার আনেন, কেউ বাড়ি থেকে রান্না নিয়ে আসেন। এমনও কমবয়সি দর্শক আছেন, যাঁরা টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে আমার পছন্দের জিনিস কিনে এনেছেন। আর কী চাই?”
নাট্যদুনিয়ার একেবারে শুরুর দিনগুলো তাঁর দেখা হয়নি। তবে নিবেদিতা এটা খুব ভাল করে বোঝেন, তখনও অভিনেত্রীদের দমিয়ে রাখা হত, এখনও তা-ই হয়। অভিনেত্রীর কথায়, “তখন সরাসরি বলা হত, তুমি এটা কোরো না। এখন তাতে মিষ্টিত্ব মিশিয়ে বা ঘুরিয়ে একই কথা বলা হয়। দিন বদলায়নি আমাদের।” উদাহরণ হিসাবে তাঁর বক্তব্য, বেশি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এখনও চট করে নারীদের দেওয়া হয় না। দিলেও সেখানে পক্ষপাতিত্ব থাকে। কোনও অভিনেত্রী পুরস্কার পেলে বা সম্মানিত হলে মুখ ভার হয় অভিনেতাদের, এখনও ! আবার অভিনেতা ভাল অভিনয় না করলেও তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ সংবাদমাধ্যম থেকে দলের সবাই। কোনও অভিনেত্রী খুব ভাল অভিনয় করলেও তাঁর প্রশংসা করতে চান না কেউ। নিবেদিতার কথায়, “ব্যতিক্রমও আছেন। যাঁরা বয়সে অনেক বড়, তাঁরা প্রশংসা করেন। যেমন আমার শ্বশুরমশাই অরুণ মুখোপাধ্যায় কিংবা রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্তের মতো খ্যাতনামীরা। যাঁরা সমবয়সি বা যাঁদের বয়সের ব্যবধান অল্প, তাঁরা কিন্তু ভুলেও এ পথে হাঁটেন না।”
নারী-পুরুষের অসাম্য নিয়ে নিবেদিতা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। “ধরুন পরিবারে এক বা একাধিক মঞ্চাভিনেতা রয়েছেন। স্বামী সম্মানিত হলে স্ত্রী আনন্দে আত্মহারা। উল্টোটা ঘটলে ছবিটাও বদলে যায়”, দাবি অভিনেত্রীর। জানিয়েছেন, পুরুষটি স্বামী বা পরিবারের অন্য কেউ হলে, তাঁর মনে হিংসা বা ঈর্ষা দানা বাঁধে! নিবেদিতা নিজে এ রকম ঘটনার সাক্ষী।
থিয়েটারের ‘স্টারডম’ এখনও পুরুষকে ঘিরেই, নারী সেখানে ব্রাত্য!
সেঁজুতি মুখোপাধ্যায়। তিনিও দীর্ঘ বছর ধরে নাট্যদুনিয়ার সঙ্গে যুক্ত। আগের তুলনায় নাট্যদুনিয়ায় অভিনেত্রীর সংখ্যা বেড়েছে, জানিয়েছেন তিনি। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মতামত বা নাটকের গল্প বেছে দেওয়া-সহ নানা বিষয়ে অভিনেত্রীদের বক্তব্য বা জোর কতটা খাটে? প্রশ্ন ছিল তাঁর কাছে। সেঁজুতি সাফ বলেছেন, “নাটক বা মঞ্চ সমাজের বাইরে নয়। আর সমাজে এখনও নারী-পুরুষ সমান নন। ফলে, সেই ছায়া এই আঙিনাতেও। আমরা তাই সাম্য আশাও করি না।” তিনি জানান, থিয়েটারে এখন ‘স্টারডম’ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেটাও পুরুষদের কেন্দ্র করেই। অভিনেত্রীরা তখনই এই তকমা পান, যখন তাঁদের সঙ্গে রুপোলি পর্দার যোগ থাকে। অর্থাৎ, তাঁরা যখন ছায়াছবি, ধারাবাহিক বা সিরিজ়েও সমান ভাবে জনপ্রিয় হন।
