ধারাবাহিকে ‘বিচিত্র’ দৃশ্য দৃশ্যায়ণ প্রসঙ্গে কী ব্যাখ্যা নির্মাতাদের? ছবি: সংগৃহীত।
‘কমলা নিবাস’ ধারাবাহিকের একটি দৃশ্য। সেই দৃশ্যটি ঘিরে প্রায় তোলপাড় সমাজমাধ্যম। কেউ হাসছেন। কেউ কটাক্ষ করছেন। কেউ আবার ‘অবাস্তব ধারাবাহিক’ বলে দাগিয়ে দিচ্ছেন। বাংলা ধারাবাহিকে যে এই প্রথম কোনও দৃশ্য নিয়ে যে সমালোচনা হচ্ছে তা নয়। তবে অবাস্তব বা বিচিত্র বিষয়ের দৃশ্যায়ন প্রসঙ্গে কী বলছেন শিল্পী, পরিচালকেরা?
দুধে একটা আরশোলাকে চুবিয়ে তার পরে সেটা বেমালুম মুখে চালান করে দিচ্ছেন অভিনেতা। এই দৃশ্য দেখে দর্শকেরা রীতিমতো অস্বস্তির মধ্যে পড়েছেন। একাংশের প্রশ্ন, “এমন অবাস্তব, অস্বাভাবিক বিষয়বস্তু ক্যামেরায় ধরা কি খুব জরুরি?” যদিও এই প্রথম নয়, এর আগে ‘কে আপন কে পর’ ধারাবাহিকে মুখ্যচরিত্র ‘জবা’র একটি আদালতের দৃশ্য নিয়েও খুব হইচই পড়েছিল।
‘কে আপন কে পর’ ধারাবাহিকের এই দৃশ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বিপুল। ছবি: সংগৃহীত।
যদিও টেলিপাড়া বলছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই ধরনের অবাস্তব দৃশ্যের জন্যই জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়। আবার শিল্পীদের মতে, চিত্রনাট্যের সেই সংশ্লিষ্ট দৃশ্যকে বিশ্বাস করাটা খুব জরুরি। পরিচালক রাজেন্দ্রপ্রসাদ দাস বললেন, “আরশোলা খাওয়ার দৃশ্যের প্রসঙ্গে বলি, এটা কি খুবই অবাস্তব দৃশ্য? চরিত্রটি যে সাইকো সেটাই দেখানো হচ্ছে। ধারাবাহিক বা সিনেমা সবটাই তো ‘লার্জার দ্যান লাইফ’! আর এ ক্ষেত্রে আমরা মনে করি, লজিক কম খাটিয়ে, নাটকীয়তার দিকে যেন বেশি জোর দেওয়া যায়। এমন কোনও দৃশ্যে অভিনয় ফুটিয়ে তোলার জন্য যতটুকু লজিকের প্রয়োজন হয়, সেটুকুই ব্যবহার করি আমরা।”
এই মুহূর্তে টিআরপি তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে ‘তারে ধরি ধরি মনে করি’ ধারাবাহিকটি। যে কাহিনিতে বাস্তবের সঙ্গে অলৌকিক ঘটনাকে মেলানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকেই সম্প্রতি দেখানো হয়েছিল, জলের তলায় কুমির কামড় বসাচ্ছে নায়িকার পায়ে। আর নায়ক বিপদ বুঝতে পেরে নায়িকাকে বাঁচাতে উদ্যত। এই দৃশ্য নিয়েও কম হাসাহাসি হয়নি দর্শকের মধ্যে।
এমন দৃশ্যে যাঁরা অভিনয় করেন তাঁদের কখনও বিশ্বাস করতে অসুবিধা হয় না? নাকি চিত্রনাট্য হাতে পেলে তখন এ সব ভাবার অবকাশ থাকে না? এ প্রসঙ্গে পল্লবী শর্মা জানালেন, গল্প বা চিত্রনাট্য নিয়ে ভাবার কাজ নয় তাঁদের। প্রসঙ্গত, পল্লবীকে এই মুহূর্তে ‘তারে ধরি ধরি মনে করি’ ধারাবাহিকে নায়িকা হিসাবেই দেখছে দর্শক।
অভিনেত্রী বললেন, “আমাদের কাজ চিত্রনাট্যকে রূপায়িত করা। সেটাই করি। তবে আর একটা কথাও ঠিক, লেখা তো একরকম। কিন্তু ওই চরিত্রের মধ্যে বাঁচি তো আমরা। নিজে না বিশ্বাস করতে পারলে তা ফুটিয়ে তুলতে একটু অসুবিধা হয়। আসলে এখন ধারাবাহিকের ধরন বদলে গিয়েছে। দর্শক কিন্তু অন্য ধরনের ভাবনা, দৃশ্য দেখতে ভালবাসছে। গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে বলেই তো এই ধরনের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।”
‘কমলা নিবাস’-এর আলোচিত দৃশ্য নিয়ে কী মত সোহিনীর? ছবি: সংগৃহীত।
চরিত্রে বিশ্বাস করতে না পারলে অভিনয় করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অভিনেত্রী বললেন, “এই ধারাবাহিকে ছেলেটির ব্যাধিকে ঘিরে এমন দৃশ্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এটাও ঠিক, চরিত্রের প্রয়োজনে যদি এমন কোনও দৃশ্যে অভিনয় করতে হয়, তা হলে করতে হবে। সেখানে মাথা দিয়ে ভাবলে হবে না।”
একই মত অভিনেতা ধ্রুবজ্যোতি সরকারেরও। ছোটপর্দায় আরশোলা খেয়ে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচনায় তাঁরই নাম। অভিনেতা বললেন, “অবাস্তব দৃশ্য দর্শকের বেশি নজরে আসে। সমাজমাধ্যমে ভাল বিষয় মানুষ কম দেখে। যত অবাস্তব, অন্য ধরনের বিষয় আছে, সেগুলোর ভিউ বেশি। আলোচনা বেশি। ফলে এ ক্ষেত্রেও তাই-ই হয়েছে বলে আমার মনে হয়।”
ভিন্গ্রহীর সঙ্গে রাঙামতীর যুদ্ধ নিয়ে হয়েছিল কটাক্ষ। ছবি: সংগৃহীত।
তা হলে কি ধারাবাহিকে ‘অবাস্তব’ দৃশ্য কি টিআরপি তোলার সহজ উপায়? কথায় আছে ‘নেতিবাচক প্রচারও একধরনের প্রচার’। সেই পথই বেছে নেওয়া হচ্ছে তা হলে? প্রযোজক সুশান্ত দাসের মতে, “সবটাই কি অবাস্তব? আমার তো মনে হয় না। মানুষ তো অবাস্তব জিনিসই দেখতে চায়। তাই আমরা চেষ্টা করি এমন কিছু দৃশ্য দেখাতে যা নিয়ে দর্শক আলোচনা করবে। যেমন দেখিয়েছিলাম রাঙামতী যুদ্ধ করছে এলিয়েনের সঙ্গে। এই ধরনের চমক এলেই তো আলোচনা তৈরি হয়! যতই কটাক্ষ করুক না কেন সবাই। এটাই সত্যি। এই ধরনের দৃশ্য এলে অনেক সময় টিআরপি বেড়ে যায়।”
তাই দর্শকের অস্বস্তি হলেও, এ ধরনের কোনও দৃশ্যকে ‘অবাস্তব’ বলে আখ্যা দিতে নারাজ নির্মাতারা।