হরমোনের খেলায় গোল খান পুরুষেরাও! গ্রাফিক— আনন্দবাজার ডট কম।
হরমোন টালমাটাল হলে মহিলাদের শরীরে নানা সমস্যা হয়। সেই সমস্যা আর তার সমাধান নিয়ে আলোচনাও হয় বিস্তর। যেটা নিয়ে আলোচনা হয় না, তা হল— হরমোনজনিত হিসাবে গরমিল হলে পুরুষেরাও সমস্যায় পড়েন। শরীরে হরমোনের খেলা অস্বস্তিতে ফেলে তাঁদেরও। চিন্তার বিষয় হল, আগে যে সমস্ত হরমোনজনিত সমস্যা মাঝবয়সি পুরুষদের ক্ষেত্রে দেখা যেত, তা ইদানীং বিশ-পঁচিশের তরুণদেরও অসুবিধায় ফেলছে। কারণ, অল্প বয়সেই তাঁদের শরীরে কমছে মেল হরমোন বা পুরুষালি হরমোন টেস্টোস্টেরনের মাত্রা।
যে কোনও পুরুষের সুস্থ জীবনের জন্য টেস্টোস্টেরনের ভারসাম্য বজায় থাকা জরুরি। কারণ, পুরুষের শরীরে পেশির ক্ষমতা থেকে শুরু করে হাড়ের ঘনত্ব, মেজাজ, কাজের উদ্যম, মনঃসংযোগের শক্তি, এমনকি প্রজনন ক্ষমতাও নির্ভর করে এই হরমোনের উপর। এমতাবস্থায় অল্প বয়সেই হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে তা শুধু শারীরিক ভাবে নয়, মানসিক ভাবেও প্রভাব ফেলতে পারে। যার জেরে দৈনন্দিন জীবনযাপনের স্বাভাবিক ছন্দ বিনষ্ট হতে পারে, আরও বাড়তে পারে মানসিক চাপ।
অল্প বয়সে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণ কী?
২০-৩০ বছর বয়স থেকে একজন যুবকের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস এবং কর্মক্ষেত্রের পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। এ যুগে তা আরও দ্রুত বদলাচ্ছে। আগে যে ধরনের কর্মসংস্কৃতি, জীবনযাপন ছিল, তা এ কালে আর দেখা যায় না বললেই চলে। অল্প বয়সে পুরুষের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণ সেগুলিই।
১. দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ থেকে হতে পারে। কম বয়সেই এখন কেরিয়ারে এবং পড়াশোনার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার তীব্র চাপের মুখোমুখি হতে হয়। তাতে শরীর প্রচুর পরিমাণে কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ হয়। আর কর্টিসল বাড়লেই টেস্টোস্টেরন কমে। কারণ, এরা পরস্পরের ‘শত্রু’।
২. যথাযথ ঘুম না হওয়ার কারণেও এমন হয়। কারণ, শরীর রাত ১০টা থেকে ভোর ৪টের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হরমোন তৈরি করে। যে সময় শরীর বিশ্রামে থাকে। এ যুগে স্মার্টফোনের ব্লু লাইট এবং আরও নানা কারণে রাত জেগে থাকার অভ্যাস বাড়ছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে ঘুম। ব্যাঘাত ঘটছে হরমোন নিঃসরণের প্রক্রিয়াতেও। নিয়মিত গভীর ঘুম না হলে শরীর পর্যাপ্ত টেস্টোস্টেরন তৈরি করার সুযোগ পায় না। ফলে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ক্রমশ কমতে থাকে।
৩. দূষিত পরিবেশ এবং রাসায়নিকেরও ভূমিকা রয়েছে এর নেপথ্যে। ৩০-৪০ বছর আগে পরিবেশ যেমন ছিল, তার থেকে বর্তমানের পরিবেশ আরও বেশি দূষিত। এখন প্লাস্টিকের বোতল বা প্লাস্টিকের বক্সে থাকা বিপিএ শরীরে যাচ্ছে আকছার। যা শরীরে গিয়ে ‘ফিমেল’ হরমোন ইস্ট্রোজেনের মতো আচরণ করে। এতে টেস্টোস্টেরন নিঃসরণের প্রক্রিয়া বিভ্রান্ত হয়। এ ছাড়া, বডি স্প্রে, শ্যাম্পু বা সাবানে থাকা ‘থ্যালেটস’ নামের এক ধরনের রাসায়নিকও পুরুষের শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।