অভিনেত্রী টানা ৪০ বছর মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত। তিনি দেখেছেন, থিয়েটারের মহিলা চরিত্রগুলি যেন পুরুষ চরিত্রকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য লেখা হয়! “এরও নেপথ্য কারণ সমাজ। আর তাই পুরুষ চরিত্র বেশি গুরুত্ব পান। ব্যতিক্রম মহিলা পরিচালকদের ক্ষেত্রে। তাঁদের নাটকে সাধারণত মহিলা চরিত্রেরাই গুরুত্ব পেয়ে থাকেন।” সেঁজুতির এই বক্তব্য শোনা গিয়েছে নিবেদিতার কথাতেও। তিনিও বলেছেন, “বড়পর্দায় এখন নারীকেন্দ্রিক ছবি হচ্ছে। ছোটপর্দা নারীপ্রধান। মঞ্চে এখনও সেটা হয়ে ওঠেনি! আমাদের বাংলায় ক’টা নারীকেন্দ্রিক নাটক হয়? এত বছরের জীবনে ব্রাত্য বসু আমার জন্য ‘ক্রিউসা দ্য কুইন’ লিখেছিলেন। ওই নাটকে আমি কেন্দ্রীয় চরিত্র।”
মঞ্চ ও পর্দার জনপ্রিয় অভিনেত্রী সেঁজুতি মুখোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
এমন ব্যতিক্রমী ঘটনা সেঁজুতির জীবনেও ঘটেছে। তিনি নাট্যপরিচালক উষা গঙ্গোপাধ্যায় (অধুনা প্রয়াত) বা এই প্রজন্মের পরিচালক অবন্তী চক্রবর্তীর সঙ্গে কাজ করেছেন। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র পেয়েছেন। পাশাপাশি তিনি এ-ও বলেছেন, “আমি যেহেতু পরিচালক নই, তাই চরিত্র বা গল্প বাছার সুযোগ পাইনি। এই দায়িত্ব পরিচালকের।” তবে নাটক সম্পর্কিত নানা বিষয়ে তিনি অবশ্যই পরামর্শ দিয়েছেন এবং সেই পরামর্শ রাখা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে সেঁজুতি উল্লেখ করেছেন ‘রঙ্গপট’ নাট্যগোষ্ঠীর। সেখানে ড. তপনজ্যোতি দাস পরিচালক হলেও সেঁজুতির পরামর্শ খোলামনে গ্রহণ করেছেন। অভিনেত্রীকেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য ডেকেছেন।
পাশাপাশি, সেঁজুতি আশার কথাও শুনিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ছবি পরিচালনার মতোই ক্রমশ নাটক পরিচালনাতেও আসছেন মেয়েরা। তৃপ্তি মিত্র, উষা গঙ্গোপাধ্যায়, সীমা মুখোপাধ্যায়, অবন্তী চক্রবর্তীরা তাঁর উদাহরণ। সেঁজুতির মতে, নাটক পরিচালনায় মেয়েরা যত আসবেন, ততই নারীর কথা, তার গল্প নাটকের কাহিনিতে গুরুত্ব পাবে। কথাপ্রসঙ্গে তিনি তাঁর মঞ্চাভিনেতা বাবা অসিত মুখোপাধ্যায়ের আক্ষেপের কথা জানান। সেঁজুতি বলেন, “আমার বাবার সময়ে অভিনেত্রীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। বাবা তাই আক্ষেপ করে বলতেন, আগামী জন্মে যদি একাধিক বিয়ে করতে পারি, তা হলে সবাইকে মঞ্চে অভিনয়ের জন্য নিয়ে যেতে পারব!”
অভিনেত্রী রুপোলি পর্দার হলে অভিনেতার থেকে তাঁর পারিশ্রমিক বেশি
থিয়েটারের আঙিনা কি তা হলে পর্দার থেকে এখনও অনেকটা পিছিয়ে? একুশ শতকে মঞ্চাভিনয় জনপ্রিয় হলেও খোলনলচে পুরনো?
এ কথা অবশ্য মানতে রাজি নন পর্দা-মঞ্চের আর এক অভিনেত্রী দেবযানী চট্টোপাধ্যায়। তিনি কিন্তু এতটাও হতাশ নন। তাঁর কথায়, “থিয়েটারের অন্ধকার দিকের সঙ্গে ততটাও ওয়াকিবহাল নই। আমার সঙ্গে এ রকম সমস্যা এখনও হয়নি। তবে বাকিরা আমার থেকে বেশি সময় ধরে মঞ্চে নিয়মিত। তাই তাঁদের অভিজ্ঞতাও আমার থেকে বেশি।” তবে তিনি সেঁজুতির একটি বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন। রুপোলি পর্দা ফেরত হলে অভিনেত্রীর দর যে বাড়ে, সে বিষয়ে তিনিও সেঁজুতির সঙ্গে সহমত। দেবযানী অকপটে বলেছেন, “আমি পর্দায় বেশি কাজ করেছি। আমার মুখ সে ক্ষেত্রে তুলনায় বেশি পরিচিত। সে কারণেই হয়তো বরাবর গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রই আমায় দেওয়া হয়েছে।”
অভিনেত্রী দেবযানী চট্টোপাধ্যায় মঞ্চে আছেন, পর্দাতেও। ছবি: সংগৃহীত।
এই বিষয় প্রযোজ্য পারিশ্রমিকের ক্ষেত্রেও। পর্দার মতো মঞ্চেও পুরুষেরা বেশি পারিশ্রমিক পান, এই বক্তব্যে সায় রয়েছে সেঁজুতির। দেবযানীও সে কথাই বলেছেন। তবে তিনি এ ক্ষেত্রেও ভাগ্যবতী। পর্দাফেরত হওয়ার কারণে তিনি অভিনেতার থেকে বরাবর বেশি পারিশ্রমিক পেয়েছেন। তাঁর কথায়, “সিনেমা, সিরিজ়, ধারাবাহিকে অভিনয়ের দৌলতে, ক্যামেরার সামনে অভিজ্ঞতা বেশি থাকার কারণে বরাবর আমার পারিশ্রমিক পুরুষ সহ-অভিনেতার থেকে বেশি ছিল।”
এখনও মেয়েদের নেতৃত্ব মেনে নিতে পারেন না বেশির ভাগ পুরুষ
এই প্রজন্মের মহিলা পরিচালকদের মধ্যে অন্যতম অবন্তী চক্রবর্তী। সদ্য তাঁর পরিচালিত ‘সিরাজ এবং’ নাটকটি দর্শক প্রশংসিত। নাটকের পাশাপাশি ছবিও পরিচালনা করছেন তিনি। অর্থাৎ, মহিলা পরিচালকের নাটক দর্শক পছন্দ করেন। যুগ এগিয়েছে। মঞ্চাভিনেত্রীর সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু মহিলা নাট্যপরিচালকের সংখ্যা হাতেগোনা কেন? অবন্তীর কথায় যেন নিবেদিতার কথার ছায়া। একটু থেমে জবাব দিয়েছেন, “মহিলা পরিচালক কম কারণ, মেয়েদের লিডারশিপে দেখতে পছন্দ করে না বেশির ভাগ লোক। বেশির ভাগ পুরুষ। বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হয়। কিন্তু মন থেকে যে বিষয়টি পছন্দ করেন তাঁরা, তা কিন্তু নয়।”
অভিনেত্রী, নাট্যপরিচালক অবন্তী চক্রবর্তী। ছবি: সংগৃহীত।
অবন্তী কি নাটক পরিচালনা করতে গিয়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন? “সরাসরি হয়তো সমস্যার সম্মুখীন হইনি। তবে চারপাশ থেকে একটা অন্য রকম অনুভূতি টের পেয়েছি। নেতিবাচক ‘ভাইবস’ বলব না। তবে খুব যে খুশি মনে আমায় গ্রহণ করা হয়েছে, তেমনটাও নয়। এ ক্ষেত্রে বলব, আমার কাজ সব সময়ে আমার হয়ে কথা বলেছে। সেই কারণেই আমায় পরিচালক বলে মানতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা।” এই বাধা এখনও অনুভব করেন তিনি। এতে তাঁর জেদ বাড়ে। আরও নিখুঁত হয়ে ওঠা, আরও নিখুঁত কাজ করার তাগিদ অনুভব করেন অবন্তী।
একই ভাবে মহিলা পরিচালকের কোনও অভিনেতাকে ঘনিষ্ঠদৃশ্য বোঝানো নিয়েও বক্তব্য জানিয়েছেন অবন্তী। এ ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতা খারাপ না হলেও অন্যের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়, সে কথাও তিনি অস্বীকার করেননি। অবন্তীর উদাহরণ, “শুনেছি, কোনও মহিলা পরিচালক যদি কোনও অভিনেতাকে ঘনিষ্ঠ দৃশ্য বোঝান, তা হলে নাকি অনেক ক্ষেত্রেই ধরে নেওয়া হয়, এটা ওই মহিলা পরিচালকের সুপ্ত বাসনা! দৃশ্যবর্ণনার মধ্যে দিয়ে তিনি তাঁর বাসনাকে প্রকাশ করছেন! তিনি হয়তো ওই অভিনেতাকে নিয়ে ‘ফ্যান্টাসি’তে ভোগেন!”
মেয়েরা এখনও অভিনয়ে ‘নামে’, পুরুষদের ক্ষেত্রে এ রকম বক্তব্য নেই!
নিবেদিতা, সেঁজুতি, অবন্তী বা দেবযানী— প্রত্যেকে আগের প্রজন্মের। তাঁরা তাঁদের সময়ের সঙ্গে এই প্রজন্মের সেতুবন্ধ ঘটিয়েছেন। এই প্রজন্মের মেয়েরা নাটক নিয়ে কী ভাবেন? এই প্রজন্মের নারী নাটকে অভিনয় করতে আসছেন? প্রশ্ন ছিল, মঞ্চ এবং পর্দার অভিনেত্রী শিরিণ পালের কাছে। শিরিণ এই মুহূর্তে জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’-এর নায়িকা। তিনি কথার শুরুতেই জানিয়েছেন, সমাজের এখনও এত বিপন্ন অবস্থা যে মহিলা পরিচালক বা মহিলা অভিনেতা শব্দগুলো আলাদা করে ব্যবহৃত হয়। এই ধরনের অস্বস্তিকর প্রশ্নও জন্ম নেয়। পুরুষদের কিন্তু এই ধরনের প্রশ্ন করা হয় না।
এই জায়গা থেকে শিরিণের উপলব্ধি, নারী বা পুরুষ নন, মানুষ নাটকে অভিনয়ে আগ্রহী হন। তাঁর দাবি, “আমাদের নাট্যদল ‘ঝাড়গ্রাম কথাকৃতি’তে অভিনেত্রীর সংখ্যাই বেশি।” এর বাইরেও তিনি আরও অন্যান্য নাট্যদলে অভিনয় করেছেন। সেখানেও তিনি লক্ষ করেছেন, মহিলাদের উপস্থিতি বেশি।
তার পরেও নারীকেন্দ্রিক নাটক তৈরি হয় না! “সত্যিই হয় না”, আক্ষেপ শিরিণের। ছোটপর্দা তবু মেয়েদের গল্প বলে। মঞ্চ সে পথে এগোতেই পারল না এখনও, জানিয়েছেন তিনি। শিরিণের কথায়, “এখনও বেশির ভাগ সিনেমা বা নাটকে অভিনেত্রীরা যেন ট্রফির মতো সাজানো! পুরুষ চরিত্রকে ‘গ্লোরিফাই’ করার জন্যই এই চরিত্রগুলো লেখা হয়। এ সব দেখে খুব কষ্ট হয়। যুগ যুগ ধরে নারী দিবস পালন করেও আমাদের অবস্থা একই রয়ে যাচ্ছে।” তাই এখনও কাজ থেকে ফিরতে রাত হয়ে গেলে ভয় পান শিরিণ। খুব নিরাপদ বোধ করেন না! কাজের দুনিয়াতে এখনও নিরাপদ নয় নারী।
মঞ্চ-পর্দায় অনায়াস শিরিণ পাল। ছবি: সংগৃহীত।
মঞ্চ আর পর্দা, দুটো মাধ্যমেই অভিনয় মূলধন। তার পরেও ফারাক অনেক। পর্দায় যেমন অনেক ঘনিষ্ঠ দৃশ্য ‘চুরি’ করে করা হয়। মঞ্চে সেটা সম্ভব হয় না। সরাসরি শরীর স্পর্শ করে অভিনয় করতে হয়। শিরিণের এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা কেমন? অভিনেত্রীর সরাসরি কোনও খারাপ অভিজ্ঞতা নেই। স্পর্শ করার আগে সহ-অভিনেতা তাঁর অনুমতি নিয়েছেন। “কিন্তু তার মানে খারাপ কিছু হয় না, সেটাও নয়। অনেকের অনেক খারাপ অভিজ্ঞতা আছে এই ধরনের দৃশ্যে অভিনয়কে কেন্দ্র করে। আমি শুনেছি সে কথা।”
কথায় কথায় উঠে এসেছে আরও একটি প্রসঙ্গ। মেয়েরা অভিনয়ে ‘নামে’! পুরুষের ক্ষেত্রে এই শব্দপ্রয়োগ আগেও ঘটেনি, এখন তো ঘটেই না। শিরিণ সহমত এ বিষয়ে। তিনি ফিরে গিয়েছেন অতীতে, যখন বলা হত ‘বেশ্যারা পার্ট করতে আসছেন বাংলা থিয়েটারে, বাবুদের থিয়েটারে।’ তাঁর আফসোস, “এই ভাবনা আমরা বোধহয় কাটিয়ে উঠতে পারছি না। বাংলা থিয়েটার এখনও এই ভাবনাতেই বন্দি। সেই অদ্ভুত লিঙ্গবৈষম্য।” শিরিণের উপলব্ধি, এই যবনিকা উঠছে না বলেই বারে বারে এখনও উল্লিখিত হয়, অমুক চরিত্রে অভিনয় করছেন মহিলা অভিনেত্রী। কোনও নাটক কোনও নারী পরিচালনা করলে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘মহিলা পরিচালক’ শব্দবন্ধ।