প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিকের পর এল পোস্টবায়োটিক। ছবি: সংগৃহীত।
আগে কেবল চিকিৎসকেরাই জানতেন। এখন জনসাধারণও জানতে শুরু করেছে। পরিচিত হচ্ছে বিভিন্ন অভিধা— তা সে ‘অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট’ হোক বা ‘কর্টিসল’, ‘প্রোবায়োটিক’ হোক বা ‘ইনফ্ল্যামেশন’। বিশ্ব জুড়ে স্বাস্থ্য সচেতনতার ধুম লাগা এবং চারদিকে স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শদাতার পেশা জনপ্রিয় হওয়ার পর, নানা শব্দ তাঁদের মুখেও ঘুরছে, যাঁরা কোনও দিন চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে আলাদা করে আগ্রহ দেখাননি। আর তারই নতুন ফসল, ‘পোস্টবায়োটিক’। প্রোবায়োটিক এবং প্রিবায়োটিক নিয়ে নানা ধরনের আলোচনার পর পোস্টবায়োটিকের আগমন হয়েছে।
কী এই পোস্টবায়োটিক?
‘হার্ভার্ড হেলথ’-এ প্রকাশিত নিবন্ধ বলছে, পোস্টবায়োটিক এক প্রকার জৈব যৌগ। প্রিবায়োটিক এবং প্রোবায়োটিক হজম করার পর অবশিষ্ট অংশ বা উপজাত হিসেবে যা পড়ে থাকে, তা-ই হল পোস্টবায়োটিক। সহজ কথায়, পেটের উপকারী ব্যাক্টেরিয়া যখন ফাইবার জাতীয় খাবার হজম করে, তখন তারা শরীরে এক ধরনের উপাদান তৈরি করে, যা পেট ও স্বাস্থ্য ভাল রাখতে সাহায্য করে।
পোস্টবায়োটিক আদপে কী? ছবি: সংগৃহীত
প্রো-প্রি-পোস্টের চক্র
তবে পোস্টবায়োটিককে বুঝতে গেলে প্রোবায়োটিক এবং প্রিবায়োটিকের সঙ্গে সম্পর্কটি বোঝা বেশি জরুরি। প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিক এবং পোস্টবায়োটিক— এই তিনটিই পরিপাকতন্ত্র ও স্বাস্থ্য ভাল রাখার তিনটি ভিন্ন উপাদান। এই তিনটি আসলে একটি চক্রের মতো কাজ করে। প্রোবায়োটিক হল পেটে থাকা উপকারী ব্যাক্টেরিয়া (যেমন, দই বা পান্তাভাতে থাকে)। খাবার হজম করতে সরাসরি সাহায্য করে। আর এই উপকারী ব্যাক্টেরিয়া বেঁচে থাকার জন্য যে বিশেষ ধরনের ফাইবার বা খাবার খায়, তাকে বলে প্রিবায়োটিক। এগুলি খেয়ে হজমের কাজ শেষ করে প্রোবায়োটিক। তখন তাদের শরীর থেকে এক ধরনের উপকারী ও নিষ্ক্রিয় উপজাত বা মেটাবোলাইট তৈরি হয়, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ও পেটের প্রদাহ কমাতে সরাসরি কাজ করে। একেই বলে পোস্টবায়োটিক। অর্থাৎ, প্রিবায়োটিক হল খাবার, প্রোবায়োটিক হল সেই খাবারে পুষ্ট উপকারী জীবাণু এবং পোস্টবায়োটিক হল এই পুরো প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ফল।
স্বাস্থ্যের জন্য পোস্টবায়োটিক কেন দরকারি?
অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভাল রাখা শুধু হজমের জন্য নয়, গোটা শরীরের জন্যই জরুরি। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অন্ত্রের জীবাণুর ভারসাম্য বিঘ্নিত হলে প্রদাহ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অবনতি, বিপাকক্রিয়ার সমস্যা এবং নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এই জায়গাতেই পোস্টবায়োটিকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রো-প্রি-পোস্টের চক্র। ছবি: সংগৃহীত
কী কী উপকারিতা পোস্টবায়োটিকের?
১. অন্ত্রের কোষকে শক্তিশালী রাখে: অন্ত্রের দেওয়াল শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। পোস্টবায়োটিকের কিছু উপাদান এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে মজবুত রাখতে সাহায্য করে। ফলে ক্ষতিকর জীবাণু বা বিষাক্ত পদার্থ সহজে কোষে প্রবেশ করতে পারে না।
২. প্রদাহ কমাতে পারে: দীর্ঘ দিন ধরে প্রদাহের সমস্যায় ভোগেন অনেকে। কিছু পোস্টবায়োটিক উপাদান প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে।
৩. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়: শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ অন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। পোস্টবায়োটিক সেই ব্যবস্থাকে কার্যকর রাখতে সাহায্য করতে পারে।
৪. হজমে সাহায্য করে: কিছু পোস্টবায়োটিক এমন ভাবে অন্ত্রের পরিবেশ গড়ে তোলে, যাতে উপকারী জীবাণুগুলি আরও ভাল ভাবে কাজ করতে পারে। এর ফলে হজম ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।
তবে সকলের শরীরে প্রোবায়োটিক সমান ভাবে কাজ করে না। কারও শরীরে উপকারী জীবাণু সহজে টিকে থাকে, কারও ক্ষেত্রে তা হয় না।
পোস্টবায়োটিকের পরিমাণ বৃদ্ধি হবে কী ভাবে?
নির্দিষ্ট কোনও খাবার খেয়ে সরাসরি প্রচুর পোস্টবায়োটিক পাওয়া যায়, এমন ধারণা সঠিক নয়। কারণ, পোস্টবায়োটিকের একটি বড় অংশ তৈরি হয় অন্ত্রের মধ্যেই। তাই সুষম আহার খুব জরুরি। কয়েক ধরনের খাবার খেতে হবে পোস্টবায়োটিকের পরিমাণ বাড়াতে চাইলে। থুড়ি, বলা ভাল, প্রোবায়োটিককে যথেষ্ট পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে, তা হলেই ফল মিলবে। আর সেই ফলই হল পোস্টবায়োটিক। তাই বেশি পরিমাণে ফাইবারযুক্ত খাবার (শাকসব্জি, ফল, ওট্স, দানাশস্য এবং বিভিন্ন ধরনের বীজ) খেতে হবে। ফাইবারের পাশাপাশি মজানো খাবারও (পান্তা ভাত, কাঞ্জি, দই, ইডলি) খেতে হবে, যাতে উপকারী জীবাণুগুলি ভাল থাকে। তারা যত সুস্থ থাকবে, উপকারী পোস্টবায়োটিক তৈরিও হবে তত বেশি।