৪. খাবারের ধরন বদলেছে। এ যুগে প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে। চিনি, রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট, সোডিয়ামের মাত্রা সে সব খাবারে অনেক বেশি থাকে, যা থেকে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায়। যা হরমোন উৎপাদন কমিয়ে দেয়। যথাযথ শাকসব্জি, ডাল না খাওয়ায় খাবারে জ়িঙ্ক, ম্যাগনেশিয়াম এবং ভিটামিনের অভাব হচ্ছে। যেহেতু হরমোন তৈরি করতে সাহায্য করে এই পুষ্টিগুণগুলিই, তাই এতেও হরমোন উৎপাদনে প্রভাব পড়ে।
৫. শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এ যুগের জীবনযাত্রার অন্যতম অঙ্গ। বিশের কোঠায় অনেকেই দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন বা গেম খেলেন। এতে পেটের চর্বি বাড়ে। পেটের চর্বি থেকে ‘অ্যারোমাটেজ’ নামের এনজ়াইম তৈরি হয়, যা পুরুষের টেস্টোস্টেরনকে স্ত্রী হরমোন ইস্ট্রোজেনে রূপান্তরিত করে।
৬. ল্যাপটপ ও ইলেকট্রনিক ডিভাইসের তাপ থেকেও সমস্যা বাড়তে পারে। অনেকে দীর্ঘ ক্ষণ কোলের ওপর ল্যাপটপ রেখে কাজ করেন। ল্যাপটপের উত্তাপ এবং রেডিয়েশন সরাসরি শুক্রাশয়ের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে। ফলে হরমোন উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।
কী করে বুঝবেন?
বাহ্যিক পরিবর্তন: তলপেট এবং বুকের অংশে চর্বি জমতে শুরু করে বা স্তন টিস্যু বৃদ্ধি হতে পারে। এ ছা়ড়া মাথার চুল পাতলা হয়ে যেতে পারে, দাড়ি বা শরীরের অন্যান্য অংশের লোম কমে যেতে পারে। ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতাও নষ্ট হয়ে দেখা দিতে পারে বলিরেখা।
হাড়ও পেশি: পেশির ঘনত্ব কমতে থাকে। ব্যায়াম করলেও আগের মতো পেশি সুগঠিত হয় না। এ ছাড়া টেস্টোস্টেরন হাড়কে মজবুত রাখে। এর ঘাটতি হলে হাড় পাতলা হয়ে যায়, ফলে অল্প আঘাতেই বেশি চোট লাগতে পারে।
মানসিক সুস্থতা: কাজে ফোকাস করতে সমস্যা হয় এবং স্মৃতিশক্তি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। অকারণে খিটখিটে মেজাজ, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং বিষণ্ণতা ও নানা কাজে উদ্বেগ দেখা দেয়।পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিলেও সারাক্ষণ ঝিমুনি ভাব এবং জীবনীশক্তির অভাব বোধ হয়।
যৌন স্বাস্থ্য: যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যায়। ইরেকটাইল ডিসফাংশনের জন্য শারীরিক মিলনে অসুবিধা তৈরি হতে পারে।টেস্টোস্টেরন কমে গেলে প্রজনন ক্ষমতা বা ফার্টিলিটি কমে যেতে পারে।
ঘুম: টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি থাকলে অনেকেরই ইনসোমনিয়া বা অনিদ্রা দেখা দেয়। আবার অনেকের ক্ষেত্রে স্লিপ অ্যাপনিয়া (ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট) হওয়ার প্রবণতাও বেড়ে যায়।