ছুঁলেই ছিঁড়খুঁড়ে যাবে ভাইরাস, কী তৈরি করলেন বিজ্ঞানীরা? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
প্লাস্টিকের পাতলা ফিনফিনে আস্তরণ। সেটি ছুঁলেই ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া বা পরজীবীদের বিনাশ হবে। ছিঁড়েখুঁড়ে যাবে ভাইরাসের বাইরের আবরণ। জীবাণু-প্রতিরোধী এক জাঁদরেল ‘প্লাস্টিক ফিল্ম’ বানিয়ে ফেলেছেন অস্ট্রেলিয়ার আরএমটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। এমন প্লাস্টিক ফিল্ম স্যানিটাইজ়ার বা রাসায়নিক স্প্রে-র থেকেও বেশি কার্যকরী বলে দাবি করা হয়েছে। স্যানিটাইজ়ার বা কোনও জীবাণু প্রতিরোধী স্প্রে ব্যবহার করলে সেটি কিছুটা সময়ের জন্য ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়া থেকে সুরক্ষা দেয়। কিন্তু এ হেন প্লাস্টিকের ফিল্ম ব্যবহার করলে দীর্ঘ কাল ধরেই ভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে বলে দাবি করেছেন গবেষকেরা।
ছুঁলেই ধ্বংস হবে ভাইরাস
পাতলা অ্যাক্রিলিক প্লাস্টিক ফিল্ম। সেটি দেখতে যতই প্লাস্টিকের আস্তরণের মতো হোক, আসলে এটি একটি অস্ত্রের মতো কাজ করবে। এই ফিল্মের উপরিভাগ মসৃণ, কিন্তু এর ভিতরে আণুবীক্ষণিক স্তরে বসানো রয়েছে হাজার হাজার অতি ক্ষুদ্র ‘ন্যানো-পিলার’। সেই পিলারগুলি এমন ভাবে তৈরি, যা ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়াকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে। প্লাস্টিকের উপর কোনও ভাইরাস জন্মালেই তাকে জাপটে ধরে এই পিলারগুলি। তার পর ছিঁড়েখুঁড়ে দেয়। এই পিলারগলি একে অপরের থেকে প্রায় ৬০ ন্যানোমিটার দূরত্বে থাকে। অসংখ্য পিলার পর পর সাজানো থাকে। ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়া এগুলিতে আটকে গেলেই নাকানিচোবানি খেতে থাকে। তার পর একেবারেই নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
‘অ্যাডভান্সড সায়েন্স’ জার্নালে গবেষণাটি নিয়ে লেখা হয়েছে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, ফড়িং বা ঝিঁঝিপোকাকে দেখেই এমন প্লাস্টিক ফিল্ম বাননোর কথা মাথায় আসে। আসলে ফড়িং বা ঝিঁঝির ডানা এমন ভাবে তৈরি হয়, যার উপরে এমন জীবাণরোধী পিলারের মতো থাকে। এদের ডানায় কোনও ভাইরাস বা পরজীবী জন্মাতে পারে না। পোকাদের ডানার এমন বিচিত্র গঠন দেখে বাস্তবেই এমন জিনিস তৈরি করার উপায় মাথায় আসে গবেষকদের। পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, প্লাস্টিক ফিল্মটি এক ঘণ্টার মধ্যে ৯৪ শতাংশ ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়াকে ধ্বংস করতে পারে।
ব্যবহার হবে কী ভাবে?
প্লাস্টিক ফিল্ম তৈরিতে কোনও প্রকার রাসায়নিক ব্যবহার করেননি গবেষকেরা। তাই এটি সুরক্ষিত ও নিরাপদ বলে দাবি করা হয়েছে। মানুষের শরীরের সংস্পর্শে এলে কোনও ক্ষতি হবে না বলেই দাবি। এই ধরনের প্লাস্টিক ফিল্ম যে কোনও সারফেস বা শক্তপোক্ত পৃষ্ঠে ব্যবহার করা যেতে পারে যেখানে জীবাণুর সংক্রমণ বেশি হয় এবং বাইরে থেকে তা বোঝাও যায় না। যেমন মোবাইলের স্ক্রিন বা ল্যাপটপের স্ক্রিন জীবাণুর আঁতুরঘর। লক্ষ লক্ষ ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়া সেখানে জন্মায় এবং অজান্তেই শরীরে ঢুকে যায়। তাই গবেষকদের ভাবনা, মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের স্ক্রিনে যদি এমন প্লাস্টিক ফিল্ম ব্যবহার করা যায়, তা হলে দীর্ঘ সময় ধরে তা জীবাণুমুক্ত থাকবে।
বাস, ট্রেন বা মেট্রোর হাতল এবং সিটে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
আবার অপারেশন থিয়েটারে, বেডরেল, হাসপাতালের দরজাগুলির হাতলে, শৌচাগারের হাতলে, চিকিৎসার সরঞ্জামগুলিতে এমন উপাদান ব্যবহার করে সেগুলিকে জীবাণুমুক্ত রাখা সম্ভব।
প্যাকেটজাত খাবারের প্লাস্টিক থেকে জীবাণু সংক্রমণ তো হয়ই, মাইক্রোপ্লাস্টিকের ভয়ও থাকে। তাই খাবারের প্যাকেট বা প্লাস্টিকের পাত্রের গায়ে যদি এমন প্লাস্টিক ফিল্ম সেঁটে দেওয়া যায়, তা হলে সেগুলি অনেক বেশি নিরাপদ হতে পারে বলেই মনে করছেন গবেষকেরা।