কী ভাবে কাজ করে মস্তিষ্কের পেসমেকার? ছবি: সংগৃহীত।
ওষুধ খেয়ে কিছু দিন সুস্থ থাকতেন। তার পরে ফের শরীরে দুলুনি ভাব অনুভব করতেন সল্টলেকের বাসিন্দা বছর বিয়াল্লিশের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার অরিন্দম রায়। ক্রমশ জড়তা গ্রাস করছিল তাঁকে। বছর পাঁচেক এমন চলার পরে, পারকিনসন্সে আক্রান্ত ওই রোগীকে সুস্থ করতে মস্তিষ্কে পেসমেকার বসানোর সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা। ভাবছেন নিশ্চয়ই, হৃদ্যন্ত্র বিকল হতে শুরু করলে তো পেসমেকার বসানো হয়, তবে মস্তিষ্কে আবার পেসমেকার বসে নাকি?
সাধারণত মানুষের হৃৎপিণ্ডের সচলতা যখন কমে যায়, তখন যান্ত্রিক ভাবে হৃদ্যন্ত্রকে পূর্বের মতো সচল করতে পেসমেকার ব্যবহার করা হয়। তেমনই মস্তিষ্কের কোনও অংশ যদি সঠিক ভাবে কাজ না করে, তখন মানুষের শরীরে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। এর মধ্যে হাত-পা কাঁপা, বেশি ক্ষণ দাঁড়াতে না পারা, খেতে গিয়ে সমস্যা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, ভুলে যাওয়ার মতো সমস্যা অন্যতম। এর ফলে অনেকেই পারকিনসন্স, ডিসটোনিয়া, ট্রেমর বা এপিলেপ্সির মতো স্নায়ুজনিত রোগে ভোগেন। মূলত মস্তিষ্কের সংশ্লিষ্ট অংশে ইলেকট্রিকাল ডিসচার্জ ঠিক মাত্রায় না হওয়ার ফলে দেখা দেয় এমন সমস্যা।
চিকিৎসক নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘পারকিনসন্স খুবই পরিচিত অসুখ। দেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হন। পারকিনসন্সের ওষুধ আছে। তবে সমস্যা হল কিছু দিন ব্যবহারের পরেই সেগুলি আর কাজ করতে চায় না। অনেক সময় আবার ওষুধগুলি থেকে নানা রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও শুরু হয়। এই রোগের হাত থেকে বাঁচার জন্য এখন ব্রেন পেসমেকার বসানো হয়। এই পদ্ধতিতে মস্তিষ্কের যে নির্দিষ্ট এলাকা অর্থাৎ সাবসটেনশিয়া নায়গ্রা থেকে ডোপামিন কম বেরোয়, সেখানে লোকাল অ্যানেস্থেশিয়া করে একটি ইলেকট্রোড বা ইলেকট্রিকের তার বসিয়ে দেওয়া হয়। তার পরের দিন চেস্ট ওয়ালের ভিতর সাধারণ পেসমেকারের মতোই এই পেসমেকারটিও বসানো হয়। পেসমেকার থেকে ইলেকট্রিকাল ইমপাল্স গিয়ে মস্তিষ্কের ওই নির্দিষ্ট অংশটিকে উদ্দীপিত করে। একে বলা হয় ‘ডিপ ব্রেন স্টিমুলেশন’ (ডিবিএস)।’’
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
চিকিৎসকদের মতে, ২-৩ রকমের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। মূলত অস্ত্রোপচার সংক্রান্ত কিছু সমস্যা, যেমন রক্তক্ষরণ, সংক্রমণ বা হার্ডওয়্যার সংক্রান্ত সমস্যা দেখা যায় কখনও-কখনও। হয়তো রোগীর বুকে কোনও আঘাত লাগল, পেসমেকারের সঙ্গে কোনও তারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। সে ক্ষেত্রে ওই তার বদলে নতুন তার লাগাতে হয়। তবে এইগুলির ঝুঁকি খুবই কম। এ ছাড়া এই অস্ত্রোপচারের পরে কর্টিকো স্পাইনাল ট্র্যাক্ট সংক্রান্ত সমস্যাও হতে পারে। ডিবিএস-এর একটা সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হল, কিছু রোগীর এ ক্ষেত্রে ডিমেনশিয়া বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রাথমিক স্তরে এটা নির্ণয় না করে নিলে পরবর্তী কালে ডিবিএস প্রক্রিয়ার পরে রোগীর হ্যালুসিনেশন, ডিলিউশনের মতো সমস্যায় ভুগতে পারেন। অনেকের হাঁটাচলা, কথা বলা, খাবার খাওয়ার মতো অ্যাক্সিয়াল সিমটমস-ও থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রে রোগীর বয়স খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর বয়স ৭০ বছরের উপরে হলে সাধারণত চিকিৎসকেরা এই অস্ত্রোপচারটি করেন না।