মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাইল চিত্র।
শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনার পরিবর্তন না হলে নয়াদিল্লিতে তৃণমূল ভাঙনের ছবি থেকে পর্দা উঠবে আগামী সোমবার। ওই দিন তৃণমূলের লোকসভার বিদ্রোহী সাংসদেরা সবাই পৌঁছবেন স্পিকারের কাছে। তার আগের রাতে কাকলি ঘোষ দস্তিদারের বাড়িতে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে তাঁদের। আপাতত ১৯ জন বিদ্রোহী রয়েছেন। কিন্তু চেষ্টা চলছে এই সংখ্যা আরও বাড়ানোর। সূত্রের খবর, বিরোধীরা স্পিকারের কাছে দাবি জানাবেন, এনডিএ-র অধীনে একটি পৃথক ব্লক গঠনের। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীরও সপ্তাহান্তে নয়াদিল্লি পৌঁছনোর কথা। এর আগে যখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে এবং রাতে শতাব্দী রায়ের বাড়িতে বিদ্রোহীদের দু’টি জমায়েত হয়েছিল, সেই দু’টিতেই উপস্থিত ছিলেন শুভেন্দু। ‘অপারেশন লোটাস’-এর প্রধান কান্ডারি যদি কেন্দ্রীয় বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব হন, তবে তাঁদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে নতুন মুখ্যমন্ত্রীও সক্রিয় বলে মনে করছে রাজনৈতিক শিবির।
এখনও পর্যন্ত যে ১৯ জন সই করেছেন, তাঁদের সই করা চিঠির একটি অংশ আজ প্রকাশ্যে এসেছে। তবে এই চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করেনি স্পিকারের অফিস এবং বিদ্রোহীদের কেউ বিষয়টি নিয়ে আলাদা করে মুখ খোলেননি। মমতার সঙ্গে থাকা বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ আজ বলেছেন, “সাংসদদের সই বলে যে তালিকা ঘুরছে, লোকসভার অধ্যক্ষের দফতরে জমা থাকা ‘নমুনা স্বাক্ষরের’ সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা হোক। কিছু সই কি মিলছে? দিল্লি সূত্র বলছে, মিলিয়ে দেখা জরুরি।”
যদিও ওই তালিকায় যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁরা যে বিদ্রোহী তালিকায় রয়েছেন, তা ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসে গিয়েছিল। মমতার সঙ্গে থেকে যাওয়া লোকসভার সাংসদ কীর্তি আজাদের কথায়, “অমিত শাহের নেতৃত্বে অপারেশন লোটাস হচ্ছে। প্রকাশ চিক বরাইক রাজ্যসভা থেকে ইস্তফা দেওয়ার পরে নিশিকান্ত দুবের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বললেন। এই ঘটনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে কিছু সাংসদের বৈঠক এবং ফুলের তোড়া হাতে শুভেন্দু অধিকারীর শতাব্দী রায়ের বাড়ি যাওয়া।” কীর্তি এটাও বলেন, বিজেপির নেতাদের কাছ থেকে তিনি অজস্র ফোন পেয়েছেন।
রাজনৈতিক সূত্রের খবর, তৃণমূলের এক বা দু’জন বড় নেতাকে এই নতুন ব্লকে শামিল করতে ঝাঁপিয়েছে বিজেপি। তাঁদের পাওয়া গেলে ধারে ও ভারে এই ব্লক শক্তিশালী হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এমনিতেই ১৯ জনের সংসদীয় দলের মধ্যে দেব অধিকারীর কোনও স্থিরতা নেই, তাঁর সই-পরবর্তী কথাবার্তায় এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে সংখ্যায় আরও এক বা দু’জনকে পেলে সুবিধাই হবে ‘অপারেশন লোটাস’-এর পরবর্তী পদক্ষেপগুলির সময়ে। সূত্রের খবর, গত কাল গভীর রাত পর্যন্ত বিজেপি রাজ্যস্তরের শীর্ষ নেতৃত্ব এক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক আলাপচারিতাও স্বাভাবিক ভাবেই হয়েছে। জানা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় শীর্ষ পর্যায় থেকেও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। এটা ঘটনা যে, সাংসদরা দল ছেড়ে অন্য দলে যোগদান না করলে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যার কোনও প্রয়োজন হয় না। কারণ, ভোটে জিতে আসা দল থেকে বার হতে হলে, হয় পদত্যাগ করে আবার নতুন নির্বাচনে লড়ে জিতে আসতে হবে, নয়তো সাংসদদের দুই-তৃতীয়াংশ সরাসরি অন্য কোনও দলে মিশে যেতে পারে। সংসদীয় আইন মতে, নতুন ব্লক করার কোনও নজির বা নিয়ম লোকসভায় নেই। তবুও সংখ্যা বাড়ানোর দিকে তাকিয়েই রণকৌশল তৈরি হচ্ছে। সূত্রের খবর, এই নতুন ব্লকের দলনেতা বা মুখ্য সচেতকের নামও দেওয়া হবে স্পিকারকে। এর পর স্পিকার কী করবেন, তা তাঁর সিদ্ধান্তের উপরেই ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। একটি অংশের মতে, তিনি এই বিদ্রোহী শিবিরকে আলাদা করে একটি বসার জায়গা নির্দিষ্ট করে দিতে পারেন। সেটা সম্পূর্ণ তাঁর এক্তিয়ারের মধ্যেই রয়েছে। অন্যথায় মমতাপন্থী তৃণমূলের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া হবে, এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
বিদ্রোহীদের অন্যতম, কোচবিহারের সাংসদ জগদীশ বসুনিয়া অবশ্য জোর দিয়ে বলেন, ‘‘আমাদের কাছে ২০ জনের সমর্থন এখনই আছে। এটা বেড়ে ২২ হবে।’’ সোমবার তাঁরা স্পিকারের সঙ্গে দেখা করতে পারেন, তা জানিয়ে জগদীশ সেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে আঙুল তুলে বলেন, ‘‘মমতার অভিষেকের প্রতি ধৃতরাষ্ট্রের মতো অন্ধ স্নেহই এই পতনের অন্যতম কারণ।’’
স্পিকারের কাছে যাওয়ার আগে বিদ্রোহীদের নিজেদের মধ্যে বৈঠক করার সিদ্ধান্তটিও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সেখানে শুভেন্দু অধিকারীর থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, তিনি আসতে না পারলেও বিজেপি-র সংশ্লিষ্ট সাংসদেরা থাকবেন। এটা বিজেপি শিবির থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, নতুন ব্লকের নেতা যে-ই হোন, তাঁদের মূল নেতা যে নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর সংসদীয় পথকে অবলম্বন করতে হবে, সেই বার্তা বিদ্রোহীদের দেওয়া হয়েছে। আগের তৃণমূল জমানার থেকে তাঁরা বাড়তি স্বাধীনতা পাবেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করে, নিজেদের এলাকার উন্নয়নের জন্য দাবি দাওয়া করার ক্ষেত্রে—এমনটাও বলা হয়েছে। এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অভিযোগ ছিল, এর আগে কারও সঙ্গে (কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্তরের) কাজের জন্য দেখা করতে গেলেও অনুমতি নিতে হত, এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা মিলত না।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে