Swarup Biswas Arrest Incident

‘এক জন স্বরূপকে ধরে কিছু হবে না, সিস্টেমই পচে গিয়েছে’, স্বরূপের গ্রেফতারের খবরে আর কী বলছে টলিউড?

প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাসকে গ্রেফতার করেছে নিউ আলিপুর থানার পুলিশ। এই ঘটনায় কী প্রতিক্রিয়া টলিপাড়ার?

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬ ১৩:৫৩
Share:

স্বরূপের গ্রেফতারিতে কী বলছে টলিপাড়া? ছবি: সংগৃহীত।

টালিগঞ্জে আর কোনও ‘স্বরূপ বিশ্বাস’ আসবেন না! অনেকে ভাবছেন, এ বার বুঝি বিজেপির কোনও এক ‘স্বরূপ বিশ্বাস’ এসে বসবেন টলিউডের দায়িত্বে। সম্প্রতি, এ কথাই জানিয়েছেন এক বিজেপি নেতা। তাঁর এই মন্তব্যের ২৪ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই, বৃহস্পতিবার রাতে রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপ বিশ্বাসকে গ্রেফতার করেছে নিউ আলিপুর থানার পুলিশ। তোলাবাজি এবং শ্লীলতাহানির অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

Advertisement

এই ঘটনার পরে রাজ্যের বিজেপি বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ বলেন, “ধর্মের কল বাতাসে নড়ে।” এত দিন স্বরূপের সঙ্গে ভাল-মন্দে কাজ করে অভ্যস্ত যাঁরা, তাঁরা কী বলছেন? টালিগঞ্জের ‘ফেডারেশন অফ সিনে টেকনিশিয়ান্‌স অ্যান্ড ওয়ার্কার্স অফ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া’র সভাপতি ছিলেন স্বরূপ। দীর্ঘ দিন ধরেই কলাকুশলী এবং কর্মচারীদের একাংশের নানা অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তৃণমূল ক্ষমতায় থাকাকালীন স্বরূপের দাপট ছিল বটে।

যে দাপটের খেসারত দিতে হয়েছে পরিচালক সুদেষ্ণা রায়, ঋদ্ধি সেন, অনির্বাণ ভট্টাচার্য-সহ বেশ কিছু শিল্পীকে। বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনার পরে কী বললেন সুদেষ্ণা? আনন্দবাজার ডট কম-কে পরিচালক বলেন, “আমি রাজনীতিক নই। আমি কাজ করতে চাই। নির্বিঘ্নে যেন সবাই কাজ করতে পারে, এটাই চাই। স্বরূপকে গ্রেফতার করা হল বা আর কাউকে গ্রেফতার করা হল না, এটা নিয়ে উল্লসিত হওয়া বা কিছু বলা— এই সবের মধ্যে ঢুকতে চাই না। কারণ, তাতে কোনও লাভ হবে না। আমাকে খুব খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। বিরোধিতাও করেছিলাম। আমাকে ‘ব্যান’ করা হয়েছে। কাছের লোকেরাও আমার সঙ্গে কাজ করতে পারেনি। কিন্তু, কোনও কিছুই লিখিত ছিল না। প্রমাণও করতে পারব না। তাই এই ধরনের পরিস্থিতি যাতে আর তৈরি না হয়, সেটাই আশা করব। গত দু’বছরে যা হয়েছে তা খুবই দুঃখজনক। আশা করি তার অবসান হবে।”

Advertisement

কলাকুশলীদের সঙ্গে স্বরূপ। ছবি: ফেসবুক।

গত কয়েক বছরে অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্রও বহু বার টলিপাড়াকে রাজনীতিমুক্ত করার পক্ষে সরব হয়েছেন। এই ঘটনায় অভিনেত্রীর মত, “একটা স্বরূপ বিশ্বাস, একটা অরূপ বিশ্বাসকে ধরে কিছু হবে না। পুরো সিস্টেমেই সমস্যা। পচে গিয়েছে। এই সিস্টেমই দায়ী। তাই আমি যে খুব আনন্দিত বা দুঃখিত— তার কোনওটাই নয়। এক দিনে কোনও ‘স্বরূপ বিশ্বাস’ তৈরি হয় না। স্বরূপদের তৈরি করে তাঁর আশপাশের মানুষেরা। মানুষ যত দিন না সৎ হবে, যত দিন না নিজের শিরদাঁড়া খুঁজে পাবে, তত দিন কিছু ঠিক হবে না। তত দিন এই নামগুলো বদলাবে। আর কিছু হবে না।”

মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের সঙ্গে অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রাত্য বসু, দেবাশীস কুমার-সহ আরও অনেকে। ছবি: ফেসবুক।

রাজ্যের পালাবদলের পরে সুর বদলেছে অনেকের। যাঁরা এত দিন চুপ ছিলেন, তাঁরাও নিজেদের সমস্যার কথা প্রকাশ্যে এনেছেন। ইতিমধ্যেই টলিপাড়ায় প্রতিনিয়ত যা যা সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে, কলাকুশলীদের সকলের কথা শুনেছেন বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী, রুদ্রনীলেরা। স্বরূপের গ্রেফতারির ঘটনার পরে পরিবেশক শতদীপ সাহা বললেন, “টলিউড ইন্ডাস্ট্রির জন্য স্বস্তির খবর। ওঁর উপরে কেউ কথা বলতে পারবেন না। ওঁর সিদ্ধান্তই শেষ কথা— এমনটাই চলে আসছিল। ভাল হয়েছে, এটা অনেক দিন আগে হলে ভাল হত।”

ছবিমুক্তির জন্য আলাদা অনুমতি বা শুটিং করতে গেলে ‘ক্যাশ’ দিতে হবে— এমন অনেক ধরনের অভিযোগই উঠেছে স্বরূপের বিরুদ্ধে। এই পরিস্থিতিতে অভিনেতা ভরত কল বললেন, “এটা হওয়ারই ছিল। নানা ছুতোয় কাজ বন্ধ করার চেষ্টা। ছোটপর্দায় একেবারে অন্য ভাবে কাজ হয়। এটা সবাইকে বুঝতে হবে। যে ক্ষমতায় থাকবে, তারা যদি কিছু চাপিয়ে দেয়, সেটা প্রযোজকেদের মানতে হয়। স্বরূপের গ্রেফতারি নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। পুলিশ তদন্ত করবে। সবটাই আইনের হাতে।”

গত কয়েক বছরে রাজনীতি এবং টলিউড যেন একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। প্রত্যেকেরই আশা, টলিউড এ বার অরাজনৈতিক ক্ষেত্র হিসাবে ঘুরে দাঁড়াবে। সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের মতে, অরূপ বিশ্বাস-স্বরূপ বিশ্বাস হিমশৈলের চূড়ামাত্র। তাঁদের কেন্দ্র করে যে ‘নেক্সাস’ তৈরি হয়েছে, সেটা ভাঙলে তবেই দূষণ পুরোপুরি ঘুচবে। সুজয়ের সঙ্গে একমত বিদীপ্তা চক্রবর্তীও। তিনি যোগ করেন, “একা স্বরূপের গ্রেফতারে আনন্দিত, এটা বলতে পারি না। সবাই জানেন কী ভাবে দুর্নীতি হয়েছে। সেখানে শুধু তিনি একা ছিলেন না। আমাদের ইন্ডাস্ট্রির মানসম্মান তলানিতে ঠেকেছে। সেখানে আরও মাথা আছে। যা হয়েছে, এটাই হয়তো হওয়ার ছিল। অহঙ্কার, ঔদ্ধত্য পতনের কারণ। তবে পরবর্তী সময়ে যাঁরা ফেডারেশনের দায়িত্বে থাকবেন, তাঁদের কাছে এটা শিক্ষা যে, যা খুশি তা-ই করা যায় না।”

অরূপকে ভাইফোঁটা দিতে ব্যস্ত রণিতা দাস। ছবি: ফেসবুক।

ছোটপর্দার কাজেও নিত্য সমস্যায় ভুগতে হয়েছে অনেককে। অভিনেত্রী রণিতা দাসের মতে, তাঁকে অপ্রীতিকর কোনও অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়নি বলে যে, অন্য কারও সঙ্গে কিছু হয়নি— সেটা ভাবা ভুল হবে। তবে অন্যায় হলে তার শাস্তি হওয়া উচিত বলেই মনে করেন অভিনেত্রী। একই সুর অভিনেত্রী শ্বেতা ভট্টাচার্যের কণ্ঠে। তিনি বললেন, “দাসানি ওয়ান স্টুডিয়োতে রাখিবন্ধন উৎসব পালন করতে আসেন তিনি। সেই সময় স্বরূপ বিশ্বাসকে প্রথম দেখা। আমার সঙ্গে ব্যক্তিগত সমস্যা হয়নি। তবে বহু সহকর্মী ভুগেছেন। কারও কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কাউকে কাজ দেওয়াই হয়নি। এই সবকিছু কানে এসেছে। তাই এই ঘটনার পরে মনে হয় পরিস্থিতি বদলাবে। যেটা হয়েছে, ভালর জন্য হয়েছে। যা হবে, তা-ও ভালর জন্য হবে।”

গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক প্রচার বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন পরিচালক অরিন্দম শীল। তিনি বললেন, “আমি হতবাক। টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রিকে ঢেলে সাজানো দরকার। শুটিংয়ে অনেক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হত, সেগুলো নিয়ে খুঁটিয়ে ভাবা দরকার। সুতরাং, যেটা ভুল সেটা ভুলই। যদি এমন কোনও ভুল কেউ করে থাকেন, তা হলে তা ক্ষমাযোগ্য নয়, তা শাস্তিযোগ্য।”

টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় স্বরূপ বিশ্বাস। ছবি: ফেসবুক।

টলিউডে স্বরূপ-ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত ছিলেন অভিনেত্রী ও তৃণমূল কাউন্সিলর অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। স্বরূপের গ্রেফতারির প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গেও যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু, উত্তর মেলেনি। শুক্রবার আদালতে পেশ করা হয়েছে স্বরূপকে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement